২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ইউক্রেন আধুনিক ইতিহাসের প্রথম দেশ হিসেবে পদ্ধতিগতভাবে যুদ্ধক্ষেত্রের ডেটা বা তথ্য সংগ্রহ শুরু করে। ড্রোন, রাডার, ভিডিও ফিড এবং স্বয়ংক্রিয় সেন্সর থেকে প্রাপ্ত এই বিশাল তথ্য ভান্ডার ইউক্রেনীয় বাহিনীকে রাশিয়ার সামরিক কৌশল অনুমান এবং তাৎক্ষণিক জবাব দিতে সাহায্য করছে। আর এই ডিজিটাল ফ্রন্টলাইনে কিয়েভের মূল সঙ্গী হয়ে ওঠে ফ্লোরিডাভিত্তিক বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান প্যালান্টির।
চলতি বছর ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্যালান্টির যৌথভাবে ‘ব্রাভ-ওয়ান ডেটারুম’ নামক একটি বিশেষায়িত সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম চালু করে। এর উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধক্ষেত্রের প্রকৃত তথ্য ব্যবহার করে সামরিক অ্যাপ্লিকেশনের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রস্তুত করা। তবে এই ডেটা ভাগাভাগি নিয়ে ইউক্রেনের ভেতরেই ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
তবে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে এভাবে রাষ্ট্রের সামরিক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল তথ্য চলে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। অতীতে যেকোনো যুদ্ধের প্রধান কারিগর ছিল সার্বভৌম রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী। কিন্তু বর্তমানে যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণ, লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিতকরণ এবং নজরদারির জন্য রাষ্ট্রগুলোকে বাধ্য হয়ে বেসরকারি জায়ান্ট প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ দেখা গেছে স্পেস-এক্সের ‘স্টারলিংক’ স্যাটেলাইট নিয়ে। যুদ্ধ চলাকালে ইউক্রেনীয় বাহিনী যখন খেরসন পুনরুদ্ধারে বড় ধরনের অভিযান চালাচ্ছিল, ঠিক তখনই টেলিকম সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল স্টারলিংক বন্ধ হওয়ার কারণে। এ ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে যে, সংকটকালে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর হঠকারী সিদ্ধান্ত একটি সার্বভৌম দেশের সামরিক কার্যক্রমকে এক মুহূর্তে অচল করে দিতে পারে।
তবে প্যালান্টিরের বিরুদ্ধে কেবল তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগই নয়, তাদের তৈরি প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনে ব্যবহার হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় চলা ভয়াবহ গণহত্যায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং যুদ্ধক্ষেত্রের ডেটা প্রক্রিয়াকরণের এআই প্ল্যাটফর্ম সরবরাহ করেছে প্যালান্টির। এই প্রযুক্তি হাজার হাজার সাধারণ ফিলিস্তিনির প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ানো সামরিক হামলায় সহায়তা করেছে বলে অভিযোগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর।
এদিকে প্যালান্টির দাবি করে আসছে যে, তারা কেবল গ্রাহকদের ডেটা বিশ্লেষণ করতে সহায়তা করে এবং নিজেরা কখনোই সেই ডেটা সংরক্ষণ বা নিজস্ব উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে না। তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ এবং ডেটা অধিকার কর্মীদের মতে, এ ধরনের প্রযুক্তির প্রয়োগ সামরিক ও বেসামরিক জীবনের মধ্যবর্তী সূক্ষ্ম সীমানাকে সহজেই লঙ্ঘন করতে পারে।

দৈনিক টার্গেট 



























