প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গত ছয় মাসের রাজনৈতিক আচরণ ও কিছু সিদ্ধান্তকে এই বাস্তবতার আলোকে দেখলে একটি ব্যাপক পরিবর্তনের ধারা চোখে পড়ে। বিষয়টি শুধু তাঁর সাদামাটা পোশাক বা ব্যক্তিগত জীবনযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি দাপ্তরিক কাজে নিজের নাম ও পদের আগে ‘মাননীয়’ বা এ ধরনের সম্মানসূচক শব্দের ব্যবহার পরিহার করতে বলেছেন, সেই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় প্রটোকল ও আড়ম্বর কমানো, সরকারি প্রচারণায় ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা এড়ানো, তাঁর ছবিসংবলিত কোনো ব্যানার ব্যবহার না করা, নিজে গাড়ি চালিয়ে রাজধানীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা দেখা, সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত করে রাস্তা বন্ধ না করা, আহত সেনাসদস্য বা দলীয় কর্মীদের হাসপাতালে দেখতে যাওয়া—এ ধরনের ছোট ছোট পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের মতো একটি প্রাক্-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের মধ্যে পাঁচ দশকের অধিককাল চলমান ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত প্রচলিত দূরত্ব ও জৌলুশকে কমিয়ে আনার একটি বার্তা দিচ্ছেন।
একই রকম বার্তা পাওয়া যায় তাঁর ব্যক্তিগত আচরণের ক্ষেত্রেও। একজন প্রধানমন্ত্রী কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেন, সেটিও ক্ষমতা সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির একটি বহিঃপ্রকাশ। তিনি যখন ক্ষমতার দৃশ্যমান চাকচিক্য কমান, নিজেকে বিনয়ের ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেন, তখন সাধারণ নাগরিক ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বও অনেকাংশে কমে যায়।
তবে এর প্রভাব শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। ক্ষমতার শীর্ষে ব্যবহৃত ভাষা ধীরে ধীরে তৃণমূলের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করে। নেতা যদি প্রতিপক্ষকে অপমান করেন, মাঠপর্যায়ের কর্মীরাও সেটিকেই রাজনৈতিক আচরণের মডেল হিসেবে অনুশীলন করেন। বিপরীতে শীর্ষ নেতৃত্ব যদি সংযত থাকেন, ভিন্নমতকে রাজনৈতিক পরিসরের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং বিরোধীদের উদ্বেগের জবাব শালীনভাবে দেন, তবে দলের তৃণমূলেও একটি ভিন্ন বার্তা যায়।
বাংলাদেশে এর প্রভাব ইতিমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। সরকারি দলের জ্যেষ্ঠ কিংবা মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মধ্যেও ভাষা কিংবা আচরণের মধ্যে ক্রমাগত শালীনতা এবং বিনয়ের ভাব ক্রমান্বয়ে পরিলক্ষিত হচ্ছে।
সরকারের কর্মকাণ্ডকে মানুষের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগগুলো সফল হলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন ঘটতে পারে, তা হলো—রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার দূরত্ব কমে যাওয়া।
কারণ বাংলাদেশের মানুষ এখন বক্তৃতার চেয়ে ফলাফল চায়। তারা জানতে চায় না সরকার কী বলছে, তারা দেখতে চায় সরকার কী করছে। একজন কৃষক সার, কীটনাশক পাচ্ছেন কি না, তাঁর উৎপাদনের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন কি না, একজন তরুণ কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন কি না, একজন ব্যবসায়ী অপ্রয়োজনীয় হয়রানি ছাড়া কাজ করতে পারছেন কি না, একজন সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা ও সরকারি সেবা পাচ্ছেন কি না; মানুষ বিদ্যুৎ, গ্যাস পাচ্ছে কি না—এসবই শেষ পর্যন্ত সরকারের প্রকৃত পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বিনয়ের সম্ভবত আরও তাৎপর্যপূর্ণ প্রকাশ হলো সরকারের সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার না করা। ১৫ বছরের অধিক একটা স্বৈরশাসনের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণ করে মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী সব ক্ষেত্রে সেবা দেওয়া সম্ভব হয়নি, বিদ্যুৎ-গ্যাসের প্রকৃত সমস্যা রয়েছে। সাফল্যের গল্পের পাশাপাশি এ ধরনের বাস্তবতা স্বীকার করার রাজনৈতিক মানসিকতাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রচলিত ক্ষমতার সংস্কৃতিতে সরকার সাধারণত নিজের সাফল্য তুলে ধরে, ব্যর্থতা বা সীমাবদ্ধতা স্বীকারের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে দুর্বল। সেই জায়গায় তারেক রহমান অকপটে প্রকৃত অবস্থা স্বীকার করে বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ গ্রহণের কথা সংসদে জানিয়েছেন এবং জনগণের কাছে আরও সময়, সহযোগিতা চেয়েছেন। এটা কোনো দুর্বলতা নয় বরং রাজনৈতিক বিনয়ের শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ। এটি বাংলাদেশের মতো অত্যন্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি বিশাল বিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।
ইতিহাস কোনো সরকারের গাড়িবহর, প্রটোকল কিংবা ক্ষমতার জৌলুশ মনে রাখে না। ইতিহাস মনে রাখে, কে ক্ষমতাকে মানুষের কাছে নিয়ে গিয়েছিল, কে তাদের কণ্ঠ শুনেছিল এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি ছিল, কে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার সাহস দেখিয়েছিল এবং কে রাষ্ট্রের শক্তিকে নিজের মর্যাদা বাড়ানোর পরিবর্তে মানুষের মর্যাদা বাড়াতে ব্যবহার করেছিল।
লেখক: ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা
আপনি নানা ধরনের অন্যায় করবেন কিন্তু সে অপরাধের জন্য কোনো সাজা হবে না, এটা নিশ্চিত করতে হলে আপনাকে সরকারি দলের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে। নানা সময় সরকারি দলের নানা লোক এই ‘অধিকার’ ভোগ করে এসেছেন, তাই নতুন বিএনপি সরকারে এ রকম নেতা পাওয়া যাবে না—তা কি হয়?
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আলোচনা হলেই হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসকের সংখ্যা, ওষুধের দাম কিংবা যন্ত্রপাতির সংকট সামনে আসে। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চিকিৎসা ব্যবস্থার সবচেয়ে মৌলিক, অথচ তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত ভিত্তি হলো রোগ নির্ণয় বা পরীক্ষাগার সেবা।
দৈনিক টার্গেট 






















