রাজধানীর উত্তরখান থানার দোবাদিয়া এলাকায় সর্না আক্তার (২৭) নামে দুই সন্তানের এক জননীর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘিরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিনের পারিবারিক নির্যাতন ও মানসিক চাপের কারণে এ মর্মান্তিক ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে। তবে পুলিশ বলছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্তের ভিত্তিতেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
বুধবার দিবাগত রাত আনুমানিক ১টা ৩০ মিনিটে সর্না আক্তারের স্বামী ওমর ফারুক ফাহাদ তার শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের ফোন করে মৃত্যুর সংবাদ জানান। খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং পরে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করা হয়।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, সর্না আক্তার শরীয়তপুর জেলার পদ্মা দক্ষিণ থানার মহরালী হাজিরকান্দি এলাকার ব্যবসায়ী মমিন মাদবরের মেয়ে। প্রায় ১২ বছর আগে উত্তরখান এলাকার বাসিন্দা ওমর ফারুক ফাহাদের সঙ্গে ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী তার বিয়ে হয়। দাম্পত্য জীবনে তাদের দুটি ছেলে সন্তান রয়েছে। বড় সন্তানের বয়স সাত বছর এবং ছোট সন্তানের বয়স তিন বছর।
নিহতের পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে সর্না আক্তার তার মায়ের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তা পাঠান। সেখানে তিনি লিখেন, “মা, তোমার সঙ্গে শেষবার কথা বলতে পারলাম না। আমারে ওরা বাঁচতে দিল না মা। আমার বাচ্চাগুলোর খোঁজ নিও।” এই বার্তাটি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে গভীর শোক ও সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
সর্নার বাবা মমিন মাদবর অভিযোগ করেন, প্রায় এক বছর আগে তার জামাতা ওমর ফারুক ফাহাদ প্রথম স্ত্রীকে না জানিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। দ্বিতীয় বিয়ের পর থেকেই তাদের মেয়ের সংসারে অশান্তি শুরু হয়। তিনি দাবি করেন, দ্বিতীয় বিয়ে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময় পারিবারিক বিরোধ, মানসিক নির্যাতন এবং শারীরিকভাবে হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে।
মমিন মাদবর বলেন, তার মেয়ে সহজ-সরল প্রকৃতির ছিল এবং সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু দ্বিতীয় বিয়ের পর থেকে স্বামীসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্য তাকে ডিভোর্স দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করতেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। তার ভাষ্যমতে, মেয়ে ডিভোর্সে রাজি না হওয়ায় তাকে নানা ধরনের মানসিক ও পারিবারিক চাপের মধ্যে রাখা হতো।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রীর পরিবারের সদস্যরাও এ ঘটনায় জড়িত ছিলেন এবং তার মেয়েকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হতো। এসব কারণে তার মেয়ে চরম মানসিক অস্থিরতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল বলে পরিবারের দাবি।
নিহতের স্বজনরা এ ঘটনাকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখতে রাজি নন। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের নির্যাতন, চাপ এবং পারিবারিক পরিবেশের কারণে সর্নাকে এমন অবস্থার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যা তার মৃত্যুর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে ঘটনার বিষয়ে উত্তরখান থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হাবিবুর রহমান জানান, মৃত্যুর বিষয়টি পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং তদন্তের তথ্য-উপাত্ত পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে যদি কোনো লিখিত অভিযোগ বা মামলা দায়ের করা হয়, তাহলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পুলিশ ঘটনার সব দিক খতিয়ে দেখছে এবং তদন্ত শেষে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের চেষ্টা করবে।
এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দুই শিশু সন্তানকে রেখে এক তরুণীর এমন মৃত্যু নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যেও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।

মোহাম্মদ আমিনুল হক ভূঁইয়া 

























