পরিবেশ অধিদপ্তরের গত ছয় মাসের মাসিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পুরো সময়েই দেশের কোনো না কোনো শহরের বাতাসে ক্ষতিকর অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণা (পার্টিকুলেট ম্যাটার) পিএম ২.৫ অথবা তার চেয়ে কিছুটা বড় বস্তুকণা পিএম ১০ জাতীয় নিরাপদ মানমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশের বায়ুদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টার হিসাবে প্রতি ঘনমিটারে পিএম ২.৫-এর জাতীয় মানমাত্রা ৬৫ মাইক্রোগ্রাম এবং পিএম ১০-এর মানমাত্রা ১৫০ মাইক্রোগ্রাম। গত ছয় মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পিএম ২.৫-এর গড় মাত্রা জাতীয় গ্রহণযোগ্য সীমার চার থেকে ছয় গুণ এবং পিএম ১০-এর গড় মাত্রা দ্বিগুণের বেশি।
প্রথাগতভাবে মূলত রাজধানী এবং কয়েকটি মহানগরের বায়ুদূষণ নিয়ে বেশি আলোচনা বা উদ্বেগ প্রকাশ করা হলেও পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশের বায়ুদূষণ এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক কোনো সমস্যা নয়। মহানগর কিংবা বিভাগীয় শহর, শিল্পাঞ্চল থেকে জেলা-উপজেলা পর্যন্ত সর্বত্রই বায়ুর ক্ষতিকর কণার মাত্রা জাতীয় নিরাপদ সীমা ছাড়িয়ে গেছে। কোনো এলাকায় কয়েক দিন, কোথাও আবার মাসজুড়েই দূষিত ছিল বাতাস। দূষিত বায়ু জনস্বাস্থ্যের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ছয় মাসে দূষণের মাত্রা ও বিস্তৃতি বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হলেও মূল সংকট কমেনি। মার্চ মাসে দেশের কয়েকটি অঞ্চলের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মে মাসে দূষণের ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা গেছে। এ সময়ে রাজধানী ঢাকাসহ সাভার, গাজীপুর, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, ময়মনসিংহ, রংপুরসহ কিছু অঞ্চলের বাতাসে ভাসমান কণার মাত্রা উদ্বেগজনক পর্যায়ে ওঠে। পিএম ২.৫ ও পিএম ১০-এর মাত্রা বারবার এবং দীর্ঘ সময় ধরে নিরাপদ সীমা অতিক্রম করেছে।
জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পরিবেশ অধিদপ্তরের স্টেশনভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পর্যবেক্ষণ করা ১৬টি স্টেশনের প্রতিদিনের দূষণের হিসাবে ২ হাজার ৪৭৬ স্টেশন-দিনের মধ্যে ১ হাজার ১৫২ দিনেই পিএম ২.৫ অথবা পিএম ১০ জাতীয় মানমাত্রা ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ পর্যবেক্ষণে থাকা সময়ের প্রায় ৫০ শতাংশ স্টেশন-দিনেই দূষণ ছিল মানমাত্রার ওপরে।
পরিবেশ অধিদপ্তর দেশের বিভাগীয় ও শিল্পঘন এলাকাগুলোতে ৩১টি ধারাবাহিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে নিয়মিত দূষণের মাত্রা পরিমাপ করে। এসব কেন্দ্রে পিএম ১০, পিএম ২.৫, ওজোন, সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড ও কার্বন মনোঅক্সাইডের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা হয়।
গত ছয় মাসের তথ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা এসেছে পিএম ২.৫-এর মানমাত্রায়। জানুয়ারি মাসে নারায়ণগঞ্জে এর মাত্রা ছিল ৩৮৭ মাইক্রোগ্রাম; যা জাতীয় মানের প্রায় ছয় গুণ বেশি। বায়ুদূষণের সর্বনিম্ন স্তর হিসেবে এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে সেখানে পিএম ১০-এর সর্বোচ্চ মাত্রা ছিল ৫২৩ দশমিক ১ মাইক্রোগ্রাম। এটিও জাতীয় মানমাত্রার সাড়ে তিন গুণ বেশি। রাজধানীর আগারগাঁও, দারুস সালাম, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, কুমিল্লা, খুলনা, নরসিংদীসহ বিভিন্ন স্টেশনে দূষণ মানমাত্রার দ্বিগুণ থেকে ছয় গুণ পর্যন্ত বেশি ছিল।
