উনসত্তরের অভ্যুত্থানের পরে প্রথমে নির্বাচন ও তারপরে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বায়ত্তশাসন নয়, আমরা স্বাধীনতাই পেয়ে গেলাম। বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হলো। জাতীয় মুক্তির আন্দোলনে উঠতি বুর্জোয়ারা যেমন ছিল, তেমনি ছিল সমাজতন্ত্রীরাও। আসলে সমাজতন্ত্রীরাই ছিল চালিকাশক্তি। সংগ্রামের কালে উঠতি বুর্জোয়ারা সমাজতন্ত্র-বিদ্বেষ প্রকাশ করা প্রয়োজন মনে করেনি, ঢেকেঢুকেই রেখেছে, যেটা তারা প্রকাশ করল স্বাধীনতার পরে।
একাত্তরে দেশ যখন স্বাধীন হলো, তখন দেখা গেল সমাজতন্ত্রীরা নয়, উঠতি বুর্জোয়ারাই রাষ্ট্রক্ষমতা করতলগত করে ফেলেছে, ঠিক যেমনটা ঘটেছিল সাতচল্লিশে। উনসত্তরের অভ্যুত্থানে মেহনতি মানুষের অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপক, একাত্তরের যুদ্ধেও মূলত তাঁরাই যুদ্ধ করেছেন; কিন্তু ক্ষমতা তাঁদের হাতে এল না, চলে গেল বুর্জোয়াদের দখলে। বুর্জোয়াদের জাতীয়তাবাদ তাদের শ্রেণিগত পুঁজিবাদপ্রীতির দ্বারাই সীমিত ও চিহ্নিত হয়ে পড়ল।
বুর্জোয়াদের ক্ষমতাপ্রাপ্ত ঘটল দুই কারণে। একটা হচ্ছে বুর্জোয়াদের নিজস্ব শক্তি, অপরটি বামপন্থীদের দুর্বলতা। একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ বটে। বাঙালি উঠতি মুসলিম বুর্জোয়ারা একসময়ে হিন্দু প্রতিদ্বন্দ্বীদের দ্বারা অগ্রযাত্রায় বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছিল, পাকিস্তান সেই প্রতিবন্ধক দূর করবে এমনই ছিল আশা; কিন্তু পাকিস্তানে দেখা গেল অবাঙালিরা এসে গেছে নতুন প্রতিবন্ধক হিসেবে। এই প্রতিবন্ধক দূর করার জন্যই তারা দ্বিতীয়বার স্বাধীনতা চেয়েছিল এবং সেটা পাওয়াতে তাদের বিকাশের জন্য পথটা প্রশস্ত হলো। তারা নিজেদের জাতীয়তাবাদী হিসেবেই জেনেছে এবং সেভাবে পরিচয়ও দিয়েছে। কিন্তু তাদের পক্ষে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী হওয়া সম্ভব ছিল না, তারা সেটা হয়ওনি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় চারটি নয়, তিনটি লক্ষ্যের কথা উচ্চারিত হতো—ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র। স্বাধীনতার পরে জাতীয়তাবাদ যুক্ত হয়েছে এবং সংবিধানের রাষ্ট্রীয় চারটি মূলনীতির মধ্যে প্রথম স্থানটিরই অধিকারী হয়ে বসেছে। ঘটনাটি তাৎপর্যবিহীন নয়। বুর্জোয়ারা শাসনক্ষমতা পেয়ে জাতীয় পরিচয়টিকে প্রধান করে তুলল, যাতে নিজেদের এবং অন্যদের শ্রেণিপরিচয়কে আড়াল করা যায়। সংবিধানে ‘সমাজতন্ত্র’ রইল, কিন্তু সেটাও চলে গেল জাতীয়তাবাদের অধীনে, পরিচয় দিতে চাইল জাতীয় সমাজতন্ত্র হিসেবে, আসলে যা পুঁজিবাদেরই ছদ্মবেশ। বুর্জোয়া শাসকদের অধীনে চলে এল আমলাতন্ত্রসহ রাষ্ট্রের সব বাহিনী ও প্রতিষ্ঠান এবং আইনকানুন। তদুপরি পাওয়া গেল বহিঃস্থিত সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর সাহায্য, ঋণ ও সমর্থন। বুর্জোয়ারা নিজেরাও ছিল তুলনামূলকভাবে বিত্তবান, রাষ্ট্রক্ষমতা প্রাপ্তিতে তাদের বিত্ত দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকল। লক্ষণীয় যে বাংলাদেশ যারা শাসন করে থাকে, তাদের রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিটিই নিজেদের ‘জাতীয়’ পরিচয়ে বিজ্ঞাপিত করে, আওয়ামী লীগ বলে তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদী, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টিও নিজেদের জাতীয়তাবাদী বলেই জানে ও জানায়।
