সংস্কৃতির মূল নির্যাসটি আসলে কী? সংস্কৃতি কেবল গান, কবিতা বা লোকজ ঐতিহ্যের খণ্ডিত যোগফল নয়; সংস্কৃতি গড়ে ওঠে মানুষের বোধ, আবিষ্কারের আনন্দ, সাধনা এবং সীমানাকে অতিক্রম করার চিরন্তন আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে। যখন একজন গণিতবিদ দশকের পর দশক ধরে একটি অনুমানের প্রমাণের পেছনে নিজের জীবনের সোনালি সময় উৎসর্গ করেন, তখন সেই সাধনার মাঝেই জন্ম নেয় একধরনের অনন্য মননশীল সৌন্দর্য। রিমান হাইপোথিসিস বা কাকেয়া অনুমানের মতো সমস্যাগুলোর পেছনে মানুষের যে বিনিদ্র রজনী ও ঘাম ঝরেছে, তা-ই মানব সংস্কৃতির বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি নির্মাণ করেছে।
কিন্তু আজ যখন কোনো অ্যালগরিদম বা নিউরাল নেটওয়ার্ক চোখের পলকে সেই প্রজ্ঞার চূড়ায় পৌঁছে যায়, তখন মানুষের যুগের পর যুগের এই সাধনা ও কষ্টের মূল্য এক নিমিষেই ফিকে হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। এত দিন আমরা এটাই জেনে বড় হয়েছি যে শরীরের জোরে যন্ত্র হয়তো মানুষকে পেছনে ফেলে দিতে পারে, কিন্তু সৃজনশীলতা, খাঁটি যুক্তি আর দূরদর্শী ভাবনায় মানুষের মনন পৃথিবীতে উৎকৃষ্ট জায়গা করে আছে, যা ক্রমবিকাশমান। কিন্তু বর্তমান সময়ে যখন দেখা যাচ্ছে, এআই এমন সব জটিল গাণিতিক সমাধান চোখের সামনে এনে হাজির করছে, যা বুঝতে বা বিশ্লেষণ করতেই পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় গণিতবিদদের বছরের পর বছর সময় লেগে যাবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মেধা ও বুদ্ধির অহংকার বা ‘এপিস্টেমিক প্রাইড’ চূর্ণ হয়ে যায়।
এই কৃত্রিম বুদ্ধিবৃত্তিক সাফল্য আমাদের এক গভীর মানসিক ও সাংস্কৃতিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। আমরা যদি নিজেদের তৈরি যন্ত্রের চিন্তার গতি আর গভীরতা ধরতে না পেরে কেবল বোবা দর্শকের মতো চেয়ে থাকি, তবে তা মানবজাতিকে চরম অলসতা ও হীনম্মন্যতার দিকে ঠেলে দেবে। যে সমাজে মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতা বা সাধনার আর কোনো মূল্যায়ন থাকে না, সে সমাজ ধীরে ধীরে প্রাণহীন ও যান্ত্রিক হয়ে পড়তে বাধ্য। মানুষ যদি নিজের মেধা ও বুদ্ধির ওপর থেকে ভরসা হারিয়ে ফেলে, তবে চারপাশের জীবন থমকে যাবে, নেমে আসবে গভীর স্থবিরতা।
তবে এই ধাক্কা কি কেবলই আমাদের সভ্যতার পতন, নাকি দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর এক অনিবার্য আহ্বান? ইতিহাসের প্রতিটা বড় বাঁকেই প্রযুক্তি মানব সংস্কৃতিকে নতুন রূপ দিয়েছে। যেমন মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের পর যখন না বুঝে মুখস্থ করার দিন শেষ হয়ে গেল, কিংবা ক্যামেরা আসার পর যখন ছবি আঁকা বা চারুকলার পুরোনো সংজ্ঞা বদলে গেল, তখনো মানুষ প্রথমে থমকে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ঠিকই তারা নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে। ঠিক তেমনি, গণিত ও যুক্তির জগতে এআইয়ের এই রাজত্ব হয়তো আমাদের নতুন এক শিক্ষা দেবে—জ্ঞানের শেষ কথা কেবল ‘সঠিক উত্তর খুঁজে পাওয়া’ নয়; বরং সেই উত্তর পাওয়ার কঠিন যাত্রাপথ এবং তার ভেতরের মানবিক অনুভূতিগুলোকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা।