মার্চে গড় ঘনত্ব কিছুটা কমলেও জাতীয় সীমার ওপরে দূষণ থাকা এলাকার সংখ্যা কমেনি। গাজীপুরে পিএম ২.৫-এর গড় ছিল ১০৬ দশমিক ৯, ময়মনসিংহে ৯৯ দশমিক ১, ঢাকার বিএআরসি স্টেশনে ৯৮ দশমিক ৮ এবং কুমিল্লায় ৯৫ দশমিক ১ মাইক্রোগ্রাম। এ মাসে পিএম ১০-এর গড় চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে ২৩০ দশমিক ৯, ময়মনসিংহে ২০৬ দশমিক ২, রংপুরে ১৭৫ দশমিক ৮ এবং রাজশাহীতে ১৬৮ মাইক্রোগ্রাম ছিল।
ছয় মাসের বায়ুমান পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দেশের কয়েকটি এলাকায় বায়ুদূষণ ছিল প্রায় স্থায়ী। কোনো কোনো মাসে এক দিনও বাতাসের মান জাতীয় মানমাত্রার নিচে নামেনি।
জানুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জ, খুলনা ও রাজশাহীতে পিএম ১০-এর মাত্রা ৩১ দিনের প্রতিদিনই জাতীয় সীমা ছাড়িয়েছে। ফেব্রুয়ারির ২৮ দিনই ঢাকার পরিবেশ অধিদপ্তর স্টেশন, রাজশাহী, কুমিল্লা, চট্টগ্রামের টিভি স্টেশন, ময়মনসিংহ ও গাজীপুরে পিএম ২.৫-এর মাত্রা নির্ধারিত মানের ওপরে ছিল।
মার্চে ঢাকার বিএআরসি স্টেশনে ২১ দিন, কুমিল্লা ও রাজশাহীতে ২০ দিন করে এবং চট্টগ্রামের দুটি স্টেশন ও ময়মনসিংহে ১৮ দিন পিএম ২.৫-এর মাত্রা সীমার ওপরে ছিল।
মে মাসে নারায়ণগঞ্জে পিএম ১০-এর গড় মাত্রা ছিল ৩৩৪ দশমিক ৯ মাইক্রোগ্রাম, যা জাতীয় মানমাত্রার দ্বিগুণের বেশি। তখন নারায়ণগঞ্জে মাসের ৩১ দিনই পিএম ১০-এর মাত্রা সীমা ছাড়িয়েছে। কুমিল্লায় পিএম ২.৫-এর মাত্রা প্রতিদিনই ছিল জাতীয় গ্রহণযোগ্য মাত্রার ওপরে।
দূষণ নিয়ন্ত্রণে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ৫০০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানে ১ হাজার ১৫৭টি মামলা করে ২৩ কোটি ৮৬ লাখ ৪১ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। বন্ধ করা হয় ২৫৮টি ইটভাটার কার্যক্রম। একই সময়ে সিসা ও ব্যাটারি গলানোর কারখানার বিরুদ্ধে ২৯টি অভিযান চালিয়ে ৩৬টি মামলা করা হয়। জরিমানা আদায় হয় ৪০ লাখ ৪০ হাজার টাকা। বন্ধ করা হয়েছে ২৩টি কারখানা। তবে বন্ধ করা কারখানার ওপর নজরদারি না করায় কিছু আবার চালু হওয়ার অভিযোগ আছে।
উন্মুক্ত নির্মাণসামগ্রী থেকে সৃষ্ট ধুলা নিয়ন্ত্রণে ২৩০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ৪২১টি মামলা করা হয়। নির্মাণ, খোঁড়াখুঁড়িসহ উন্নয়নকাজে দূষণ সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনার নির্দেশনাও রয়েছে। এত কিছুর পরও দূষণ কমছে না।
বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী সাইফুদ্দিন বেননুর আজকের পত্রিকাকে বলেন, বায়ুদূষণের অন্যতম ক্ষতিকর উপাদান হলো অতি সূক্ষ্ম কণা পিএম ২.৫ ও পিএম ১০। তুলনামূলকভাবে বড় কণাগুলো শ্বাসতন্ত্রের ওপরের অংশে আটকে গেলেও সূক্ষ্ম কণিকা ফুসফুসের গভীরে ঢুকে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের স্বাভাবিক বিনিময় ব্যাহত করে। দূষিত বায়ুর সালফার, নাইট্রোজেন, কার্বন মনোঅক্সাইড ও সিসার মতো বিষাক্ত উপাদান ফুসফুসের ক্ষতি করে। অ্যাজমা (হাঁপানি) ও সিওপিডির মতো রোগ বাড়িয়ে দেয়।’
