চলমান এই উত্তেজনার মধ্যে আজ লোহিত সাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও এর মধ্যবর্তী পেরিম দ্বীপের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী স্থানটি থেকে পিছু হটার পর এখন হুতি যোদ্ধারা প্রণালির উপকূলীয় অঞ্চল ও দ্বীপে অবস্থান করছেন।
হুতি বা আনসারুল্লাহ ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলন। এরা রাজধানী সানাসহ দেশের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ২০১৫ সাল থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে এলেও হুতিদের ক্ষমতা পুরোপুরি ভাঙতে পারেনি।
সাম্প্রতিক হামলার দায় স্বীকার করে হুতিরা জানিয়েছে, তারা সৌদি আরবের একটি বিমানঘাঁটি, জ্বালানি অবকাঠামো এবং সীমান্তবর্তী সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে। একই সঙ্গে তারা সৌদি সীমান্তের কাছে ট্রাক বিস্ফোরণের ভিডিওও প্রকাশ করেছে।
চ্যাথাম হাউসের গবেষক লিন্ডসে নিউম্যানের মতে, ২০২৩ সালের পর থেকে হুতিদের হামলায় লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে হরমুজ ও লোহিত সাগরের সংকট এখন একই আঞ্চলিক যুদ্ধের দুটি পরস্পর-সংযুক্ত ফ্রন্টে পরিণত হয়েছে।
গত মঙ্গলবারেই হুতিদের হামলার পর সৌদি আরবের পাল্টা বিমান হামলায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ ডলারে পৌঁছায়।
এর কারণ, সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল রপ্তানিকারক দেশ। তাদের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা হলে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। একই সঙ্গে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব—দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথই ঝুঁকিতে থাকায় বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, হামাস ও হিজবুল্লাহ গত কয়েক বছরে বেশ দুর্বল হয়েছে। কিন্তু হুতিরা এখনো কার্যকর সামরিক শক্তি হিসেবে টিকে আছে এবং ইরানের সবচেয়ে সক্রিয় আঞ্চলিক মিত্রে পরিণত হয়েছে।
সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত এডমন্ড ফিটন-ব্রাউন বলেন, হুতিরা মনে করছে সৌদি আরব দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে ক্লান্ত। এই সুযোগে তারা হামলা জোরদার করেছে। তবে তেহরানের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া এত বড় আকারের হামলা চালানো সম্ভব নয়।
এই পরিস্থিতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আরও জটিল, কারণ জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অন্তর্বর্তী সমঝোতায় আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর বিষয়টি কার্যকরভাবে সমাধান করা যায়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ট্রাম্প এখন হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি সামলাবেন নাকি মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের নিরাপত্তা দেবেন?
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ঘোষণা দিয়েছে, তারা হুতিদের ‘শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডের কঠোর জবাব’ দেবে। তবে একই সঙ্গে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান বলেছেন, কূটনীতির পথ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
অন্যদিকে হুতিদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য নৌজোটে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সম্পৃক্ততার আলোচনা চলছে। যদিও এখনো তারা সরাসরি সামরিক সহায়তায় এগিয়ে আসেনি। তবে যেহেতু তাদের মধ্যে মক্কা চুক্তি নামে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি আছে, সেহেতু সৌদি আরবের প্রয়োজনে তারা অন্যান্য সরাসরি সামরিক সহায়তা দিতে পারে।
তবে সবকিছু মিলিয়ে বেকায়দায় আছেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র যদি শুধু হরমুজে মনোযোগ দেয় এবং লোহিত সাগরের সংকটকে উপেক্ষা করে, তাহলে ইরান-সমর্থিত হুতিরা বৈশ্বিক নৌপথে অস্থিরতা সৃষ্টি করতেই থাকবে। ইতিমধ্যে হুতিরা বাব আল-মান্দেব দখল করে নিয়েছে। এরপরেই অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। ফলে ট্রাম্পের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ কেবল ইরান নয়, ইরানের সঙ্গে যুক্ত সকল আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ককে মোকাবিলা করা।
দি ইন্ডিপেনডেন্ট থেকে সংক্ষেপে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে সাত মাস ধরে চলা যুদ্ধ নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ‘পরপরই’ শেষ হবে। তিনি চলমান এই সংঘাতকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যেন তেহরান নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।
ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল ধরে হুতিদের সাম্প্রতিক দ্রুত অগ্রযাত্রার পেছনে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী কর্পসের (আইআরজিসি) সরাসরি নির্দেশনা ছিল বলে দাবি করেছে ইয়েমেনের সরকারি, ইরানি ও আঞ্চলিক বিভিন্ন সূত্র। তাদের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধে নতুন একটি যুদ্ধফ্রন্ট…
দৈনিক টার্গেট 























