সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ীকে চিঠি পাঠিয়েছেন ভ্যান্স। রেজায়ী এর আগে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা কমান্ডার ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের নির্দেশেই চিঠিটি পাঠানো হয়েছে। ভ্যান্স যাচাই করে দেখছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এমন কোনো বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব কি না, যা ট্রাম্পকে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানে স্বল্পস্থায়ী কিন্তু তীব্র হামলা চালানোর চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করছেন, ইরানের কট্টরপন্থী নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করলে আরও ভালো কূটনৈতিক ফল পাওয়া যেতে পারে। যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানি শাসকগোষ্ঠীর নেতাদের হত্যা করার পর তেহরানে এসব কট্টরপন্থী নেতা আরও বেশি ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছেন। গত সপ্তাহে ট্রাম্প বলেছিলেন, তাঁর প্রশাসন ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা করছে না। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, শিগগিরই হামলা চালানো হতে পারে। সে সময় তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনা করছি না। যেকোনোভাবে একটা কিছু ঘটবেই, আর সেটা শিগগিরই ঘটবে।’
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, ভ্যান্সের চিঠি এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে হওয়া আলোচনায় শান্তি প্রস্তাবের সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলো স্থান পায়নি। বরং আলোচনার জন্য সম্ভাব্য একটি কাঠামো তৈরির বিষয়েই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে রেজায়ী বলেছিলেন, ইরানের কয়েকটি মৌলিক দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো আলোচনা করবে না তেহরান।
যুদ্ধ নিয়ে ভ্যান্সের অবস্থানে দ্বিধা
ভ্যান্স প্রকাশ্যে ইরান যুদ্ধের প্রতি সমর্থন জানালেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করার আগে তিনি আরও জোরালো কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প ভ্যান্সকে প্রধান আলোচকের দায়িত্ব দেন। সংঘাতের অবসান ঘটাতে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করতে ভাইস প্রেসিডেন্ট দুবার বিদেশ সফর করেন।
জুনে দুই পক্ষের মধ্যে একটি ‘সমঝোতা স্মারক’ বা ‘মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল কীভাবে স্বাভাবিক করা হবে, তা নিয়ে দুই পক্ষের পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যার কারণে স্বাক্ষরের মাত্র দুই সপ্তাহ পরই সমঝোতাটি ভেস্তে যায়।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ভ্যান্সের এই কূটনৈতিক উদ্যোগ এমন সময়ে এসেছে, যখন রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে আসন হারানোর আশঙ্কা করছেন। এর ফলে কংগ্রেসের একটি বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে দলটি। ভোটারদের একাংশ ট্রাম্প ও তাঁর দলের প্রতি অসন্তোষের কারণ হিসেবে ইরান সংঘাত এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেছেন।
আলোচনায় রেজায়ীয়ের ভূমিকা, অন্য নেতারা কি আড়ালে পড়বেন
আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে রেজায়ীয়ের আবির্ভাব ইরানের অন্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের, যেমন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি কিংবা পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে, আড়ালে ঠেলে দিতে পারে। ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় রেভল্যুশনারি গার্ডের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রেজায়ী। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার হুমকির মুখে তিনি ইরানের একজন প্রভাবশালী, তবে কট্টরপন্থী কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
চলতি মাসের শুরুর দিকে রেজায়ী বলেছিলেন, তেহরান সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। বসন্তের শেষ দিক থেকে দেশটি বেশির ভাগ সময় হামলা থেকে রেহাই পেয়েছে। এ ছাড়া পুরো অঞ্চলের ডেটা সেন্টার ও ইন্টারনেট কেব্লেও হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছিলেন তিনি। রোববার রেজায়ী একটি বিরল পদক্ষেপ হিসেবে তেহরানে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের নিরাপত্তাপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সব পক্ষই তখন উত্তেজনা প্রশমনের উপায় খুঁজছিল। এর আগে এ ধরনের সফরে সাধারণত কূটনীতিকদের অংশগ্রহণই বেশি দেখা গেছে।
পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে অচলাবস্থা
ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করাকে জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তবে এ লক্ষ্য অর্জনে তাঁর অবস্থান বারবার বদলেছে। কখনো তিনি কূটনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা করেছেন, আবার কখনো তেহরানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করতে বোমা হামলার পথ বেছে নিয়েছেন।
কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একাধিকবার আলোচনা শুরু হলেও পরে তা বন্ধ হয়ে গেছে। এসব উদ্যোগ এখন পর্যন্ত কূটনৈতিক অচলাবস্থা ভাঙতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানকে আলোচনার শুরুতেই পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ছাড় দিতে হবে। অন্যদিকে, তেহরান অবিলম্বে অর্থনৈতিক স্বস্তি বা নিষেধাজ্ঞাজনিত চাপ থেকে মুক্তি দাবি করছে।
হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক অবরোধ বজায় রেখেছে। বিতর্কিত এই জলপথ দিয়ে তেল রপ্তানি অব্যাহত থাকলেও তা জ্বালানির উচ্চমূল্য কমানোর জন্য যথেষ্ট হয়নি।
সামনে এগোনোর মতো স্পষ্ট কোনো কূটনৈতিক পথ না থাকায় সাম্প্রতিক দিনগুলোতে নির্বাচনী প্রচারসভায় ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে আবারও যুদ্ধ শুরু হবে বলে তিনি মনে করছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি যখন চাইবেন, তখনই কেবল এই সংঘাতের অবসান ঘটবে। মঙ্গলবার রাতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, ‘তারা একটি চুক্তি করতে চেয়েছে। কিন্তু তারা বিষয়টি টেনে নিয়ে যেতে পছন্দ করে। হয়তো তারা নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করছে বা অন্য কিছু ভাবছে। কিন্তু তাতে তাদের কোনো লাভ হবে না।’

দৈনিক টার্গেট 



























