চারা গাছের বদলে মরা ডাল পোঁতার ভিডিও ফাঁসের পর তোলপাড়; শিক্ষা কর্মকর্তাকে জুতার মালা পরিয়ে ১৬ বছর বরখাস্ত থাকা সেই শিক্ষকের বিরুদ্ধে এবার কক্ষ ভাড়া ও বিদ্যুৎ চুরির অভিযোগ।

গাছের ডাল পুঁতে ‘বৃক্ষরোপণ’, ক্লাস ফাঁকি ও কক্ষ ভাড়া: সোনাকুরের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড়

পিরোজপুর জেলার কাউখালী উপজেলার সোনাপুর গ্রামের ‘১৪ নং মধ্য সোনাকুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’-এর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শ্যামল চন্দ্র হালদারের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে।

সরকারি বরাদ্দের টাকা আত্মসাৎ, শিক্ষার্থীদের নিম্নমানের গাইড বই কিনতে বাধ্য করা, ম্যানেজিং কমিটির নামে চাঁদাবাজি, বিদ্যালয়ের কক্ষ বহিরাগতদের কাছে ভাড়া দেওয়া এবং চারা গাছের বদলে মরা ডাল পুঁতে ভুয়া বৃক্ষরোপণ উৎসব দেখানোর মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি অতীতে শিক্ষা কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করে দীর্ঘ ১৬ বছর বরখাস্ত থাকার পরও তার স্বভাব বদলায়নি বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।

ঘটনার সূত্রপাত গত ১৫ জুলাই ২০২৬ তারিখ। ঐদিন দেশব্যাপী জাতীয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিদ্যালয়ে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শ্যামল চন্দ্র হালদার কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে নিয়ে গাছের চারা রোপণের পরিবর্তে একটি আম গাছের ডাল, একটি রয়না গাছের ডাল এবং একটি বরই (কুল) গাছের ডাল মাটিতে পুঁতে রাখেন। এরপর সেই ডালগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে সরকারি দপ্তরে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘বৃক্ষরোপণ সফল’ হয়েছে বলে আপলোড করেন।

বিষয়টি স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকদের নজরে আসলে তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং গণমাধ্যমকর্মীদের অবহিত করেন। পরদিন ১৬ জুলাই বিদ্যালয়ে সাংবাদিকরা উপস্থিত হলে এক নজিরবিহীন সত্য বেরিয়ে আসে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক এবং অভিভাবকদের সামনেই শিক্ষার্থীরা মাটিতে পোঁতা সেই আম ও বরই গাছের ডালগুলো আলতো টানে মাটি থেকে তুলে আনে। দেখা যায়, সেগুলোতে কোনো শিকড় বা মাটি ছিল না; চাক্ষুষ প্রমাণ হয় যে তা ছিল স্রেফ কাটা ডাল। জালিয়াতির এই দৃশ্যটি ক্যামেরায় ভিডিও ফুটেজ হিসেবে ধারণ করা হয়, যা বর্তমানে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। এ সময় সাংবাদিকরা শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করলে তারা সরলমনে স্বীকার করে যে, শিক্ষকরাই তাদের এভাবে ডাল পুঁততে বলেছিলেন।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, তিনি সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বিদ্যালয়ের নিচতলার একটি কক্ষ নদীতে বালু ভরাট ও পার্লিংয়ের কাজে নিয়োজিত বহিরাগত শ্রমিকদের কাছে ভাড়া দিয়েছেন। প্রায় ১০-১৫ দিন ধরে ওই শ্রমিকরা স্কুল প্রাঙ্গণ ও কক্ষ ব্যবহার করছেন। শুধু তাই নয়, সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা বলে ওই শ্রমিকদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ বিল বাবদ মোটা অঙ্কের অর্থও পকেটে পুরেছেন তিনি।

