মূল্যস্ফীতির চাপে সঞ্চয়ের পুরোনো শিক্ষা

  • দৈনিক টার্গেট
  • প্রকাশ: ০৭:৪৭:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
  • ৬ বার পঠিত হয়েছে

প্রতি তিন মাস পরপর আসত সেই বিশেষ দিন। মা আমাদের ডেকে বসাতেন, মাটির ব্যাংক মেঝেতে ঠুকে ভেঙে ফেলতেন। ছড়িয়ে পড়ত কয়েন আর ভাঁজ করা নোট, আমরা ভাইবোনেরা হুমড়ি খেয়ে গুনতে বসতাম। সেই টাকায় মা কিনতেন সংসারের দরকারি কোনো ভালো জিনিস, যা হাতখরচে কখনো কেনা যেত না। কারও কাছে হাত পাততে হয়নি, ঋণ করতে হয়নি। সামান্য সামান্য করে জমানো টাকা মায়ের সম্মান নিয়েই ভালো কিছু হয়ে ঘরে ফিরেছে।

ব্যাংকার ও অর্থনীতির লেখক হিসেবে সঞ্চয়ের তত্ত্ব পড়তে ও লিখতে গিয়ে বারবার সেই মাটির ব্যাংকের কথাই মনে পড়ে। মিতব্যয়িতার এর চেয়ে সুন্দর উদাহরণ আমি দেখিনি। মা কোনো অর্থনীতির বই পড়েননি, কিন্তু জানতেন, মাস শেষে যা বাঁচে তার অপেক্ষায় না থেকে প্রতিদিন একটু একটু সরিয়ে রাখাই বাস্তব পথ। আর জানতেন, অভ্যাস একবার গড়ে উঠলে সামান্য অঙ্কও একদিন বড় হয়ে ফেরে।

এই স্মৃতি কয়েক দিন আগে আরও বেশি করে ফিরে এসেছিল, কারণ ৩১ অক্টোবর ছিল বিশ্ব মিতব্যয়িতা দিবস। ১৯২৪ সালে ইতালির মিলানে প্রথম আন্তর্জাতিক সঞ্চয় ব্যাংক কংগ্রেসে অধ্যাপক ফিলিপ্পো রাভিজ্জা দিনটিকে আন্তর্জাতিক সঞ্চয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। সেদিন স্কুল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আর নারী সংগঠনও মিতব্যয়ের বার্তা ছড়াতে এগিয়ে এসেছিল। অর্থাৎ শুরু থেকেই এটা ব্যাংকারদের একার বিষয় ছিল না; ছিল ঘরে ঘরে পৌঁছানোর বিষয়, ঠিক আমার মায়ের মাটির ব্যাংকের মতো।

মায়ের সেই দিনগুলোর চেয়ে এখনকার হিসাব অনেক কঠিন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে যে পণ্য বা সেবা ১০০ টাকায় মিলত, এ বছরের সেপ্টেম্বরে তার জন্য লেগেছে ১০৮ টাকা ৩৪ পয়সা। মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ, অথচ একই মাসে জাতীয় গড় মজুরি বেড়েছে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। সাড়ে চার বছর ধরে মজুরির বৃদ্ধি দামের বৃদ্ধিকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি। রাজশাহীর মতো শহরে মাসে ৩০ হাজার টাকার সংসারের কথা ধরুন। একই জিনিসপত্র কিনতে এখন লাগে প্রায় ৩২ হাজার ৫০০ টাকা। মাসে আড়াই হাজার, বছরে প্রায় ত্রিশ হাজার টাকার বাড়তি চাপ। এই ফাঁক হয় পাতে কাটছাঁট করে পূরণ হয়, নয়তো মুদিদোকানের খাতায় বাকি হয়ে জমে।

এই চাপের পেছনে আছে এক দূরের যুদ্ধ। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের শঙ্কায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৭ ডলারে উঠেছে, যা পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিশ্বব্যাংক বলছে, ইরান যুদ্ধের কারণে এ বছর বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। যুদ্ধ অন্য দেশে, কিন্তু প্রভাব আমাদের বাজারেও পড়ে, কারণ ট্রাক, বাস আর নৌকা চলে জ্বালানিতে। গত ২০ সেপ্টেম্বর সরকার চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়েছে। বাড়তি পরিবহন খরচের বোঝা শেষ পর্যন্ত চাল, ডাল, সবজির দামে ক্রেতার পকেট থেকেই যায়। অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন সতর্ক করেছেন, এর প্রভাব আগামী দু-এক মাসেও কমবে না।

