বরাদ্দ বাড়লেও দেশের বিভিন্ন অংশে চলতি আমন মৌসুমে প্রয়োজনমতো সার না পাওয়া নিয়ে বিক্ষোভ ও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। কুড়িগ্রামে একের পর এক বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটছে। গত সোমবার রৌমারী মহিলা কলেজপাড়া এলাকায় ডিলার পয়েন্ট ভাঙচুর করা হয়েছে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, সারের অভাব না থাকলেও বেলা ১১টায়ও বিতরণ শুরু না হওয়ায় ভোররাত থেকে অপেক্ষমাণ কৃষকেরা উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তাঁদের মধ্যে অনেকে গুদামের টিনের বেড়া ভেঙে শতাধিক বস্তা সার লুট করেন। একই দিন ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়নের পাটেশ্বরী ব্রিজপাড়া এলাকায় আমজাদের সারের দোকানের সামনে সড়ক অবরোধ করা হয়। কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, গত বছরের তুলনায় আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে জেলায় বিভিন্ন সারের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ইউরিয়ার বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ৮৯৪ মেট্রিক টন। এ বছর তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪ হাজার ৬৪৪ টন।
ডিলার পয়েন্টে অতিরিক্ত চাপ ও বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় জেলার ৯ উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে সার বিক্রি শুরু করেছে স্থানীয় প্রশাসন। কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, ‘গত মঙ্গলবার থেকে কৃষি বিভাগের তালিকাভুক্ত খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিক্রি শুরু করা হয়েছে। এতে করে কৃষকেরা সহজে খুচরা বাজারে সরকার-নির্ধারিত মূল্যে সার পাবেন।’
বিতরণের সমস্যার একই চিত্র রাজশাহীতে। সবশেষ গত সোমবার জেলার পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বরে সারের বরাদ্দ বাড়ানোর দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ হয়েছে। আগামী মাস থেকে রাজশাহীতে আলু চাষ শুরু হবে। জানা গেছে, এ জন্য আলুচাষিদের অনেকে আগাম সার কেনা শুরু করেছেন। এ ছাড়া সার পাওয়া যাচ্ছে না, এমন কথা ছড়িয়ে পড়ার পর চাহিদা না থাকলেও অনেকে সার কিনছেন। ফলে সংকট দেখা দিচ্ছে। কৃষি কর্মকর্তাদের দাবি, মজুতের উদ্দেশ্যে কৃষকেরা আগাম সার কেনার চেষ্টা করছেন। অথচ বর্তমানে মাঠে কী ফসল আছে এবং তাতে কী পরিমাণ সার প্রয়োজন, সে হিসাব করেই বরাদ্দ আসে।
আমনের ভরা মৌসুমে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃষকদের পকেট কাটছেন। নওগাঁ জেলার বিভিন্ন বাজারে ৫০ কেজির ইউরিয়া ও ডিএপি সারের বস্তায় সরকার-নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মহাদেবপুর উপজেলার খোদ্দনারায়ণপুর এলাকার কৃষক আব্দুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সারের এই বাড়তি দামের কারণে চলতি মৌসুমে বাড়তি খরচ হচ্ছে। বাজারে সার পাওয়া যাচ্ছে না, আর পেলেও দিতে হচ্ছে অস্বাভাবিক দাম।’ সদর উপজেলার হাপানিয়া এলাকার কৃষক আফছার মণ্ডল বলেন, ‘নির্ধারিত দামে কিনতে গেলে বলা হয় সার নেই। কিন্তু বেশি টাকা হাতে দিলেই সার বের হয়ে আসছে! তবে সঠিক সময়ে জমিতে সার দিতে না পারলে পরে দিয়ে লাভ নেই।’
ঠাকুরগাঁও ও লালমনিরহাট জেলায়ও কৃষকদের বাড়তি দামে সার কিনতে হচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার আমজানখোর ইউনিয়নের আলুচাষি শরিফুল ইসলাম ও সদরের নারগুন গ্রামের আলুচাষি আব্দুল জব্বার বলেন, আমন ধানের পাশাপাশি এখন আগাম আলু, শাকসবজি ও গম চাষের প্রস্তুতি চলছে। এ সুযোগে খুচরা বিক্রেতারা বস্তাপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি দাম নিচ্ছেন।
নারগুন গ্রামের সার ব্যবসায়ী সালেহ বাড়তি দামের জন্য পরিবহন খরচ ও বাকিতে সার বিক্রির বিষয়টি উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, এসব কারণে খুচরা পর্যায়ে সারের দাম ‘কিছুটা বেশি’ পড়ে।
লালমনিরহাটের কৃষকদের অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী রাতের আঁধারে সার বেশি দামে বিক্রি করছেন। সারের দাবিতে গত রোববার সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগর ও সোমবার তিস্তা মোস্তফি বাজারে লালমনিরহাট-রংপুর মহাসড়ক অবরোধ করেন কৃষকেরা। এ সময় বিক্ষুব্ধ কৃষকেরা ডিলার ও কৃষি কর্মকর্তাদের ধাওয়া করেন। ১০ বস্তা সার অন্যত্র পাঠানোর সময় কৃষকদের হাতে আটক হন কালীগঞ্জের কাকিনার ডিলার নয়ন। সার জব্দ করে তাঁকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
