বৈষম্য, বিদ্বেষ, বিচ্ছিন্নতা পুঁজিবাদের অবদান

  • দৈনিক টার্গেট
  • প্রকাশ: ০৮:২৩:১৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
  • ৬ বার পঠিত হয়েছে

ওই রকম কেন, কোনো রকমের গণতন্ত্রই শাসকেরা চান না। না চাওয়াটাই স্বাভাবিক। জনতা বড়ই মারাত্মক বস্তু, তার মাঝখানে ঘর বেঁধে থাকার চেয়ে অনেক ভালো নির্জন দ্বীপে গিয়ে তাঁবু ফেলে বসবাস করা, অবশ্য যদি বাঘ-ভালুকের ভয় না থাকে। তোমার ভোট নেব, তোমার জয়ধ্বনি দেব, কিন্তু তোমার সঙ্গে বসবাস করব না—এটা খুবই মানবিক মনোভঙ্গি। মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী তাই ‘অমন গণতন্ত্রে আমাদের প্রয়োজন নেই’ না বলে ‘গণতন্ত্রই চাই না’ যদি বলতেন, তাহলেও অবাক হতাম না। না, হতাম, অবাক হতে হতো তাঁর স্পষ্টবাদিতা দেখে। মনের কথা অমন অকপটে কেউ বলে না, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীরা। ইট যদি বগলেই থাকে; মুখে ভিন্ন নাম।

সে কথা থাক, কথা হলো ওই প্রধানমন্ত্রী কি ভুল ছবি দিলেন আমাদের? ভয় দেখালেন খামোখা? গণতান্ত্রিক বিশ্বে কি ওসব উপসর্গ পরিদৃশ্যমান নয়? কে অস্বীকার করবে যে তিনি ভুল বলেননি, বাড়িয়েও বলেননি। বড়ই খাঁটি একটি ছবি তুলে ধরেছেন। ছবি অবশ্য আরও পূর্ণাঙ্গ হতো যদি তিনি তাঁর তালিকায় ড্রাগ ও এইডসের নাম করতেন। কী করে বাদ পড়ল জানি না। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের কারচুপি কি না কে বলবে। তারাও আবার গণতান্ত্রিক তো! শুধু যে বনেদি গণতান্ত্রিক বিশ্বে তা তো নয়, নব্য গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও এমন সব হুল্লোড়-হট্টগোল বেঁধেছে, যাদের ঠিক আনন্দদায়ক বলা যাচ্ছে না, তারাও পারছে না বলতে, যারা তথাকথিত স্বৈরশাসনের পতনের পর গণতন্ত্রের ওই ঐতিহাসিক বিজয়াভিযান দেখে আহ্লাদে আটখানা হয়েছিল। একদা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ইতিমধ্যে যারা গণতান্ত্রিক হয়ে গেছে, তারা ‘গণতান্ত্রিকতা’র তারতম্য অনুসারে বিভিন্ন মাত্রায় অরাজকতা ও অপরাধের পঙ্কে নিমজ্জিত হয়েছে।

