মসজিদ মুসলমানদের ঈমানি জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। এখানে মানুষ একসাথে নামাজ পড়ে, আল্লাহর স্মরণ করে এবং ইবাদতের মাধ্যমে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে।
একজন মানুষের ধর্মীয় চরিত্র গঠনে ছোটবেলা থেকেই মসজিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। তাই অনেক অভিভাবক সন্তানদের অল্প বয়স থেকেই মসজিদে নিয়ে আসেন। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় একটি উদ্যোগ।
কিন্তু ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে শিশুদের মসজিদে আনার ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম, শিষ্টাচার ও সতর্কতা রয়েছে, যা মানা জরুরি। অন্যথায়, এই ভালো কাজটি অনিচ্ছাকৃতভাবে মুসল্লিদের ইবাদতে বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
হাদিস ও শরিয়তের নির্দেশনা
রাসুলুল্লাহ ﷺ ওয়াসিলা (রাযি.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে বলেছেন: “তোমরা তোমাদের মসজিদকে অবুঝ শিশু ও পাগলদের থেকে দূরে রাখো।” (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৭৫০)
হাদিসটির ব্যাখ্যায় অনেক ওলামায়ে কেরাম বলেছেন- এখানে “অবুঝ শিশু” বলতে এমন শিশুদের বোঝানো হয়েছে, যারা এখনো মসজিদের মর্যাদা, নামাজের গুরুত্ব বা আচরণবিধি বোঝে না। কারণ, তাদের আচরণের কারণে জামাতে মনোযোগ ভঙ্গ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে এর মানে এই নয় যে, শিশুদের মসজিদে আনা যাবে না। বরং, উপযুক্ত বয়সে এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা দেওয়ার পর তাদের মসজিদে আনা উৎসাহিত করা হয়েছে।
বাস্তব পরিস্থিতি
অনেক সময় দেখা যায়, ছোটরা মসজিদে এসে দৌড়ঝাঁপ, উচ্চস্বরে কথা বলা বা খেলাধুলা শুরু করে দেয়। কেউ কেউ নামাজের সময় কাতার ভেঙে ফেলে, আবার কারও কারও আচরণ এতটাই অশোভন হয় যে, মসজিদের পবিত্র পরিবেশ নষ্ট হয়। বিরল হলেও কিছু শিশু অনিচ্ছাকৃতভাবে মসজিদের ভেতরে অশুদ্ধতা সৃষ্টি করতে পারে, যা পুরো মসজিদ পরিস্কার করার প্রয়োজন তৈরি করে।
এমন পরিস্থিতি এড়াতে অভিভাবকদের দায়িত্ব হলো-
১. মসজিদে আসার আগে সন্তানকে শিষ্টাচার শেখানো।
২. নামাজের সময় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার অভ্যাস করানো।
৩. মসজিদের ভেতরে দৌড়াদৌড়ি বা শব্দ করা যে অনুচিত- তা বোঝানো।
৪. শিশু যদি খুব ছোট হয়, তাহলে প্রয়োজনে বাসায় নামাজ পড়া।
শিশুদের কাতারে অবস্থান
ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী, শিশু যদি একজন হয় এবং শান্ত থাকে, তবে তাকে প্রাপ্তবয়স্কদের কাতারেই দাঁড় করানো যেতে পারে। এতে নামাজের কোনো ক্ষতি হয় না।
কিন্তু যদি একাধিক শিশু থাকে, তবে তাদের জন্য আলাদা কাতার করা সুন্নাত। কারণ, এটি জামাতের আদব রক্ষা করে এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখে।
তবে দুষ্টুমি করার প্রবণতা থাকলে বা হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে বড়দের কাতারে রাখাই উত্তম। এতে অভিভাবক সরাসরি তদারকি করতে পারেন।
ভুল ধারণা ও বাস্তবতা
অনেকের মধ্যে একটি ভুল ধারণা রয়েছে নাবালেগ শিশু যদি বড়দের কাতারে দাঁড়ায়, তাহলে পেছনের মুসল্লিদের নামাজ নষ্ট হয়ে যায়। শরিয়তের দৃষ্টিতে এই ধারণা সঠিক নয়। জামাতের আদর্শ নিয়ম অবশ্যই হলো, প্রাপ্তবয়স্করা সামনে ও শিশুরা পেছনে থাকবে; কিন্তু প্রয়োজনে ব্যতিক্রম হলে নামাজের শুদ্ধতায় কোনো সমস্যা হয় না।
শিশুদের মসজিদে আনার উপকারিতা
যথাযথ বয়সে ও সঠিক প্রশিক্ষণে শিশুদের মসজিদে আনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপকারিতা হলো-
- নামাজের প্রতি ভালোবাসা ও অভ্যাস তৈরি হয়।
- ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক শৃঙ্খলা শেখে।
- মসজিদের পরিবেশ ও মুসল্লিদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
- ভবিষ্যতে তারা নিয়মিত ইবাদতে অভ্যস্ত হয়।
শিশুদের মসজিদে আনা শুধু একটি ধর্মীয় কাজ নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ইসলামী সমাজের সঙ্গে যুক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এটি যেন মুসল্লিদের ইবাদতে বিঘ্ন না ঘটায় সেদিকে অভিভাবককে বিশেষ যত্নবান হতে হবে।
সন্তানকে মসজিদের মর্যাদা শেখানো, নামাজে মনোযোগী করা এবং আচরণে সংযত রাখা এ তিনটি বিষয় মেনে চললে শিশুদের মসজিদে আনা হবে উভয় দিক থেকেই কল্যাণকর।
দৈনিক টার্গেট 

