এই অনিশ্চয়তার মধ্যে সঞ্চয়ের ছবিটা কৌতূহলজনক। গত অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ, এই ৯ মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রির চেয়ে সুদ ও আসল পরিশোধ বেশি হয়েছে; নিট বিক্রি ঋণাত্মক ২ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা। মানুষ তখন জমানো টাকা ভেঙে সংসার চালিয়েছেন। অথচ নতুন অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে নিট বিক্রি উঠেছে ২ হাজার ৫৯ কোটি টাকায়, যা গত পুরো অর্থবছরের নিট বিক্রির প্রায় চার গুণ। আমার মতে, এর পেছনে সুদের হারের চেয়ে অনিশ্চয়তার ভয়ের ওজন বেশি। এমন সময়ে মানুষ এমন জায়গায় টাকা রাখতে চান, যেখানে ঘুম নষ্ট হয় না।

তবে একটা কথা পরিষ্কার বলা দরকার। মিতব্যয়িতা আর অভাবের কারণে খরচ কমানো এক বিষয় নয়। মিতব্যয়িতা হলো সীমিত আয়ের পরিকল্পিত ব্যবহার; কিন্তু আয় দিয়ে ন্যূনতম প্রয়োজনই না মিটলে খরচ কমানোর পরামর্শে সমস্যার সমাধান হয় না। দিনমজুর, রিকশাচালক কিংবা ক্ষুদ্র দোকানির জন্য আগে দরকার ন্যায্য আয়, কাজের সুযোগ আর সাশ্রয়ী শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা। তবু সামর্থ্য অনুযায়ী অল্প কিছু আলাদা রাখার অভ্যাস বিপদের দিনে কাজে আসে। প্রতিদিন ১০০ টাকা জমানো সবার পক্ষে সম্ভব নয়, কিন্তু যাঁর পক্ষে সম্ভব, তাঁর জন্য মাসে তিন হাজার বা বছরে ৩৬ হাজার টাকা জমাও কম নয়।

ব্যক্তির জন্য আমার পরামর্শ সহজ। আয় হাতে আসার পর আগে সঞ্চয়ের অংশটুকু আলাদা করুন, তারপর বাকিটা দিয়ে মাস চালান। মাস শেষে যা বাঁচবে তা জমাব, এই ভাবনায় প্রায় কিছুই বাঁচে না, কারণ খরচ সব সময় হাতের টাকার সমান জায়গা দখল করে নেয়। তিন থেকে ছয় মাসের খরচের সমান অর্থ জরুরি তহবিল হিসেবে রাখুন, অপ্রয়োজনীয় ঋণ এড়িয়ে চলুন, সব টাকা এক খাতে ঢালবেন না। যে প্রস্তাবে ঝুঁকি বোঝা যায় না অথচ লাভ অস্বাভাবিক বেশি, সেখানে থেমে হিসাব করুন। বিয়ে, ঈদ আর সামাজিকতার চাপে সামর্থ্যের বাইরে ব্যয় না করে সন্তানের শিক্ষা আর পরিবারের চিকিৎসার জন্য অর্থ রাখা অনেক বেশি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।

রাষ্ট্রেরও দায় আছে। সরকার এ বছর সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় নামিয়েছে। ঋণনির্ভরতা কমানো ভালো পদক্ষেপ, কিন্তু পাশে দরকার সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ বিকল্প: গ্রামে সহজ ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সঞ্চয়ের সুযোগ, শিশু-কিশোরদের জন্য সঞ্চয় প্রকল্প আর স্কুলের পাঠ্যক্রমে আর্থিক সাক্ষরতা। যে দেশের মানুষ ব্যাংকের বাইরে থাকে, সেখানে মিতব্যয়িতার আহ্বান অর্ধেক পথেই থেমে যায়। সেই সঙ্গে সরকারি প্রকল্পের ব্যয়, বিলম্ব আর অপচয়েও চাই একই শৃঙ্খলা। সাধারণ মানুষকে যখন খরচ কমাতে বলা হয়, রাষ্ট্রীয় ব্যয়েও জবাবদিহি থাকা উচিত। মিতব্যয়িতা মানে উন্নয়ন থামানো নয়, প্রতিটি টাকার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা।