আরও হবে বলে বিলক্ষণ আশা করা যায়, যত ওঠার চেষ্টা করবে, ততই যাবে দেবে। আকণ্ঠ নিমজ্জিত হবে বলে বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। যে রুশরা কিছুদিন আগেও আমেরিকার কাছে ঈর্ষার পাত্র ছিল, তারা এখন দেশে শিশুদের রাস্তাঘাটে ফেলে দেয় এবং বিদেশে গিয়ে চুরি করে। গণতন্ত্রের জয় হয়েছে বৈকি। সাবেক যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার পর বর্তমান ‘গণতান্ত্রিক’ ব্যবস্থাপনায় সেখানে নিকৃষ্টতম বর্ণবাদী যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। যে মানবগোষ্ঠী সেখানে নিপীড়িত হচ্ছিল, তারা যদি ইহুদি কিংবা খ্রিষ্টান হতো কিংবা মুসলিম হলেও তেলের কারণে মূল্যবান হতো, যেমন কুয়েতিরা ছিল, তাহলে গণতান্ত্রিক আমেরিকা অচিরেই ক্ষিপ্রগতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ত এবং অপর পক্ষকে সবংশে উৎখাত করে গণতন্ত্রপ্রীতির পরিচয় দিত; কিন্তু ব্যাপার তেমন না হওয়ায় কিছুই করছে না, লোকদেখানো ভাবভঙ্গি ছাড়া। আফগানিস্তানে ‘গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে যে মুজাহিদরা লড়েছিল, গণতন্ত্রী আমেরিকা তাদের সাহায্য করতে কোনো রকমের কার্পণ্য করেনি, অর্থ, অস্ত্র, সমর্থন সবকিছু একেবারে উপুড় করে ঢেলে দিয়েছে। এখন ওই মৌলবাদীরা ক্ষমতায় গিয়ে নিজেদের মধ্যে লড়াই বাধিয়ে গণতন্ত্রের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছে। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ যেসব প্রগতিশীল পদক্ষেপ সাবেক আফগান সরকারগুলো নিয়েছিল, গণতন্ত্রী মুজাহিদরা সেগুলো তো নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেই, উপরন্তু গোলাবারুদের ঘায়ে মানুষকেও শেষ করার তালে ছিল। মালয়েশিয়ার প্রাধানমন্ত্রী যদি গণতন্ত্রের আতিশয্যকে ভয়ের কারণ বলে থাকেন, তাহলে অযৌক্তিক কিছু বলেছেন এমন তো বলার উপায় নেই।

কিন্তু ব্যাপারটা কি অতটা সরল? যে রোগের তিনি নিন্দা করছেন, তার নাম কি গণতন্ত্র, নাকি অন্য কিছু? যদি সরাসরি তাকে চিহ্নিত করতে হয়, তাহলে বলতে হয় রোগটির নাম গণতন্ত্র নয়, তার নাম পুঁজিতন্ত্র। চিনতে অনেকেই ভুল করে। কারও কারও ভুল আবার ইচ্ছাকৃত। মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভুলটা ইচ্ছায় করেছিলেন, নাকি অজ্ঞতাবশত করেছেন আমরা জানি না। জানার প্রয়োজনও নেই। কিন্তু এটা জানি যে রোগনির্ণয় তিনি সঠিকভাবে করতে পারেননি। শাসক শ্রেণি গণতন্ত্র চায় না। চাওয়ার কথা নয়। তাই কারণে-অকারণে তারা গণতন্ত্রকে গাল পাড়ে, বুঝতে চায় না যে দোষটা গণতন্ত্রের নয়, অন্য কিছুর। ফলে বেচারা গণতন্ত্র বড়ই জব্দ হয়। ওই সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তাঁরা গণতন্ত্রের দাস হবেন না। বালাই ষাট। দাস হবেন না কেন, বরং গণতন্ত্রকে দাসে পরিণত করবেন।

গণতন্ত্র অবশ্যই একটা আদর্শ ব্যবস্থা। গণতন্ত্র অর্থ কেবল ভোট নয়। কিংবা নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে ঝগড়া-ফ্যাসাদ নয়। গণতন্ত্রের মূল কথাটা হলো অধিকার ও সুযোগের সাম্য। এটা এমন একটা ব্যবস্থা, যেখানে সব মানুষেরই সমান অধিকার থাকবে, সুযোগও থাকবে সবার সমান। একজনের বিকাশ ব্যাহত করবে না অন্যের বিকাশকে। বৈচিত্র্য অবশ্যই থাকবে, কিন্তু বৈষম্য থাকবে না। বাগানে যেমন সব ফুল এক নয়, কিন্তু সব ফুলই ফুল, কোনোটাই আগাছা নয়, তেমনি সমাজেও সব ফুল এক ফুল হবে না, কিন্তু সব ফুলই ফুল থাকবে এবং সমাজটা বাগানই হবে একপ্রকারের, জঙ্গল না হয়ে। পুঁজিবাদ একসময়ে প্রগতিশীল ছিল। সামন্তবাদের তুলনায় অবশ্যই সে অনেক বেশি আধুনিক ও গণতন্ত্রী; কিন্তু পুঁজিবাদ এখন আর গণতন্ত্রের মিত্র নয়। অপরাধ, অধঃপতন, বর্ণবিদ্বেষ, মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতা—এসব পুঁজিবাদের অবদান, গণতন্ত্রের নয়।