অপরপক্ষে সমাজতন্ত্রীরা ছিল অনেক দিক দিয়েই দুর্বল, এমনকি বিপন্ন। উপমহাদেশে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা মেহনতি মানুষের আন্দোলনের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসেনি, ১৯২১ সালে এর প্রতিষ্ঠা ঘটে তাসখন্দে, এম এন রায়ের উদ্যোগে। এম এন রায় রাজনীতিতে এসেছিলেন জাতীয়তাবাদী স্রোতে, নিজেকে তিনি কমিউনিস্ট বললেও পুরোপুরি শ্রেণিচ্যুত ও সাম্যবাদী হয়ে উঠতে পারেননি। যে জন্য ১৯২৯ সালেই তিনি কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে যান। অনেকটা বিপরীত দিক থেকে এসে মুজফফর আহমদরা পার্টি গঠন করেন দেশের ভেতর থেকেই। কিন্তু বিশাল ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের ভেতর পারস্পরিক যোগাযোগের সুযোগ ছিল খুবই সংকীর্ণ। ভৌগোলিক ও ভাষাগত দূরত্ব তো ছিলই, ছিল আত্মপ্রকাশের সমস্যাও।
ব্রিটিশ বুর্জোয়া শাসকেরা কমিউনিস্টদের ব্যাপারে যতটা কঠোর ছিল, জাতীয়তাবাদীদের ক্ষেত্রে ততটা ছিল না। জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে তাদের দেনদরবার, দর-কষাকষি, এমনকি ওঠাবসাও চলত; অপর দিকে কমিউনিস্ট পার্টির নামগন্ধ তারা সহ্য করতে পারত না। প্রমোশনলোভী দেশীয় গোয়েন্দারা কমিউনিস্টদের হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াত। চিঠিপত্র খুলে পড়ত। পার্টি হিসেবে যাত্রার একেবারে শুরু থেকে কমিউনিস্ট নেতাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দেওয়া হয়েছে। বড় একটা মামলা দায়ের করা হয় ১৯২৯-এ, নাম ছিল মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা। ওই প্রথম কমিউনিস্ট নেতারা একত্র হওয়ার সুযোগ পান, বন্দী অবস্থাতে যদিও। এবং আদালতে যৌথ জবানবন্দি দানের অনুমতিকে ব্যবহার করে তাঁরা তাঁদের বক্তব্যকে পরিষ্কারভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করেন। তাঁদের বইপত্র, পত্রপত্রিকা প্রকাশ করার এবং বাইরে থেকে আনবার সুযোগ দেওয়া হতো না। নিজেরা পত্রিকা প্রকাশ করতে পারতেন না। একপর্যায়ে পার্টিকে নিষিদ্ধই ঘোষণা করা হয়েছিল।
কমরেড মুজফফর আহমদের কথাই ধরা যাক। মীরাট ষড়যন্ত্র মামলায় চার বছর বন্দী থাকার পরও ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত তাঁকে তাঁর গ্রামের বাড়িতে গৃহবন্দী অবস্থায় থাকতে হয়েছে। এম এন রায় থেকে তিনি একেবারেই স্বতন্ত্র; পার্টির আদর্শ থেকে তিনি কখনোই বিচ্যুত হননি, যতটা সম্ভব শ্রেণিচ্যুতও ছিলেন। কিন্তু এমনকি তিনিও পুরোপুরি শ্রেণিচ্যুত হয়েছিলেন কি না, সে বিষয়ে সংশয় জাগে, যখন দেখি দুই খণ্ডে প্রকাশিত আত্মজীবনীর তিনি নাম রেখেছেন, ‘আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি’। পার্টির নামই তো প্রথমে আসার কথা এবং তারপরে এলে আসতে পারে ‘আমি’। একজন কমিউনিস্ট তো তাঁর নিজের জীবনকে ততটা গুরুত্বপূর্ণ ভাববেন না, পার্টি ও পার্টির ইতিহাসকে যতটা গুরুত্ব দেবেন। আর কমরেড মণি সিংহ যে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের কাহিনিকে ‘রাজনৈতিক সংগ্রাম’ না বলে জীবন-সংগ্রাম বলেছেন, সেটাও তো লক্ষ করবার মতো। জীবনসংগ্রাম তো সবাই করেন, কমিউনিস্টদের সংগ্রামটা নিশ্চয় ভিন্ন ধরনের। তাহলে? আর পার্টির সদস্যদের সদস্য না বলে সভ্য বলার যে রীতি চালু ছিল, তাতেও বুর্জোয়াদের মতো সভ্য-অসভ্য ভেদাভেদ খাড়া রাখার মনোভাবের ছায়া আছে বলাটা হয়তো অন্যায় হবে না।