সরেজমিনে তদন্তে দেখা যায়, প্রধান শিক্ষকের নির্দেশে শ্রমিকরা সম্পূর্ণ অবৈধভাবে বিদ্যালয়ের মূল বিদ্যুৎ মিটার থেকে তার টেনে নিজেদের ইচ্ছামতো বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন। প্রধান শিক্ষক প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করতে চাইলেও পরবর্তীতে নৈশপ্রহরী কাম দপ্তরি সাংবাদিকদের সামনে স্বীকার করেন যে, প্রধান শিক্ষকের অনুমতি নিয়েই ই সন্ধ্যার অন্ধকারে এই বিদ্যুৎ লাইন নেওয়া হয়েছিল এবং শ্রমিকরা সেখানে নিয়মিত থাকছেন। এই বিদ্যুৎ বিল বাবদ টাকা লেনদেনের একটি স্পষ্ট ভয়েস রেকর্ডিং স্থানীয়দের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শ্যামল চন্দ্র হালদার বড় ধরনের আর্থিক বাণিজ্য করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কমিটির সাধারণ সদস্য পদের জন্য আবেদনকারী প্রতি সদস্যের কাছ থেকে তিনি ১,০০০ টাকা করে আদায় করেন। এমনকি বিদ্যোৎসাহী সদস্য পদের প্রার্থীর কাছ থেকেও সমপরিমাণ টাকা নেন। পরবর্তীতে কোনো নির্বাচন ছাড়াই কমিটি গঠন সম্পন্ন হলেও, অন্যান্য সদস্যদের কাছ থেকে নেওয়া সেই টাকা তিনি আর ফেরত দেননি। টাকা ফেরত চাইতে গেলে তিনি স্থানীয় প্রভাবশালী ও ভুক্তভোগী সদস্যদের নানাভাবে হয়রানি করছেন বলে অভিযোগ।

অভিযোগে জানা যায়, প্রধান শিক্ষক শ্যামল চন্দ্র হালদার শ্রেণিকক্ষে কোনো পাঠদান করেন না। বিদ্যালয়ে এসে প্রশাসনিক কোনো কাজ না করেই বেলা ১২টা বাজলেই তিনি স্কুল ত্যাগ করেন। প্রধান শিক্ষকের এমন দায়িত্বহীনতার কারণে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরাও একপ্রকার কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা সঠিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং দুপুরের পর বিদ্যালয়টি প্রায় অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে।

এছাড়া, বিভিন্ন লাইব্রেরি ও নিষিদ্ধ গাইড বই কোম্পানির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধা (কমিশন) নিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের নিম্নমানের ও ভুলভ্রান্তিতে ভরা গাইড বই কিনতে বাধ্য করছেন। কোনো শিক্ষার্থী ওই নির্দিষ্ট কোম্পানির বই না কিনলে তাকে শ্রেণিকক্ষে মানসিক হেনস্থার শিকার হতে হয় বলেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অভিভাবক জানিয়েছেন।

সরকার কর্তৃক প্রতি বছর বিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য স্লিপ ফান্ড, প্রাক-প্রাথমিক ফান্ড এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বাবদ যে বার্ষিক সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়, তার কোনো কাজই বিদ্যালয়ে দৃশ্যমান নয়। ভুয়া ভাউচার ও নামমাত্র কাজ দেখিয়ে প্রতি বছর এই বরাদ্দের পুরো টাকা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিজে আত্মসাৎ করেন বলে বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা জানান।

স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, শ্যামল চন্দ্র হালদারের এই ঔদ্ধত্য ও দুর্নীতি নতুন কিছু নয়। এর আগে ২০০৯ সালে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জনাব আমিনুল ইসলাম মহোদয়ের গলায় জুতার মালা পরানোর মতো এক জঘন্য ও নজিরবিহীন অপরাধের সাথে তিনি জড়িত ছিলেন। সেই বিভাগীয় মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে তিনি দীর্ঘ ১৬ বছর চাকরি থেকে বরখাস্ত ছিলেন। দীর্ঘ সময় পর পুনর্বহাল হয়েও তিনি পুনরায় একই ধরনের দুর্নীতি ও জালিয়াতির চক্র গড়ে তুলেছেন।

এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শ্যামল চন্দ্র হালদারের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে (০১৭১২০৮৭৯৪৬) কয়েকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোনটি রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার কোনো মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং সরকারি সম্পদের অপব্যবহার রোধে এই দুর্নীতিপরায়ণ ও জালিয়াতি চক্রের হোতা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শ্যামল চন্দ্র হালদারের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষ দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ শাস্তি এবং তাকে স্থায়ীভাবে বরখাস্তের দাবি জানিয়েছেন সোনাকুর গ্রামের সর্বস্তরের জনগণ ও অভিভাবক মহল।

এ বিষয়ে জেলা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, লিখিত অভিযোগ এবং ভিডিও-অডিও ফুটেজের সত্যতা যাচাই করে অতি দ্রুত উক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

গাছের ডাল পুঁতে ‘বৃক্ষরোপণ’, ক্লাস ফাঁকি ও কক্ষ ভাড়া: সোনাকুরের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড়