এটা তো জানাই আছে আমাদের যে সামন্তবাদ থেকে পুঁজিবাদে আসা অনেকটা গ্রাম থেকে শহরে আসার মতো। শহরে কত রকমের চাঞ্চল্য রয়েছে, গ্রামে যার কিছুই নেই। পুঁজিবাদ এক অর্থে গণতন্ত্রেও বিশ্বাস করে, সামন্তবাদ যা মোটেই করে না। পুঁজিবাদে রাষ্ট্র ও সমাজ কারও পৈতৃক সম্পত্তি নয়; যার যোগ্যতা আছে সে-ই ওপরে উঠবে, পুঁজিবাদ অহরহ বলে এ কথা। বলতে ভালোবাসে। ওটাই তো গণতন্ত্রের মূল কথা, বলবে সে। ঘোষণা করে দেবে যে অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। উদাহরণও দিতে পারবে—দেখছ না, বিল ক্লিনটন, বুশ, বাইডেন ও ট্রাম্প তাঁদের বাপ-দাদার এমন কিছু নাম-ডাক ছিল না, কিন্তু তাঁরা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী গণতন্ত্রের কান্ডারি হয়ে গেছে! সাম্যের এর চেয়ে বড় নিদর্শন আর কী হতে পারে? বটেই তো। বিল ক্লিনটন তো সামান্য ঘরের ছেলেই।

অতি অখ্যাত এক ব্যক্তি দাবি করেছিল যে ক্লিনটন তার সৎভাই। তার সৎভাই হোয়াইট হাউসে, এতে লোকটির ভারি গর্ব। স্বাভাবিক। কিন্তু সব বিল ক্লিনটন কি প্রেসিডেন্ট হয়, নাকি সেই বিল ক্লিনটনই প্রেসিডেন্ট হন, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের ধনিক শ্রেণির একাংশের সমর্থন পান? ওই সমর্থনটি আসল কথা। ওটি পেলে তবেই প্রেসিডেন্ট হওয়া যায়, নইলে নয়। নইলে এখানে-সেখানে ঘোরাফেরা করে, বড়জোর গালগল্প ছড়িয়ে শেষ হয়ে যেতে হয়।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

একজন মধ্যবিত্ত মা বলছি। গল্পের শুরুটা আমার থেকেই। ২০২৩ সালে আমার ছেলের বয়স যখন প্রায় এক বছর, ফেসবুকের মায়েদের একটি গ্রুপে দেখলাম, রোটাভাইরাসে আক্রান্ত এক শিশু ডায়রিয়া আর পানিশূন্যতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি। জানতে পারলাম যে শীতকালে এই ঝুঁকি বেশি, কিন্তু এর টিকা আছে।

সরকারি হাসপাতালে একটি চিকিৎসা যন্ত্র নষ্ট হলে প্রথম প্রশ্নটি করেন রোগী—আবার কবে সেবা পাওয়া যাবে? কিন্তু এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলেই সামনে আসে আরও কিছু জরুরি প্রশ্ন। যন্ত্রটি এখন কোথায়? কার দায়িত্বে রয়েছে? মেরামতের আবেদন কবে করা হয়েছে? সিদ্ধান্ত আটকে আছে কোন দপ্তরে? মেরামতের জন্য কত টাকা…

