ফলাফলের চাপ নয়, জীবন হোক ভালোবাসার শিক্ষা

এসএসসি ফলাফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা: সচেতনতার ঘাটতিই মূল কারণ

  • দৈনিক টার্গেট
  • প্রকাশ: ০১:১১:৩০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ জুলাই ২০২৫
  • ৪১৩ বার পঠিত হয়েছে

২০২৫ সালের ১০ জুলাই সারাদেশে একযোগে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর দেশজুড়ে একের পর এক আত্মহত্যার মর্মান্তিক ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে। আশানুরূপ ফলাফল না পাওয়ায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় একাধিক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন ও গণমাধ্যম সূত্র।

হবিগঞ্জ, বগুড়া, কুমিল্লা, বরিশাল ও কক্সবাজারসহ দেশের অন্তত পাঁচটি জেলায় শিক্ষার্থীরা আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। আর এ ঘটনাগুলো কেবল নির্দিষ্ট পরিবারে নয়, সারা দেশের সচেতন মহলে শোক, আতঙ্ক এবং গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। হবিগঞ্জের মাধবপুরে ফারজানা আক্তার (১৬) নামের একজন ছাত্রী পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। সে স্থানীয় একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল।

বগুড়ার শেরপুরে গণিতে এ প্লাস না পেয়ে হতাশ সুমাইয়া আক্তার (১৭) আত্মহত্যা করে। তার পরিবার জানায়, সুমাইয়া সব বিষয়ে ভালো ফল করলেও গণিতে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। কুমিল্লার বুড়িচংয়ে প্রভা নামের এক শিক্ষার্থী দুটি বিষয়ে ফেল করায় ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ফাঁস দেয়। তার বাবা বিদেশে থাকেন এবং মেয়ের মৃত্যুর খবরে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

বরিশাল বিভাগের দুটি এলাকায় ফেল করায় দুই ছাত্রী আত্মহত্যা করেছে বলে জানা গেছে। কক্সবাজার সদরে প্রিয়তম রুদ্র নামের এক ছাত্র জন্মদিনের ঠিক আগের দিন অকৃতকার্য হওয়ার দুঃখে আত্মহত্যা করে। এছাড়া কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলায় এক শিক্ষার্থী বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে এবং বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বিভিন্ন স্থান থেকে আত্মহত্যার চেষ্টার আরও খবর আসছে।

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৬৮.৪৫ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় ১৫ শতাংশের মতো কম। পাশাপাশি জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও হ্রাস পেয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পরিসংখ্যানের পেছনে যেমন শিক্ষাগত কারণে দুর্বলতা রয়েছে, তেমনি ফলাফল প্রকাশের পর অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং পরিবার ও সমাজের চাপে শিক্ষার্থীরা ভেঙে পড়ছে। সহপাঠীদের সঙ্গে তুলনা, পারিবারিক সম্মান রক্ষার চাপ ও ‘ফেল মানেই জীবন শেষ’ এই ভুল ধারণা শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মঘাতী মনোভাব সৃষ্টি করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা প্রতিরোধযোগ্য, যদি পরিবার ও সমাজ যথাসময়ে সহানুভূতিশীল ভূমিকা পালন করে।

মনোবিজ্ঞানী ডা. শারমিন নাসরিন বলেন, “শুধু ভালো ফলের জন্য বাচ্চাদের চাপ দিলে তারা নিজেদের মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে শেখে না। ব্যর্থতা যে জীবনের অংশ এবং তা থেকে শেখা যায়- এ শিক্ষাটিই সবচেয়ে জরুরি।”

তিনি আরো বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং সেশন রাখা, অভিভাবকদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের আত্মমর্যাদা গঠনে পাঠ্যসূচিতে মানসিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার এখনই সময়।

এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করাটা অবশ্যই প্রশংসনীয়, কিন্তু ব্যর্থ হওয়াটাও জীবনের শেষ নয়- এই বোধ পরিবার, সমাজ এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে ছাত্রছাত্রীদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। শিক্ষা হোক জীবনের প্রতি ভালোবাসা শেখার মাধ্যম, আত্মহননের নয়।