কাজী সাইফুদ্দিন বেননুর আরও বলেন, বিশেষ করে সিসা শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর। বাতাসে থাকা সিসার কণা শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা দেয়। এটি তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
বায়ুদূষণ পরিস্থিতি এবং এ বিষয়ে সরকারি উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মুহাম্মদ সোলায়মান হায়দার আজকের পত্রিকাকে বলেন, শুষ্ক মৌসুমে ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যায়। শীতকালে সাত হাজারের বেশি ইটভাটায় ইট পোড়ানো, অবকাঠামো নির্মাণের ধুলা, লাকড়ি-কাঠ এবং ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো ও পৌর বর্জ্য থেকে দূষণ ছড়ায়। এসব উৎস নিয়ন্ত্রণে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনেই বায়ুদূষণের হারে উদ্বেগ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার। তিনি বলেন, ‘বায়ুদূষণের উৎসগুলো আমাদের সবার জানা। ইটভাটা, যানবাহন, শিল্পকারখানা, নির্মাণকাজ ও বর্জ্য পোড়ানো—সবই চিহ্নিত। কিন্তু এসব উৎস নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ ও এনফোর্সমেন্টের ঘাটতি রয়েছে।’
বায়ুদূষণ থেকে রক্ষার বিষয়ে আইন থাকলেও তা মানা হচ্ছে না মন্তব্য করে অধ্যাপক কামরুজ্জমান বলেন, ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধে ২০১৯ সাল থেকে হাইকোর্টের নয়টি নির্দেশনা থাকলেও সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন হয়নি। দূষণ নিয়ন্ত্রণের প্রথম ধাপ হলো দূষণের ধরন ও উৎস সম্পর্কে জানা। তবে পর্যবেক্ষণের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে।
অধ্যাপক কামরুজ্জমান বলেন, এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে বাস্তবায়ন ও এনফোর্সমেন্টে। এ জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের বাজেট, সক্ষমতা ও লোকবল বাড়ানো প্রয়োজন। দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা শহরে বায়ুমান পর্যবেক্ষণ স্টেশন থাকা দরকার।
বিশ্বের খাদ্যব্যবস্থায় ধান, গম ও ভুট্টার আধিপত্য দীর্ঘদিনের। পৃথিবীর মানুষের মোট ক্যালরির অর্ধেকেরও বেশি আসে এই তিন ফসল থেকে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, খরা ও রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বাড়তে থাকায় বিজ্ঞানীরা এখন এমন কিছু কম পরিচিত ফসলের দিকে নজর দিচ্ছেন, যেগুলো ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ
ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার জন্য আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলা হয়েছে, এই অঞ্চলে আকাশ মেঘলা থাকতে পারে। আবহাওয়াও প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। এ সময় পশ্চিম-উত্তর পশ্চিম পূর্ব থেকে ঘণ্টায় ১০-১৫ কিলোমিটার বেগে বাতাস বয়ে যেতে পারে।
পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর কম সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে দুর্বল থেকে মাঝারি অবস্থায় রয়েছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে উত্তর পূর্ব বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে।
দৈনিক টার্গেট 






















