তবে ইতিহাস সাক্ষী, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দ্রুতই উন্মোচন করেছিল যে কারখানাটির ছদ্মবেশে মূলত তৈরি হচ্ছিল মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম এবং একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রাগার—দিমোনা পারমাণবিক কেন্দ্র। পরবর্তীতে সেই রসিকতামূলক ‘টেক্সটাইল কারখানা’ শব্দবন্ধটি দুই দেশের কর্মকর্তাদের কাছে ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিকে ইঙ্গিত করার বহুল ব্যবহৃত রূপকে পরিণত হয়।
১৯৬০-এর দশকের মধ্যভাগে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার একটি ইউরেনিয়াম প্ল্যান্ট থেকে অস্ত্র তৈরির উপযোগী শত শত পাউন্ড সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম চুরি হয়েছিল। মার্কিন গোয়েন্দাদের মতে, এসব ইউরেনিয়াম ইসরায়েলে পাচার করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ারের মধ্যে একটি গোপন সমঝোতা হয়। তৎকালীন মার্কিন নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের মতে, নীতিটি ছিল—ইসরায়েল প্রকাশ্যে কোনো পারমাণবিক পরীক্ষা চালাবে না বা এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেবে না। আর যুক্তরাষ্ট্রও এই কর্মসূচির কথা স্বীকার বা অস্বীকার করবে না।
তবে ১৯৮৬ সালে দিমোনার সাবেক টেকনিশিয়ান মরদেচাই ভানুনু লন্ডনের দ্য সানডে টাইমস-এ ছবিসহ সমস্ত তথ্য ফাঁস করে দিলে আন্তর্জাতিক মহল ইসরায়েলের পারমাণবিক বোমা তৈরির বিষয়টি নিশ্চিত হয়। পরে মোসাদ ভানুনুকে ইতালি থেকে অপহরণ করে ইসরায়েলে ফিরিয়ে এনে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেয়। তবুও দুই দেশ এখনো বিষয়টি নিয়ে অস্পষ্টতা ও গোপনীয়তা বজায় রেখে এসেছে।
কেন এই নীতি আজ ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্র ও গোয়েন্দা বিষয়ক কমিটির সদস্য হোয়াকিন ক্যাস্ট্রো সিএনএনের একটি সাক্ষাৎকারে মার্কিন নীতির সমালোচনা করে বলেছিলেন, ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে অস্পষ্টতার নীতিটি এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মার্কিন সেনারা যখন মধ্যপ্রাচ্যে, তখন ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ‘রেড লাইন’ কী, তা না জানা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক।
এর মধ্যে গত মঙ্গলবার (৩ অক্টোবর) প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইসরায়েলকে দেওয়া ৪ বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক সহায়তা চলতি বছরের শেষ নাগাদ বন্ধ করা হতে পারে। তবে ট্রাম্প ঠিক কোন অর্থায়নের কথা বলেছেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি। ইসরায়েলকে বছরে ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক রয়েছে। সেটির মেয়াদ ২০২৮ সালে শেষ হওয়ার কথা। এরপর ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কীভাবে দেওয়া হবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যে আলোচনা চলছে। বিষয়টি দুই দেশের মধ্যকার ছয় দশকের অলিখিত সমঝোতায় ফাটল ধরাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সবচেয়ে মজার বিষয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বর্তমানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসের লক্ষ্য নিয়ে সেখানে যুদ্ধ করছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ইরানের প্রায় ১,০০০ পাউন্ড উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও আগামী ৩ বছরে তেহরানের পরমাণু বোমা তৈরির সম্ভাবনা ৫০-৫০। এমন প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব ইতিমধ্যেই হুমকি দিয়েছে, ইরান বানালে তারাও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে। ওয়াশিংটন ও রিয়াদের মধ্যে একটি পারমাণবিক দ্বিপক্ষীয় চুক্তিও বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেসে বিবেচনাধীন রয়েছে।
গত জুনে কংগ্রেসের এক উন্মুক্ত শুনানিতে ক্যাস্ট্রোর প্রশ্নের মুখে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্বীকার করেন, ‘বিশ্বের বেশির ভাগ দেশই মনে করছে, ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র আছে। কিন্তু তারা কখনো তা প্রকাশ্যে স্বীকার করেনি। আর আমাদের পররাষ্ট্রনীতির একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিভিন্ন কারণে আমরাও এটি নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করি না।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই অস্পষ্টতা ও গোপনীয়তার পর্দা যদি আনুষ্ঠানিকভাবে উঠে যায়, তবে তার ফলাফল হবে ভয়ানক। কারণ ওয়াশিংটন যদি ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়টি স্বীকার করে নেয়, তবে সৌদি আরব ও অন্যান্য আঞ্চলিক দেশগুলো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতায় নামবে।
আবার মার্কিন আইন অনুযায়ী, যেসব দেশ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিতে (এনপিটি) স্বাক্ষর না করে গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে, তাদের কোনো মার্কিন সহায়তা বা অস্ত্র দেওয়া নিষিদ্ধ। ফলে মার্কিন আইনি কাঠামোর এক বিশাল সংকট তৈরি হবে। কারণ ইসরায়েল এত দিন গোপণে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কার্যক্রম চালিয়ে এসেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তাও পেয়েছে। অর্থাৎ, ৬০ বছর ধরে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যে অস্পষ্টতা ও গোপনীয়তা বজায় রেখেছিল মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তা এখন চূড়ান্ত সত্য প্রকাশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।

দৈনিক টার্গেট 


