জনপ্রিয় টার্গেট

বৈষম্য, বিদ্বেষ, বিচ্ছিন্নতা পুঁজিবাদের অবদান

প্রকাশ: ০৮:২৩:১৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

ওই রকম কেন, কোনো রকমের গণতন্ত্রই শাসকেরা চান না। না চাওয়াটাই স্বাভাবিক। জনতা বড়ই মারাত্মক বস্তু, তার মাঝখানে ঘর বেঁধে থাকার চেয়ে অনেক ভালো নির্জন দ্বীপে গিয়ে তাঁবু ফেলে বসবাস করা, অবশ্য যদি বাঘ-ভালুকের ভয় না থাকে। তোমার ভোট নেব, তোমার জয়ধ্বনি দেব, কিন্তু তোমার সঙ্গে বসবাস করব না—এটা খুবই মানবিক মনোভঙ্গি। মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী তাই ‘অমন গণতন্ত্রে আমাদের প্রয়োজন নেই’ না বলে ‘গণতন্ত্রই চাই না’ যদি বলতেন, তাহলেও অবাক হতাম না। না, হতাম, অবাক হতে হতো তাঁর স্পষ্টবাদিতা দেখে। মনের কথা অমন অকপটে কেউ বলে না, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীরা। ইট যদি বগলেই থাকে; মুখে ভিন্ন নাম।

সে কথা থাক, কথা হলো ওই প্রধানমন্ত্রী কি ভুল ছবি দিলেন আমাদের? ভয় দেখালেন খামোখা? গণতান্ত্রিক বিশ্বে কি ওসব উপসর্গ পরিদৃশ্যমান নয়? কে অস্বীকার করবে যে তিনি ভুল বলেননি, বাড়িয়েও বলেননি। বড়ই খাঁটি একটি ছবি তুলে ধরেছেন। ছবি অবশ্য আরও পূর্ণাঙ্গ হতো যদি তিনি তাঁর তালিকায় ড্রাগ ও এইডসের নাম করতেন। কী করে বাদ পড়ল জানি না। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের কারচুপি কি না কে বলবে। তারাও আবার গণতান্ত্রিক তো! শুধু যে বনেদি গণতান্ত্রিক বিশ্বে তা তো নয়, নব্য গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও এমন সব হুল্লোড়-হট্টগোল বেঁধেছে, যাদের ঠিক আনন্দদায়ক বলা যাচ্ছে না, তারাও পারছে না বলতে, যারা তথাকথিত স্বৈরশাসনের পতনের পর গণতন্ত্রের ওই ঐতিহাসিক বিজয়াভিযান দেখে আহ্লাদে আটখানা হয়েছিল। একদা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ইতিমধ্যে যারা গণতান্ত্রিক হয়ে গেছে, তারা ‘গণতান্ত্রিকতা’র তারতম্য অনুসারে বিভিন্ন মাত্রায় অরাজকতা ও অপরাধের পঙ্কে নিমজ্জিত হয়েছে।