বস্তুত, পার্টির ওপরে বুর্জোয়া প্রভাব সাতচল্লিশের আগে বেশ ভালো রকমেরই ছিল, পরেও যে দূর হয়েছে, তা বলা যাবে না। পার্টির নির্ভরশীলতা বেশ কিছু পরিমাণেই ছিল বিদেশি নির্দেশের ওপর, যে নির্ভরশীলতা ভারতীয় বুর্জোয়াদের জন্য ছিল স্বভাবসিদ্ধ, কিন্তু কমিউনিস্টদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। পার্টি দেশীয় নয়, বিদেশ-প্রভাবিত বলে যে দুর্নাম ছিল তার ভিত্তি ছিল ওইখানেই। দ্বিতীয়ত, ওই নির্ভরশীলতার দরুন পার্টি নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারেনি। স্থানীয় বাস্তব অবস্থার বাস্তবিক বিশ্লেষণ করে যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটা সব সময়ে সম্ভব হয়নি। তা ছাড়া বিপ্লবের জন্য রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা যে অত্যাবশ্যক, এই বোধটি পার্টি জাগিয়ে রাখতে পারেনি তার সদস্যদের মধ্যে। সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে তাকিয়ে থাকাটা তো ছিলই, ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির কাছ থেকেও নির্দেশ আসত। যেমন ১৯৩৬ সালে সেখান থেকে এই তত্ত্ব আসে যে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকেই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী যুক্তফ্রন্ট হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। এ ধরনের শ্রেণি-সমন্বয়ধর্মী তত্ত্ব যে বিপ্লবের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়িয়েছিল, কমিউনিস্ট পার্টিরই কেউ কেউ অবশ্য পরে সেটা উপলব্ধি করেছেন।
বাংলাদেশে ঋতু ছয়টি। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। তবে এই তালিকাটি অসম্পূর্ণ। মধ্যবিত্তের সংসারের জন্য আরও একটি ঋতু আছে, হতাশার ঋতু। সেটি হলো মাসের শেষ ১০ দিন। এই ঋতুর কোনো সরকারি স্বীকৃতি নেই।
বর্তমান সময়ে সবচেয়ে যে আলোচনার বিষয় সেটি হলো বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগ হতে পারে দুই প্রকার—দেশি এবং বিদেশি। প্রথমেই আসা যাক বিদেশি বিনিয়োগের আলাপে। আমাদের দেশে বিদেশিরা সাধারণত বিনিয়োগ করে থাকে বস্ত্র খাতে। বেশির ভাগ সময় বিনিয়োগ এ খাতেই বেশি এসেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ঘটনাবহুল, কণ্টকাকীর্ণ এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে পুনরুত্থানশীল দলটির নাম বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। আজ ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬; দলটির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭৮ সালের এই দিনে যে দলটির যাত্রা শুরু হয়েছিল এক মহান রাষ্ট্রনায়কের হাত ধরে…
দৈনিক টার্গেট 



