চারা গাছের বদলে মরা ডাল পোঁতার ভিডিও ফাঁসের পর তোলপাড়; শিক্ষা কর্মকর্তাকে জুতার মালা পরিয়ে ১৬ বছর বরখাস্ত থাকা সেই শিক্ষকের বিরুদ্ধে এবার কক্ষ ভাড়া ও বিদ্যুৎ চুরির অভিযোগ।

গাছের ডাল পুঁতে ‘বৃক্ষরোপণ’, ক্লাস ফাঁকি ও কক্ষ ভাড়া: সোনাকুরের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড়

প্রকাশ: ০৬:৪৬:৩৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

পিরোজপুর জেলার কাউখালী উপজেলার সোনাপুর গ্রামের ‘১৪ নং মধ্য সোনাকুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’-এর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শ্যামল চন্দ্র হালদারের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে।

সরকারি বরাদ্দের টাকা আত্মসাৎ, শিক্ষার্থীদের নিম্নমানের গাইড বই কিনতে বাধ্য করা, ম্যানেজিং কমিটির নামে চাঁদাবাজি, বিদ্যালয়ের কক্ষ বহিরাগতদের কাছে ভাড়া দেওয়া এবং চারা গাছের বদলে মরা ডাল পুঁতে ভুয়া বৃক্ষরোপণ উৎসব দেখানোর মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি অতীতে শিক্ষা কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করে দীর্ঘ ১৬ বছর বরখাস্ত থাকার পরও তার স্বভাব বদলায়নি বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।

ঘটনার সূত্রপাত গত ১৫ জুলাই ২০২৬ তারিখ। ঐদিন দেশব্যাপী জাতীয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিদ্যালয়ে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শ্যামল চন্দ্র হালদার কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে নিয়ে গাছের চারা রোপণের পরিবর্তে একটি আম গাছের ডাল, একটি রয়না গাছের ডাল এবং একটি বরই (কুল) গাছের ডাল মাটিতে পুঁতে রাখেন। এরপর সেই ডালগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে সরকারি দপ্তরে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘বৃক্ষরোপণ সফল’ হয়েছে বলে আপলোড করেন।

বিষয়টি স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকদের নজরে আসলে তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং গণমাধ্যমকর্মীদের অবহিত করেন। পরদিন ১৬ জুলাই বিদ্যালয়ে সাংবাদিকরা উপস্থিত হলে এক নজিরবিহীন সত্য বেরিয়ে আসে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক এবং অভিভাবকদের সামনেই শিক্ষার্থীরা মাটিতে পোঁতা সেই আম ও বরই গাছের ডালগুলো আলতো টানে মাটি থেকে তুলে আনে। দেখা যায়, সেগুলোতে কোনো শিকড় বা মাটি ছিল না; চাক্ষুষ প্রমাণ হয় যে তা ছিল স্রেফ কাটা ডাল। জালিয়াতির এই দৃশ্যটি ক্যামেরায় ভিডিও ফুটেজ হিসেবে ধারণ করা হয়, যা বর্তমানে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। এ সময় সাংবাদিকরা শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করলে তারা সরলমনে স্বীকার করে যে, শিক্ষকরাই তাদের এভাবে ডাল পুঁততে বলেছিলেন।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, তিনি সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বিদ্যালয়ের নিচতলার একটি কক্ষ নদীতে বালু ভরাট ও পার্লিংয়ের কাজে নিয়োজিত বহিরাগত শ্রমিকদের কাছে ভাড়া দিয়েছেন। প্রায় ১০-১৫ দিন ধরে ওই শ্রমিকরা স্কুল প্রাঙ্গণ ও কক্ষ ব্যবহার করছেন। শুধু তাই নয়, সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা বলে ওই শ্রমিকদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ বিল বাবদ মোটা অঙ্কের অর্থও পকেটে পুরেছেন তিনি।