আরও হবে বলে বিলক্ষণ আশা করা যায়, যত ওঠার চেষ্টা করবে, ততই যাবে দেবে। আকণ্ঠ নিমজ্জিত হবে বলে বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। যে রুশরা কিছুদিন আগেও আমেরিকার কাছে ঈর্ষার পাত্র ছিল, তারা এখন দেশে শিশুদের রাস্তাঘাটে ফেলে দেয় এবং বিদেশে গিয়ে চুরি করে। গণতন্ত্রের জয় হয়েছে বৈকি। সাবেক যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার পর বর্তমান ‘গণতান্ত্রিক’ ব্যবস্থাপনায় সেখানে নিকৃষ্টতম বর্ণবাদী যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। যে মানবগোষ্ঠী সেখানে নিপীড়িত হচ্ছিল, তারা যদি ইহুদি কিংবা খ্রিষ্টান হতো কিংবা মুসলিম হলেও তেলের কারণে মূল্যবান হতো, যেমন কুয়েতিরা ছিল, তাহলে গণতান্ত্রিক আমেরিকা অচিরেই ক্ষিপ্রগতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ত এবং অপর পক্ষকে সবংশে উৎখাত করে গণতন্ত্রপ্রীতির পরিচয় দিত; কিন্তু ব্যাপার তেমন না হওয়ায় কিছুই করছে না, লোকদেখানো ভাবভঙ্গি ছাড়া। আফগানিস্তানে ‘গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে যে মুজাহিদরা লড়েছিল, গণতন্ত্রী আমেরিকা তাদের সাহায্য করতে কোনো রকমের কার্পণ্য করেনি, অর্থ, অস্ত্র, সমর্থন সবকিছু একেবারে উপুড় করে ঢেলে দিয়েছে। এখন ওই মৌলবাদীরা ক্ষমতায় গিয়ে নিজেদের মধ্যে লড়াই বাধিয়ে গণতন্ত্রের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছে। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ যেসব প্রগতিশীল পদক্ষেপ সাবেক আফগান সরকারগুলো নিয়েছিল, গণতন্ত্রী মুজাহিদরা সেগুলো তো নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেই, উপরন্তু গোলাবারুদের ঘায়ে মানুষকেও শেষ করার তালে ছিল। মালয়েশিয়ার প্রাধানমন্ত্রী যদি গণতন্ত্রের আতিশয্যকে ভয়ের কারণ বলে থাকেন, তাহলে অযৌক্তিক কিছু বলেছেন এমন তো বলার উপায় নেই।

কিন্তু ব্যাপারটা কি অতটা সরল? যে রোগের তিনি নিন্দা করছেন, তার নাম কি গণতন্ত্র, নাকি অন্য কিছু? যদি সরাসরি তাকে চিহ্নিত করতে হয়, তাহলে বলতে হয় রোগটির নাম গণতন্ত্র নয়, তার নাম পুঁজিতন্ত্র। চিনতে অনেকেই ভুল করে। কারও কারও ভুল আবার ইচ্ছাকৃত। মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভুলটা ইচ্ছায় করেছিলেন, নাকি অজ্ঞতাবশত করেছেন আমরা জানি না। জানার প্রয়োজনও নেই। কিন্তু এটা জানি যে রোগনির্ণয় তিনি সঠিকভাবে করতে পারেননি। শাসক শ্রেণি গণতন্ত্র চায় না। চাওয়ার কথা নয়। তাই কারণে-অকারণে তারা গণতন্ত্রকে গাল পাড়ে, বুঝতে চায় না যে দোষটা গণতন্ত্রের নয়, অন্য কিছুর। ফলে বেচারা গণতন্ত্র বড়ই জব্দ হয়। ওই সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তাঁরা গণতন্ত্রের দাস হবেন না। বালাই ষাট। দাস হবেন না কেন, বরং গণতন্ত্রকে দাসে পরিণত করবেন।

গণতন্ত্র অবশ্যই একটা আদর্শ ব্যবস্থা। গণতন্ত্র অর্থ কেবল ভোট নয়। কিংবা নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে ঝগড়া-ফ্যাসাদ নয়। গণতন্ত্রের মূল কথাটা হলো অধিকার ও সুযোগের সাম্য। এটা এমন একটা ব্যবস্থা, যেখানে সব মানুষেরই সমান অধিকার থাকবে, সুযোগও থাকবে সবার সমান। একজনের বিকাশ ব্যাহত করবে না অন্যের বিকাশকে। বৈচিত্র্য অবশ্যই থাকবে, কিন্তু বৈষম্য থাকবে না। বাগানে যেমন সব ফুল এক নয়, কিন্তু সব ফুলই ফুল, কোনোটাই আগাছা নয়, তেমনি সমাজেও সব ফুল এক ফুল হবে না, কিন্তু সব ফুলই ফুল থাকবে এবং সমাজটা বাগানই হবে একপ্রকারের, জঙ্গল না হয়ে। পুঁজিবাদ একসময়ে প্রগতিশীল ছিল। সামন্তবাদের তুলনায় অবশ্যই সে অনেক বেশি আধুনিক ও গণতন্ত্রী; কিন্তু পুঁজিবাদ এখন আর গণতন্ত্রের মিত্র নয়। অপরাধ, অধঃপতন, বর্ণবিদ্বেষ, মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতা—এসব পুঁজিবাদের অবদান, গণতন্ত্রের নয়।

