প্রশ্ন হলো, ফ্যাশন দুনিয়ার অতিপরিচিত ও জনপ্রিয় এই ব্যাগের মূল উপাদান আসে কোন জায়গা থেকে? বিশ্বে ব্যবহৃত মোট রাফিয়ার ৮০ শতাংশ সরবরাহ করে পূর্ব আফ্রিকার দ্বীপরাষ্ট্র মাদাগাস্কার। তবে বিশ্বজুড়ে এই পরিবেশবান্ধব ও বিলাসবহুল উপাদানের কদর বাড়লেও, এর পেছনে থাকা মাদাগাস্কারের প্রাচীন ইতিহাস ও কারিগরদের অবদান এত দিন রয়ে গেছে আন্তর্জাতিক প্রচারের আড়ালে।
মাদাগাস্কারের রাজধানী আন্তানানারিভোর ডিজাইনার দোমি সানজির মতে, রাফিয়া মালাগাসি, অর্থাৎ মাদাগাস্কারের অধিবাসীদের জীবনযাত্রার সাংস্কৃতিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দেশের সংবিধানে উল্লেখিত জাতীয় দর্শন ‘ফিহাভানানা’। সেখানে বলা আছে ভাতৃত্ব, সমাজপদ্ধতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের কথা। দোমি সানজি উল্লেখ করেন এই জাতীয় দর্শনের বাস্তব রূপ হলো এই রাফিয়া। এ ধরনের ব্যাগগুলোর আঁশগুলোকে একে অপরের সঙ্গে বুনে মজবুত রূপ দেওয়া হয়। এটাই মালাগাসি সংস্কৃতির একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকার চেতনা ফুটিয়ে তোলে।
রাফিয়া মূলত মাদাগাস্কারের বিশাল আকৃতির রাফিয়া পামগাছের পাতা থেকে সংগৃহীত এক ধরনের প্রাকৃতিক আঁশ। এই গাছের পাতা ২০ মিটার বা ৬৬ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। পাতা ছেঁড়ার পর তার ভেতরের নরম অংশটি ছাড়িয়ে রোদে শুকানো হয়। শুকানোর পর তা তামাটে ও বেইজ রং ধারণ করে। এরপর শুরু হয় দক্ষ কারিগরদের কাজ। একেকটি টুপি বা ব্যাগ হাতে বুনে তৈরি করতে হাজার হাজার সেলাই ও দিনের পর দিন শ্রম দিতে হয়।
বিশ্ববাজারে রাফিয়ার চাহিদা তুঙ্গে হলেও তার সুবিধা সাধারণ কারিগরেরা পান না। জাতিসংঘের তথ্যমতে, মাদাগাস্কারের প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন। এই সুযোগে একশ্রেণির অনিয়ন্ত্রিত সাপ্লাই চেইন স্থানীয় কারিগরদের সস্তা শ্রমে বাধ্য করে। তা ছাড়া অতিরিক্ত ও অপরিকল্পিত কাঁচামাল সংগ্রহের ফলে ২০০০ সাল থেকে মাদাগাস্কারের পূর্ব উপকূলে প্রায় ৪৮.৫ লাখ হেক্টর বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই বৈষম্য ও পরিবেশ শোষণের বিরুদ্ধে কাজ করছেন ইতালিয়ান-ইন্ডিয়ান সামাজিক উদ্যোক্তা এলেন আকবারালি। ২০১৯ সালে তিনি গড়ে তোলেন মেড ফর আ উইমেন নামে একটি সামাজিক উদ্যোগ ও ফ্যাশন ব্র্যান্ড। এই প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১ হাজার কর্মীর ৯০ শতাংশের বেশি নারী, যাঁদের বড় অংশ পারিবারিক নির্যাতনের শিকার বা সমাজ থেকে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। প্রতিষ্ঠানটি তাঁর কর্মীদের উপযুক্ত মজুরির পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও চাইল্ড কেয়ার সুবিধা দেয়। তাঁদের প্রতিটি পণ্যের সঙ্গে একটি কিউআর কোড থাকে। ক্রেতারা তা স্ক্যান করলে জানতে পারেন কোন কারিগর, কীভাবে এবং কোন এলাকা থেকে সংগৃহীত রাফিয়া দিয়ে পণ্যটি তৈরি করেছেন।
বিশ্বের শীর্ষ লাক্সারি ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে মেড ফর আ উইমেন। তবে আকবরালির কাছে লাক্সারি মানে শুধু চোখধাঁধানো ব্র্যান্ডিং বা দামি প্রাইজ ট্যাগ নয়। তাঁর মতে, ‘প্রকৃতির নিজস্ব দান, মানুষের হাতের ছোঁয়া, নৈতিক শ্রম এবং পরিবেশের ক্ষতি না করে কোনো কিছু তৈরি করাই হলো আসল বিলাসিতা বা লাক্সারি।’ এদিকে ডিজাইনার সানজির ভাষায়, বিশ্ব এত দিন মাদাগাস্কারকে শুধু কাঁচামালের দেশ বা অ্যানিমেটেড সিনেমার চরিত্র হিসেবে চিনেছে। কিন্তু কারিগরদের এই অসাধারণ শিল্পকর্মের মাধ্যমে বিশ্ব এখন মাদাগাস্কারকে এক নতুন ‘লাক্সারি অ্যান্ড কালচারাল হাব’ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।

দৈনিক টার্গেট 



