তেলের দাম, যুদ্ধ আর ডলারের বিনিময় হার আমাদের হাতে নেই। আমাদের হাতে আছে নিজের ঘরের নিয়ম। যে পরিবারের কাছে কয়েক মাসের নিরাপত্তা জমা আছে, সে পরিবার দামের ধাক্কা সামলে উঠতে পারে। আর যে দেশের লাখ লাখ পরিবারের এমন জমা আছে, সে দেশ বিদেশি ঋণের কাছে কম হাত পাতে। তাই ৩১ অক্টোবর শুধু উৎসবের ছিল না, এটি একটি ছোট প্রশ্নেরও দিন ছিল—এ মাসে আমি কত টাকা আগামীর জন্য আলাদা করলাম?

আমার মায়ের মাটির ব্যাংকে প্রতিদিন যে কয়েকটা পয়সা পড়ত, তার শব্দ ছিল ছোট, কিন্তু তিন মাস পর সেই ব্যাংক ভাঙার আনন্দ ছিল বড়। উত্তর যত ছোটই হোক, সেটাই একটি সংসারের সাহসের শুরু।

প্রবাসে নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড ও রাষ্ট্রের করণীয়

প্রবাসে নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড ও রাষ্ট্রের করণীয়

আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্র নিজেই তার নাগরিকদের অভিভাবক। তবে বাংলাদেশ একটি আধুনিক রাষ্ট্র কি না কিংবা এই রাষ্ট্রে গণতন্ত্র কতটা আছে অথবা আদৌ আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তারপরও মানতে হবে, অপরাপর অধিকাংশ আধুনিক রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশেও একটি সংবিধান আছে এবং সেখানে…

রিওয়াইল্ডিং: প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের সহজ পথ

রিওয়াইল্ডিং: প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের সহজ পথ

সারা বিশ্বে সবকিছুতে যেন অস্থিরতা চলছে। সামাজিক, অর্থনৈতিক বা পরিবেশগত; কোনো কিছুতেই স্বস্তি নেই। মানুষের অশান্তির কারণও বেশি মানুষ ও মানুষের অতিরিক্ত ভোগস্পৃহা। জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্রমাগত পরিবেশগত বিপর্যয় নিয়ে এখন গবেষক-বিজ্ঞানীরা চিন্তিত।

জনপ্রিয় টার্গেট

মূল্যস্ফীতির চাপে সঞ্চয়ের পুরোনো শিক্ষা

প্রকাশ: ০৭:৪৭:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

প্রতি তিন মাস পরপর আসত সেই বিশেষ দিন। মা আমাদের ডেকে বসাতেন, মাটির ব্যাংক মেঝেতে ঠুকে ভেঙে ফেলতেন। ছড়িয়ে পড়ত কয়েন আর ভাঁজ করা নোট, আমরা ভাইবোনেরা হুমড়ি খেয়ে গুনতে বসতাম। সেই টাকায় মা কিনতেন সংসারের দরকারি কোনো ভালো জিনিস, যা হাতখরচে কখনো কেনা যেত না। কারও কাছে হাত পাততে হয়নি, ঋণ করতে হয়নি। সামান্য সামান্য করে জমানো টাকা মায়ের সম্মান নিয়েই ভালো কিছু হয়ে ঘরে ফিরেছে।

ব্যাংকার ও অর্থনীতির লেখক হিসেবে সঞ্চয়ের তত্ত্ব পড়তে ও লিখতে গিয়ে বারবার সেই মাটির ব্যাংকের কথাই মনে পড়ে। মিতব্যয়িতার এর চেয়ে সুন্দর উদাহরণ আমি দেখিনি। মা কোনো অর্থনীতির বই পড়েননি, কিন্তু জানতেন, মাস শেষে যা বাঁচে তার অপেক্ষায় না থেকে প্রতিদিন একটু একটু সরিয়ে রাখাই বাস্তব পথ। আর জানতেন, অভ্যাস একবার গড়ে উঠলে সামান্য অঙ্কও একদিন বড় হয়ে ফেরে।