জনপ্রিয় টার্গেট

ফলাফলের চাপ নয়, জীবন হোক ভালোবাসার শিক্ষা

এসএসসি ফলাফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা: সচেতনতার ঘাটতিই মূল কারণ

প্রকাশ: ০১:১১:৩০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ জুলাই ২০২৫

২০২৫ সালের ১০ জুলাই সারাদেশে একযোগে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর দেশজুড়ে একের পর এক আত্মহত্যার মর্মান্তিক ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে। আশানুরূপ ফলাফল না পাওয়ায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় একাধিক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন ও গণমাধ্যম সূত্র।

হবিগঞ্জ, বগুড়া, কুমিল্লা, বরিশাল ও কক্সবাজারসহ দেশের অন্তত পাঁচটি জেলায় শিক্ষার্থীরা আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। আর এ ঘটনাগুলো কেবল নির্দিষ্ট পরিবারে নয়, সারা দেশের সচেতন মহলে শোক, আতঙ্ক এবং গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। হবিগঞ্জের মাধবপুরে ফারজানা আক্তার (১৬) নামের একজন ছাত্রী পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। সে স্থানীয় একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল।

বগুড়ার শেরপুরে গণিতে এ প্লাস না পেয়ে হতাশ সুমাইয়া আক্তার (১৭) আত্মহত্যা করে। তার পরিবার জানায়, সুমাইয়া সব বিষয়ে ভালো ফল করলেও গণিতে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। কুমিল্লার বুড়িচংয়ে প্রভা নামের এক শিক্ষার্থী দুটি বিষয়ে ফেল করায় ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ফাঁস দেয়। তার বাবা বিদেশে থাকেন এবং মেয়ের মৃত্যুর খবরে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

বরিশাল বিভাগের দুটি এলাকায় ফেল করায় দুই ছাত্রী আত্মহত্যা করেছে বলে জানা গেছে। কক্সবাজার সদরে প্রিয়তম রুদ্র নামের এক ছাত্র জন্মদিনের ঠিক আগের দিন অকৃতকার্য হওয়ার দুঃখে আত্মহত্যা করে। এছাড়া কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলায় এক শিক্ষার্থী বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে এবং বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বিভিন্ন স্থান থেকে আত্মহত্যার চেষ্টার আরও খবর আসছে।

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৬৮.৪৫ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় ১৫ শতাংশের মতো কম। পাশাপাশি জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও হ্রাস পেয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পরিসংখ্যানের পেছনে যেমন শিক্ষাগত কারণে দুর্বলতা রয়েছে, তেমনি ফলাফল প্রকাশের পর অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং পরিবার ও সমাজের চাপে শিক্ষার্থীরা ভেঙে পড়ছে। সহপাঠীদের সঙ্গে তুলনা, পারিবারিক সম্মান রক্ষার চাপ ও ‘ফেল মানেই জীবন শেষ’ এই ভুল ধারণা শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মঘাতী মনোভাব সৃষ্টি করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা প্রতিরোধযোগ্য, যদি পরিবার ও সমাজ যথাসময়ে সহানুভূতিশীল ভূমিকা পালন করে।

মনোবিজ্ঞানী ডা. শারমিন নাসরিন বলেন, “শুধু ভালো ফলের জন্য বাচ্চাদের চাপ দিলে তারা নিজেদের মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে শেখে না। ব্যর্থতা যে জীবনের অংশ এবং তা থেকে শেখা যায়- এ শিক্ষাটিই সবচেয়ে জরুরি।”

তিনি আরো বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং সেশন রাখা, অভিভাবকদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের আত্মমর্যাদা গঠনে পাঠ্যসূচিতে মানসিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার এখনই সময়।

এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করাটা অবশ্যই প্রশংসনীয়, কিন্তু ব্যর্থ হওয়াটাও জীবনের শেষ নয়- এই বোধ পরিবার, সমাজ এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে ছাত্রছাত্রীদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। শিক্ষা হোক জীবনের প্রতি ভালোবাসা শেখার মাধ্যম, আত্মহননের নয়।