এআই হয়তো নিমিষেই জটিল সব সূত্রের জট খুলে দিতে পারে, কিন্তু সেই সূত্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা আসল সৌন্দর্যটুকু উপলব্ধি করার ক্ষমতা শুধু মানুষেরই আছে। একটি গাণিতিক সমীকরণ কেবল একটি সংখ্যার হিসাব নয়; এর পেছনে লুকিয়ে থাকে মহাবিশ্বের রহস্য ভেদ করার এক আদিম ও গভীর আনন্দ। এআই হয়তো নির্ভুল ফলাফল এনে দিতে পারে, কিন্তু সেই ফলাফলে অবাক হওয়ার বিস্ময় বা জয়ের আনন্দটুকু অনুভব করার ক্ষমতা তার নেই।
বিজ্ঞানী ফেদারিকো ফাজিনের মানবচেতনার অনন্যতা কিংবা জ্যাকব ব্রনোওস্কির মানুষের জ্ঞান ও কল্পনার প্রসারের দর্শন যেমনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এআইয়ের এই অভাবনীয় সাফল্যকে যদি আমরা যন্ত্রের কাছে মানুষের আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখি, তবে এই সাংস্কৃতিক অভিঘাত নিশ্চিতভাবেই আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে পঙ্গু করে দেবে। কিন্তু আমরা যদি এই নতুন যুগকে মানব চিন্তার সীমানা বাড়ানোর এক দুর্দান্ত সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করতে পারি, যেখানে যন্ত্র ক্লান্তিহীনভাবে চালিয়ে যাবে জটিল গাণিতিক অনুসন্ধান, আর মানুষ তার মেধা দিয়ে তৈরি করবে তার দার্শনিক ও মানবিক দ্যোতনার মায়াবী বিন্যাস, তবেই হয়তো এই সম্ভাব্য সংকট এক নতুন সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণে রূপ নিতে পারে।
সভ্যতা আজ এক অভূতপূর্ব সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। কার্ল সাগান যেমন বলতেন, আমরা মহাবিশ্বেরই অংশ, যে মহাবিশ্ব নিজেকে জানার জন্য মানুষকে মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে। আবার ফ্রাঙ্ক ড্রেক, যার মহাজাগতিক বুদ্ধিমত্তার সমীকরণ কিংবা লর্ড মার্টিন রিজের মানবজাতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহাবস্থানের ধারণা আমাদের আজ নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে যন্ত্র যখন প্রজ্ঞার সিংহাসনে বসতে শুরু করেছে, তখন মানুষকে নতুন করে খুঁজে নিতে হবে তার মৌলিক পরিচয়। সে কি কেবল তথ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের এক জৈবিক যন্ত্র, নাকি অনুভূতি, বিস্ময় ও সাধনায় সমৃদ্ধ এক মহাজাগতিক সত্তা?
আমাদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব আজ আর কেবল মেধা বা বুদ্ধির একচ্ছত্র আধিপত্যের ওপর নির্ভর করছে না; বরং তা নির্ভর করছে আমরা কীভাবে এই যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তাকে মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে মেলাতে পারছি তার ওপর। মার্টিন রিজের সতর্কবার্তা অনুযায়ী এআই হয়তো আমাদের অস্তিত্বের সমীকরণ বদলে দিচ্ছে, কিন্তু কার্ল সাগানের ভাষায়, আমরা যদি নিজেদের হারিয়ে না ফেলি, তবে যন্ত্র যতই এগিয়ে যাক না কেন, জীবনের গভীর অর্থ খোঁজার এবং গ্যালাক্সিকে ভালোবাসার যে আকাঙ্ক্ষা, তা শেষ পর্যন্ত মানুষেরই নিজস্ব অর্জন হয়ে থাকবে।
আসিফ, বিজ্ঞানবক্তা ও সম্পাদক, মহাবৃত্ত

দৈনিক টার্গেট 

