এদিকে লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান সাংবাদিকদের বলেন, ‘গুজব সৃষ্টি করে কোনো একটি চক্র বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা করছে। আমরা তা প্রতিরোধ করতে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছি।’
গত বুধবার সার নিয়ে জাতীয় সংসদে সরকারের সমালোচনা করেছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। তাঁরা বলেন, দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকার সরকারি দাবির মধ্যে কৃষকেরা কেন সার পাচ্ছেন না? তাঁরা অভিযোগ করেন, সারের ঘাটতি না থেকে থাকলে সরবরাহ, ডিলার ব্যবস্থাপনা, কালোবাজারি ও বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে কৃষকেরা সমস্যায় পড়ছেন। আলোচনায় অংশ নিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া ডিলাররা বিভিন্নভাবে বর্তমান সরকারকে হেয় করার চেষ্টা করছে। কৃত্রিম সংকট তৈরি করার চেষ্টা করছে। তিনি আরও বলেন, পাশের দেশ ভারত এবং মিয়ানমারে সারের দাম অনেক বেশি। এই কারণে কিছু সার সেখানে পাচার হওয়ার প্রবণতার তথ্য প্রশাসনের কাছে রয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের চলতি সপ্তাহের তথ্য অনুসারে, বর্তমানে দেশে ১২ লাখ টনের বেশি সার মজুত আছে। গত বছর একই সময় মজুত ছিল প্রায় ১১ লাখ টন। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে মোট সারের চাহিদা রয়েছে ৪০ লাখ ২৯ হাজার টন। এ সময় দেশে সারের মোট জোগান থাকবে ৫৩ লাখ ৭১ হাজার টন—অর্থাৎ চলতি চাহিদার বেশি। সে হিসাবে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে মজুত থাকবে ১৩ লাখ ৪২ হাজার টন।
সার পরিস্থিতি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে জানতে চাইলে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘দেশের চাহিদার অধিকাংশ সার আমদানি করতে হয়। স্থানীয় সব কারখানা চালু করে আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে। তবে সার সরবরাহব্যবস্থায় কৃত্রিম সংকটও রয়েছে। এটা সরকারের ব্যবস্থাপনা ঘাটতির কারণে তৈরি হয়েছে। সরকারের উচিত ব্যবস্থাপনা উন্নত করার বিষয়ে মনোযোগী হওয়া।’
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের চলমান আমন ও আসন্ন রবি মৌসুমে সারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং তৃণমূলের সার বণ্টনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। কৃষকের সারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে নতুন ‘সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণ সমন্বিত নীতিমালা-২০২৬’ করা হয়েছে। কৃত্রিম সারের সংকট যেন তৈরি না হয়, সে জন্য বিশেষ নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। প্রত্যেক জেলায় সার ব্যবস্থাপনায় আলাদা ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে। ৬৪টি জেলাতেই সার্বক্ষণিক সার মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। ডিলার পর্যায়ে অনিয়ম বা অতিরিক্ত দাম রাখার প্রমাণ পাওয়া গেলে সরাসরি কৃষি মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ জানানোর জন্য বিশেষ টিম সক্রিয় করা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা মিললে তাৎক্ষণিক ডিলারশিপ বাতিলসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
(এ প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি; নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী; লালমনিরহাট প্রতিনিধি, বগুড়া প্রতিনিধি, নওগাঁ প্রতিনিধি, নীলফামারী প্রতিনিধি ও ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি)
বন্ধ থাকা বাংলাদেশ-ভারত আন্তদেশীয় ট্রেন সার্ভিস চালুর বিষয়ে ভারত আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিলে তা পরীক্ষা করে দেখবে বাংলাদেশ। গত তিন দিন ধরে অনুষ্ঠিত ৩৮তম বাংলাদেশ-ভারত আন্তসরকার রেলওয়ে মিটিংয়ে (আইজিআরএম) ভারতীয় পক্ষ থেকে মৈত্রী এক্সপ্রেসকে পদ্মা সেতু হয়ে পুনরায় চালানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘মতের ভিন্নতা গণতান্ত্রিক সংসদীয় ব্যবস্থার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। ভিন্নমত প্রকাশের পাশাপাশি সংসদীয় কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা গণতান্ত্রিক চর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করে।’
গণতান্ত্রিক শক্তির মধ্যে বিভেদ তৈরি না করে ঐক্যবদ্ধভাবে কল্যাণকর রাষ্ট্র গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, সরকারি দল ও বিরোধী দল—সবাইকে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। ভিন্নমত ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, তবে তা যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়…
দৈনিক টার্গেট 