এই স্মৃতি কয়েক দিন আগে আরও বেশি করে ফিরে এসেছিল, কারণ ৩১ অক্টোবর ছিল বিশ্ব মিতব্যয়িতা দিবস। ১৯২৪ সালে ইতালির মিলানে প্রথম আন্তর্জাতিক সঞ্চয় ব্যাংক কংগ্রেসে অধ্যাপক ফিলিপ্পো রাভিজ্জা দিনটিকে আন্তর্জাতিক সঞ্চয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। সেদিন স্কুল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আর নারী সংগঠনও মিতব্যয়ের বার্তা ছড়াতে এগিয়ে এসেছিল। অর্থাৎ শুরু থেকেই এটা ব্যাংকারদের একার বিষয় ছিল না; ছিল ঘরে ঘরে পৌঁছানোর বিষয়, ঠিক আমার মায়ের মাটির ব্যাংকের মতো।

মায়ের সেই দিনগুলোর চেয়ে এখনকার হিসাব অনেক কঠিন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে যে পণ্য বা সেবা ১০০ টাকায় মিলত, এ বছরের সেপ্টেম্বরে তার জন্য লেগেছে ১০৮ টাকা ৩৪ পয়সা। মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ, অথচ একই মাসে জাতীয় গড় মজুরি বেড়েছে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। সাড়ে চার বছর ধরে মজুরির বৃদ্ধি দামের বৃদ্ধিকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি। রাজশাহীর মতো শহরে মাসে ৩০ হাজার টাকার সংসারের কথা ধরুন। একই জিনিসপত্র কিনতে এখন লাগে প্রায় ৩২ হাজার ৫০০ টাকা। মাসে আড়াই হাজার, বছরে প্রায় ত্রিশ হাজার টাকার বাড়তি চাপ। এই ফাঁক হয় পাতে কাটছাঁট করে পূরণ হয়, নয়তো মুদিদোকানের খাতায় বাকি হয়ে জমে।

এই চাপের পেছনে আছে এক দূরের যুদ্ধ। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের শঙ্কায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৭ ডলারে উঠেছে, যা পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিশ্বব্যাংক বলছে, ইরান যুদ্ধের কারণে এ বছর বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। যুদ্ধ অন্য দেশে, কিন্তু প্রভাব আমাদের বাজারেও পড়ে, কারণ ট্রাক, বাস আর নৌকা চলে জ্বালানিতে। গত ২০ সেপ্টেম্বর সরকার চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়েছে। বাড়তি পরিবহন খরচের বোঝা শেষ পর্যন্ত চাল, ডাল, সবজির দামে ক্রেতার পকেট থেকেই যায়। অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন সতর্ক করেছেন, এর প্রভাব আগামী দু-এক মাসেও কমবে না।

এই অনিশ্চয়তার মধ্যে সঞ্চয়ের ছবিটা কৌতূহলজনক। গত অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ, এই ৯ মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রির চেয়ে সুদ ও আসল পরিশোধ বেশি হয়েছে; নিট বিক্রি ঋণাত্মক ২ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা। মানুষ তখন জমানো টাকা ভেঙে সংসার চালিয়েছেন। অথচ নতুন অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে নিট বিক্রি উঠেছে ২ হাজার ৫৯ কোটি টাকায়, যা গত পুরো অর্থবছরের নিট বিক্রির প্রায় চার গুণ। আমার মতে, এর পেছনে সুদের হারের চেয়ে অনিশ্চয়তার ভয়ের ওজন বেশি। এমন সময়ে মানুষ এমন জায়গায় টাকা রাখতে চান, যেখানে ঘুম নষ্ট হয় না।

তবে একটা কথা পরিষ্কার বলা দরকার। মিতব্যয়িতা আর অভাবের কারণে খরচ কমানো এক বিষয় নয়। মিতব্যয়িতা হলো সীমিত আয়ের পরিকল্পিত ব্যবহার; কিন্তু আয় দিয়ে ন্যূনতম প্রয়োজনই না মিটলে খরচ কমানোর পরামর্শে সমস্যার সমাধান হয় না। দিনমজুর, রিকশাচালক কিংবা ক্ষুদ্র দোকানির জন্য আগে দরকার ন্যায্য আয়, কাজের সুযোগ আর সাশ্রয়ী শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা। তবু সামর্থ্য অনুযায়ী অল্প কিছু আলাদা রাখার অভ্যাস বিপদের দিনে কাজে আসে। প্রতিদিন ১০০ টাকা জমানো সবার পক্ষে সম্ভব নয়, কিন্তু যাঁর পক্ষে সম্ভব, তাঁর জন্য মাসে তিন হাজার বা বছরে ৩৬ হাজার টাকা জমাও কম নয়।

