কথা বলে জানা যায়, সরকারি নিষেধাজ্ঞার সময়টুকু খুবই কষ্টে কাটে এসব জেলেদের। কেউ কেউ সরকারি বরাদ্দের চাল পেলেও সবাই পান না। তাছাড়া চাল পেলেই তো আর হয় না। তেল, নুন, মশলা সবই কিনতে হয় তাঁদের। সেই টাকা জুটবে কোথা থেকে? পাশাপাশি রয়েছে অসুখ বিসুখে চিকিৎসার খরচ, ছেলেমেয়ের লেখাপড়া। সংসার চালাতে অনেকে মহাজন ও বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা থেকে ঋণ নিয়েছেন। মনকে বুঝিয়েছিলেন, মাছ ধরা শুরু হলেই পাল্টে যাবে পরিস্থিতি। তবে মাছ ধরতে গিয়ে এতখানি হতাশ হতে হবে, ভাবেননি তাঁরা।
আজ সোমবার সকালে শিবালয়ের আরিচা মাছঘাটে জেলেরা জানালেন, ২৯ অক্টোবর মধ্যরাতে নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর থেকেই তাঁরা নদীতে মাছ ধরতে নামেন। কয়েক দিন ধরে পদ্মা-যমুনার বিভিন্ন পয়েন্টে জাল ফেলেও আশানুরূপ ইলিশ মিলছে না।
অধিকাংশ জেলেকে সকালে ইলিশবিহীন নৌকা নিয়ে ঘাটে ফিরতে হচ্ছে। দু-একজন চার দফা জাল ফেলেও পেয়েছেন মাত্র এক-দুই কেজি মাছ। অন্য মাছের পরিমাণও নগণ্য।
আরিচা আড়তে মাছ নিয়ে আসা পাবনার খাসচর গ্রামের জেলে মানিক শেখ ও মো. ছাত্তার শেখ বলেন, ‘দীর্ঘ ২২ দিন মাছ ধরা বন্ধ রেখে সরকারি নিষেধাজ্ঞা পালন করেছি। এ সময় কোনো প্রণোদনার চাল পাইনি। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটিয়েছি। নিষেধাজ্ঞা শেষে ২৯ অক্টোবর রাতে নদীতে গিয়ে মাত্র তিন কেজি ইলিশ পেয়েছি। সেগুলো আকারে খুবই ছোট। এভাবে চললে জাল-দড়ি গুটিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।’
আলোকদিয়া চরের জেলে শহিদ মিয়া বলেন, ‘সরকার ২৫ কেজি করে চাল দিয়েছে বলে শুনেছি। কিন্তু আমি এক কেজি চালও পাইনি। আগে নদীতে জাল ফেললে এক থেকে দেড় মণ মাছ পাওয়া যেত। এখন সেখানে এক-দেড় কেজি মাছ পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।’
কুইশাহাটার জেলে ইব্রাহিম ব্যাপারী বলেন, ‘দীর্ঘ ২২ দিন মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা পালন করেছি। আমরা নদীতে নামিনি। নিষেধাজ্ঞা শেষে ছয় খেপ জাল ফেলে মাত্র তিন কেজি মাছ পেয়েছি। কোনো চালও পাইনি। পরিবারের ছয়জন সদস্য নিয়ে সংসার চালানো খুবই কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে।’
জেলেদের পাশাপাশি হতাশ আড়তদাররাও। শিবালয় বাজার মৎস্য আড়ত ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাবেক সভাপতি আলহাজ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘এবার নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পরের দিন এক মণ মাছও বিক্রি করতে পারিনি। অন্যান্য বছর এ সময়ে প্রচুর মাছ বিক্রি করেছি। এবার সেই চিত্র নেই।’
নদীতে ইলিশের উপস্থিতি কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে আব্দুর রাজ্জাক নদীর নাব্য সংকট, ডুবোচর, ভাটিতে বাঁধ এবং কারেন্ট জালের অবাধ ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, ইলিশ গভীর পানির মাছ। ডিম ছাড়ার জন্য এই নদীতে এলেও নদীর গভীরতা কমে যাওয়ায় আগের মতো এ অঞ্চলে আসছে না। এছাড়া ভাটিতে বাঁধ ও কারেন্ট জাল দিয়ে নদীর বিভিন্ন অংশ ঘিরে রাখায় ইলিশের স্বাভাবিক চলাচলও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
শিবালয় উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সাথী রানী নিয়োগী বলেন, ‘নদীতে ডুবোচর, নাব্য সংকট, জাল পুঁতে রাখা এবং দূষণসহ নানা কারণে এবার পদ্মা-যমুনাসহ বিভিন্ন নদ-নদীতে ইলিশের উপস্থিতি কম। ইলিশ গভীর পানির মাছ। চলাচলের পথে বাধা পেলে সামনে না এগিয়ে ফিরে যায়। এ কারণে এবার ইলিশ কম পাওয়া যাচ্ছে।’
জেলেদের সরকারি সহায়তার বিষয়ে সাথী রানী নিয়োগী বলেন, মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান শুরুর পর শিবালয় উপজেলার ২ হাজার ৪৭৩ জন নিবন্ধিত জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ৬১ দশমিক ৮২৫ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।

দৈনিক টার্গেট 





