সরেজমিনে তদন্তে দেখা যায়, প্রধান শিক্ষকের নির্দেশে শ্রমিকরা সম্পূর্ণ অবৈধভাবে বিদ্যালয়ের মূল বিদ্যুৎ মিটার থেকে তার টেনে নিজেদের ইচ্ছামতো বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন। প্রধান শিক্ষক প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করতে চাইলেও পরবর্তীতে নৈশপ্রহরী কাম দপ্তরি সাংবাদিকদের সামনে স্বীকার করেন যে, প্রধান শিক্ষকের অনুমতি নিয়েই ই সন্ধ্যার অন্ধকারে এই বিদ্যুৎ লাইন নেওয়া হয়েছিল এবং শ্রমিকরা সেখানে নিয়মিত থাকছেন। এই বিদ্যুৎ বিল বাবদ টাকা লেনদেনের একটি স্পষ্ট ভয়েস রেকর্ডিং স্থানীয়দের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শ্যামল চন্দ্র হালদার বড় ধরনের আর্থিক বাণিজ্য করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কমিটির সাধারণ সদস্য পদের জন্য আবেদনকারী প্রতি সদস্যের কাছ থেকে তিনি ১,০০০ টাকা করে আদায় করেন। এমনকি বিদ্যোৎসাহী সদস্য পদের প্রার্থীর কাছ থেকেও সমপরিমাণ টাকা নেন। পরবর্তীতে কোনো নির্বাচন ছাড়াই কমিটি গঠন সম্পন্ন হলেও, অন্যান্য সদস্যদের কাছ থেকে নেওয়া সেই টাকা তিনি আর ফেরত দেননি। টাকা ফেরত চাইতে গেলে তিনি স্থানীয় প্রভাবশালী ও ভুক্তভোগী সদস্যদের নানাভাবে হয়রানি করছেন বলে অভিযোগ।

অভিযোগে জানা যায়, প্রধান শিক্ষক শ্যামল চন্দ্র হালদার শ্রেণিকক্ষে কোনো পাঠদান করেন না। বিদ্যালয়ে এসে প্রশাসনিক কোনো কাজ না করেই বেলা ১২টা বাজলেই তিনি স্কুল ত্যাগ করেন। প্রধান শিক্ষকের এমন দায়িত্বহীনতার কারণে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরাও একপ্রকার কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা সঠিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং দুপুরের পর বিদ্যালয়টি প্রায় অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে।

এছাড়া, বিভিন্ন লাইব্রেরি ও নিষিদ্ধ গাইড বই কোম্পানির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধা (কমিশন) নিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের নিম্নমানের ও ভুলভ্রান্তিতে ভরা গাইড বই কিনতে বাধ্য করছেন। কোনো শিক্ষার্থী ওই নির্দিষ্ট কোম্পানির বই না কিনলে তাকে শ্রেণিকক্ষে মানসিক হেনস্থার শিকার হতে হয় বলেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অভিভাবক জানিয়েছেন।

সরকার কর্তৃক প্রতি বছর বিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য স্লিপ ফান্ড, প্রাক-প্রাথমিক ফান্ড এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বাবদ যে বার্ষিক সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়, তার কোনো কাজই বিদ্যালয়ে দৃশ্যমান নয়। ভুয়া ভাউচার ও নামমাত্র কাজ দেখিয়ে প্রতি বছর এই বরাদ্দের পুরো টাকা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিজে আত্মসাৎ করেন বলে বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা জানান।

স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, শ্যামল চন্দ্র হালদারের এই ঔদ্ধত্য ও দুর্নীতি নতুন কিছু নয়। এর আগে ২০০৯ সালে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জনাব আমিনুল ইসলাম মহোদয়ের গলায় জুতার মালা পরানোর মতো এক জঘন্য ও নজিরবিহীন অপরাধের সাথে তিনি জড়িত ছিলেন। সেই বিভাগীয় মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে তিনি দীর্ঘ ১৬ বছর চাকরি থেকে বরখাস্ত ছিলেন। দীর্ঘ সময় পর পুনর্বহাল হয়েও তিনি পুনরায় একই ধরনের দুর্নীতি ও জালিয়াতির চক্র গড়ে তুলেছেন।

এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শ্যামল চন্দ্র হালদারের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে (০১৭১২০৮৭৯৪৬) কয়েকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোনটি রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার কোনো মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং সরকারি সম্পদের অপব্যবহার রোধে এই দুর্নীতিপরায়ণ ও জালিয়াতি চক্রের হোতা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শ্যামল চন্দ্র হালদারের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষ দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ শাস্তি এবং তাকে স্থায়ীভাবে বরখাস্তের দাবি জানিয়েছেন সোনাকুর গ্রামের সর্বস্তরের জনগণ ও অভিভাবক মহল।

এ বিষয়ে জেলা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, লিখিত অভিযোগ এবং ভিডিও-অডিও ফুটেজের সত্যতা যাচাই করে অতি দ্রুত উক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।