ট্রাম্পের সামনে থাকা প্রতিটি বিকল্পই সমস্যা ও বিপদসংকুল।
প্রথম বিকল্প হলো, ইরানে আবারও হামলা চালানো। কিন্তু যুদ্ধ শুরু করলে তা ব্যাপকভাবে আরও বেশি অজনপ্রিয় হয়ে উঠবে। এতে জ্বালানির দাম উচ্চ পর্যায়ে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি, নতুন করে সামরিক অভিযান চালালেও আগের চেয়ে ভালো কোনো সামরিক ফলাফল পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
দ্বিতীয় বিকল্প হলো, আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানো। কিন্তু ইরানি কর্মকর্তারা যদি কোনো ছাড় দিতে অস্বীকৃতি জানান, অথবা নির্বাচনে ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিপর্যয়কে তাঁর দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করে আরও কঠোর দাবি তোলেন, তাহলে সমঝোতায় পৌঁছানো ট্রাম্পের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
তৃতীয় বিকল্পটি হলো, ট্রাম্পের সহযোগীদের ভাষায়, ইরানকে ‘শ্বাসরোধ করে রাখা’। অর্থাৎ বর্তমান পরিস্থিতি বজায় রাখা। এর আওতায় থাকবে নৌ অবরোধের পাশাপাশি কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, যার মাধ্যমে ইরানি সরকারকে ধীরে ধীরে পঙ্গু করে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে তেহরান সমঝোতায় কতটা আগ্রহী, তা যাচাই করতে থাকবে ওয়াশিংটন। তবে এই কৌশলের অগ্রগতি দৃশ্যমান হতে কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে।
নির্বাচনের পর যেকোনো উপায়ে যুদ্ধ শেষ করার কথা কয়েক সপ্তাহ ধরেই বলে আসছেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের সাবেক এক উপদেষ্টা মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে বলেছেন, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচনে হেরে যাওয়া এক বিষয়। কিন্তু ট্রাম্প চান না, তাঁকে পরপর দুবার পরাজিত হিসেবে দেখা হোক।’ এ কারণেই ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাও নিশ্চিত নন।
ভ্যান্স রিপাবলিকানদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ককেও বড় ধরনের রাজনৈতিক দায় হিসেবে উল্লেখ করেন।
বুধবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ভ্যান্সের বিশ্লেষণ ‘অনেকাংশেই সত্য’। কারণ, যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে। তবে প্রয়োজন হলে তিনি আবারও একই সিদ্ধান্ত নিতেন বলে জানান ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না। ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যায় না।’ কবে যুদ্ধ শেষ করবেন, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি যখন চাইব, তখনই। তবে কাজটি সঠিকভাবে শেষ করতে হবে। কারণ, তাদের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে পারে না।’
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভ্যান্স ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের মধ্যে এমন একটি পক্ষের নেতৃত্ব দিয়েছেন, যারা যুদ্ধ শেষ করতে ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর পরামর্শ দিয়ে আসছে। সূত্রগুলো জানিয়েছে, ব্যক্তিগত আলোচনায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ইরান-সংক্রান্ত অবস্থান নিয়ে ভ্যান্স তাঁকে সরাসরি আক্রমণ করে বলেছেন, ‘সবকিছু নিয়েই তিনি ভুল করছেন।’
সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, ভ্যান্স সতর্ক করেছিলেন, যুদ্ধটি অত্যন্ত অজনপ্রিয় এবং এর কারণে নির্বাচনে রিপাবলিকানরা পরাজিত হতে পারে। ট্রাম্পের আশপাশে থাকা অধিকাংশ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও ভ্যান্সের সঙ্গে একমত ছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও ট্রাম্প যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার দিকেই বেশি ঝুঁকেছিলেন।
একপর্যায়ে নেতানিয়াহুর চাপের মুখে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই ইরানে হামলা চালানোর কথা বিবেচনা করেছিলেন ট্রাম্প। শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচনের আগে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। তবে তাঁর শীর্ষ উপদেষ্টাদের পরামর্শ উপেক্ষা করে গত সপ্তাহে ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে সমর্থন জানান।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করার সম্ভাব্য প্রস্তুতি শেষ করছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। এ লক্ষ্যে মধ্যপ্রাচ্যে আরও সামরিক সরঞ্জাম ও সক্ষমতা পাঠানো হচ্ছে।
একই সময়ে কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে একটি খসড়া চুক্তিতে সম্মত করানোর চেষ্টা করছেন। এর উদ্দেশ্য হলো, দুই দেশের মধ্যে আবারও যুদ্ধ শুরু হওয়া ঠেকানো এবং সম্ভব হলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সরাসরি আলোচনা পুনরায় শুরু করা। আঞ্চলিক সূত্রগুলো এ তথ্য জানিয়েছে।
নির্বাচনের আগে কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, নির্বাচনে ট্রাম্প পরাজিত হলে তিনি কী করবেন। তবে এ বিষয়ে ট্রাম্পের উপদেষ্টারা কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারেননি বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক সূত্র জানিয়েছে। এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা সবাইকে বলেছিলাম, নির্বাচনে আমাদের ফলাফল কী হয়, তা আগে দেখতে চাই।’
মধ্যস্থতার সঙ্গে যুক্ত কূটনীতিক, ট্রাম্পের উপদেষ্টা এবং মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরানের এই বিজয়োল্লাস ট্রাম্পকে আবারও যুদ্ধ শুরুর দিকে ঠেলে দিতে পারে। থিংক ট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির উপপরিচালক আলী ভায়েজ অ্যাক্সিওসকে বলেন, ‘তেহরানের জন্য সবচেয়ে বড় প্রলোভন হতে পারে ট্রাম্পের রাজনৈতিক দুর্বলতাকে সামরিক দুর্বলতা ভেবে ভুল করা এবং নিজেদের দাবিদাওয়া অতিরিক্ত বাড়িয়ে ফেলা। অথচ বুদ্ধিমানের কাজ হবে, ওয়াশিংটন যখন এখনো সমঝোতায় আগ্রহী, তখনই একটি চুক্তি নিশ্চিত করে নেওয়া।’
ট্রাম্প চাইলে ‘যুদ্ধও নয়, সমঝোতাও নয়’—এমন বর্তমান অচলাবস্থা বজায় রাখার পথও বেছে নিতে পারেন।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ–এর পরিচালক জন র্যাটক্লিফ, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং ট্রাম্পের অন্যান্য উপদেষ্টা চাইছেন, নৌ অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপের অভিযান আরও কিছুদিন চলতে দেওয়া হোক। তাঁদের লক্ষ্য, ইরানের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দেশটিকে ক্রমাগত কোণঠাসা করা।
মোট কথা হলো—ইরানে নিজের লক্ষ্য পূরণ করে যুদ্ধ শেষ করার কোনো সহজ বা নির্বিঘ্ন পথ ট্রাম্পের সামনে নেই। যুদ্ধ পুনরায় শুরু করা, সমঝোতায় পৌঁছানো কিংবা নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের মাধ্যমে চাপ অব্যাহত রাখা—প্রতিটি পথেই রয়েছে রাজনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকি।

দৈনিক টার্গেট 



