ব্যক্তির জন্য আমার পরামর্শ সহজ। আয় হাতে আসার পর আগে সঞ্চয়ের অংশটুকু আলাদা করুন, তারপর বাকিটা দিয়ে মাস চালান। মাস শেষে যা বাঁচবে তা জমাব, এই ভাবনায় প্রায় কিছুই বাঁচে না, কারণ খরচ সব সময় হাতের টাকার সমান জায়গা দখল করে নেয়। তিন থেকে ছয় মাসের খরচের সমান অর্থ জরুরি তহবিল হিসেবে রাখুন, অপ্রয়োজনীয় ঋণ এড়িয়ে চলুন, সব টাকা এক খাতে ঢালবেন না। যে প্রস্তাবে ঝুঁকি বোঝা যায় না অথচ লাভ অস্বাভাবিক বেশি, সেখানে থেমে হিসাব করুন। বিয়ে, ঈদ আর সামাজিকতার চাপে সামর্থ্যের বাইরে ব্যয় না করে সন্তানের শিক্ষা আর পরিবারের চিকিৎসার জন্য অর্থ রাখা অনেক বেশি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।

রাষ্ট্রেরও দায় আছে। সরকার এ বছর সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় নামিয়েছে। ঋণনির্ভরতা কমানো ভালো পদক্ষেপ, কিন্তু পাশে দরকার সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ বিকল্প: গ্রামে সহজ ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সঞ্চয়ের সুযোগ, শিশু-কিশোরদের জন্য সঞ্চয় প্রকল্প আর স্কুলের পাঠ্যক্রমে আর্থিক সাক্ষরতা। যে দেশের মানুষ ব্যাংকের বাইরে থাকে, সেখানে মিতব্যয়িতার আহ্বান অর্ধেক পথেই থেমে যায়। সেই সঙ্গে সরকারি প্রকল্পের ব্যয়, বিলম্ব আর অপচয়েও চাই একই শৃঙ্খলা। সাধারণ মানুষকে যখন খরচ কমাতে বলা হয়, রাষ্ট্রীয় ব্যয়েও জবাবদিহি থাকা উচিত। মিতব্যয়িতা মানে উন্নয়ন থামানো নয়, প্রতিটি টাকার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা।

তেলের দাম, যুদ্ধ আর ডলারের বিনিময় হার আমাদের হাতে নেই। আমাদের হাতে আছে নিজের ঘরের নিয়ম। যে পরিবারের কাছে কয়েক মাসের নিরাপত্তা জমা আছে, সে পরিবার দামের ধাক্কা সামলে উঠতে পারে। আর যে দেশের লাখ লাখ পরিবারের এমন জমা আছে, সে দেশ বিদেশি ঋণের কাছে কম হাত পাতে। তাই ৩১ অক্টোবর শুধু উৎসবের ছিল না, এটি একটি ছোট প্রশ্নেরও দিন ছিল—এ মাসে আমি কত টাকা আগামীর জন্য আলাদা করলাম?

আমার মায়ের মাটির ব্যাংকে প্রতিদিন যে কয়েকটা পয়সা পড়ত, তার শব্দ ছিল ছোট, কিন্তু তিন মাস পর সেই ব্যাংক ভাঙার আনন্দ ছিল বড়। উত্তর যত ছোটই হোক, সেটাই একটি সংসারের সাহসের শুরু।

প্রবাসে নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড ও রাষ্ট্রের করণীয়

প্রবাসে নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড ও রাষ্ট্রের করণীয়

আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্র নিজেই তার নাগরিকদের অভিভাবক। তবে বাংলাদেশ একটি আধুনিক রাষ্ট্র কি না কিংবা এই রাষ্ট্রে গণতন্ত্র কতটা আছে অথবা আদৌ আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তারপরও মানতে হবে, অপরাপর অধিকাংশ আধুনিক রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশেও একটি সংবিধান আছে এবং সেখানে…

রিওয়াইল্ডিং: প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের সহজ পথ

রিওয়াইল্ডিং: প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের সহজ পথ

সারা বিশ্বে সবকিছুতে যেন অস্থিরতা চলছে। সামাজিক, অর্থনৈতিক বা পরিবেশগত; কোনো কিছুতেই স্বস্তি নেই। মানুষের অশান্তির কারণও বেশি মানুষ ও মানুষের অতিরিক্ত ভোগস্পৃহা। জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্রমাগত পরিবেশগত বিপর্যয় নিয়ে এখন গবেষক-বিজ্ঞানীরা চিন্তিত।