এটা তো জানাই আছে আমাদের যে সামন্তবাদ থেকে পুঁজিবাদে আসা অনেকটা গ্রাম থেকে শহরে আসার মতো। শহরে কত রকমের চাঞ্চল্য রয়েছে, গ্রামে যার কিছুই নেই। পুঁজিবাদ এক অর্থে গণতন্ত্রেও বিশ্বাস করে, সামন্তবাদ যা মোটেই করে না। পুঁজিবাদে রাষ্ট্র ও সমাজ কারও পৈতৃক সম্পত্তি নয়; যার যোগ্যতা আছে সে-ই ওপরে উঠবে, পুঁজিবাদ অহরহ বলে এ কথা। বলতে ভালোবাসে। ওটাই তো গণতন্ত্রের মূল কথা, বলবে সে। ঘোষণা করে দেবে যে অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। উদাহরণও দিতে পারবে—দেখছ না, বিল ক্লিনটন, বুশ, বাইডেন ও ট্রাম্প তাঁদের বাপ-দাদার এমন কিছু নাম-ডাক ছিল না, কিন্তু তাঁরা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী গণতন্ত্রের কান্ডারি হয়ে গেছে! সাম্যের এর চেয়ে বড় নিদর্শন আর কী হতে পারে? বটেই তো। বিল ক্লিনটন তো সামান্য ঘরের ছেলেই।

অতি অখ্যাত এক ব্যক্তি দাবি করেছিল যে ক্লিনটন তার সৎভাই। তার সৎভাই হোয়াইট হাউসে, এতে লোকটির ভারি গর্ব। স্বাভাবিক। কিন্তু সব বিল ক্লিনটন কি প্রেসিডেন্ট হয়, নাকি সেই বিল ক্লিনটনই প্রেসিডেন্ট হন, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের ধনিক শ্রেণির একাংশের সমর্থন পান? ওই সমর্থনটি আসল কথা। ওটি পেলে তবেই প্রেসিডেন্ট হওয়া যায়, নইলে নয়। নইলে এখানে-সেখানে ঘোরাফেরা করে, বড়জোর গালগল্প ছড়িয়ে শেষ হয়ে যেতে হয়।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

একজন মধ্যবিত্ত মা বলছি। গল্পের শুরুটা আমার থেকেই। ২০২৩ সালে আমার ছেলের বয়স যখন প্রায় এক বছর, ফেসবুকের মায়েদের একটি গ্রুপে দেখলাম, রোটাভাইরাসে আক্রান্ত এক শিশু ডায়রিয়া আর পানিশূন্যতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি। জানতে পারলাম যে শীতকালে এই ঝুঁকি বেশি, কিন্তু এর টিকা আছে।

সরকারি হাসপাতালে একটি চিকিৎসা যন্ত্র নষ্ট হলে প্রথম প্রশ্নটি করেন রোগী—আবার কবে সেবা পাওয়া যাবে? কিন্তু এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলেই সামনে আসে আরও কিছু জরুরি প্রশ্ন। যন্ত্রটি এখন কোথায়? কার দায়িত্বে রয়েছে? মেরামতের আবেদন কবে করা হয়েছে? সিদ্ধান্ত আটকে আছে কোন দপ্তরে? মেরামতের জন্য কত টাকা…