শেরে বাংলা নগরের পরিকল্পনা হয়েছিল আইয়ুব খানের আমলে, তৎকালীন পাকিস্তানের ‘দ্বিতীয় রাজধানী’ হিসেবে। লুই কানের নকশায় সংসদ ভবন সেই পরিকল্পনারই ফসল। সেই পরিকল্পনার পেছনে অন্তত একটি যুক্তি ছিল—ঘনবসতির বাইরে খোলা জমিতে প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়া। সেই খোলা জমি আজ আর খোলা নেই। অথচ স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পরেও এখানে মন্ত্রণালয় পর্যায়ের দপ্তর বলতে মূলত পরিকল্পনা কমিশন, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগসহ আরও মন্ত্রণালয়-অধিদপ্তরের কার্যালয় করা হয়েছে। এর মধ্যে এলাকাটির চরিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। প্রস্তাবিত স্থানের আশপাশে রয়েছে একাধিক বড় হাসপাতাল, মেডিকেল ও নার্সিং কলেজ। ঠিক উল্টো দিকে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। পাশেই আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, যেখানে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের দিনে বিপুল পার্কিংয়ের প্রয়োজন হয়। হাসপাতালমুখী অ্যাম্বুলেন্স, শিক্ষার্থীদের চলাচল, সম্মেলনের প্রটোকল আর সচিবালয়ের নিরাপত্তাবেষ্টনী, সবকিছু এসে মিলবে একই মোড়ে।
তার ওপর এলাকাটি মিরপুর, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, তেজগাঁও ও ধানমন্ডির মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার সংযোগবিন্দু। এখানে একটি স্থায়ী প্রশাসনিক কেন্দ্র বসানোর অর্থ শহরের হৃৎপিণ্ডে নতুন করে একটি যানজটের কেন্দ্র তৈরি করা। জায়গাটি একটি সুপরিকল্পিত, ভবিষ্যৎ-সম্প্রসারণযোগ্য প্রশাসনিক কমপ্লেক্সের জন্যও যথেষ্ট নয়। শোনা যাচ্ছে, চাপ সামলাতে নতুন সড়ক বা পাতালপথের কথাও ভাবা হচ্ছে। সমস্যা তৈরি করে তারপর তার সমাধানে আরেকটি ব্যয়বহুল প্রকল্প—এটিই আমাদের উন্নয়ন-চক্রের পরিচিত ছক। আবার বর্তমান সচিবালয়ের জায়গায় পুরান ঢাকার নিম্ন আদালত সরিয়ে আনার প্রস্তাবও আছে। ফলে পল্টন-গুলিস্তানের চাপ কমবে, এমন আশাও করা যাচ্ছে না। পুরোনো জায়গা ভরবে নতুন ভিড়ে আর নতুন জায়গায় জন্ম নেবে আরেক ধরনের ভিড়। দেশের পরিকল্পনাবিদদের পেশাজীবী সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা ইতিমধ্যে আপত্তি জানিয়েছেন। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই নগর পরিকল্পনার ন্যূনতম মানদণ্ডে এই সিদ্ধান্ত টেকে না। বলা চলে, প্রায় ৭০ বছর আগের পাকিস্তানি পরিকল্পনাও এর চেয়ে দূরদর্শী ছিল।
এখন শহরের এক অংশ থেকে আরেক অংশে কয়েক কিলোমিটার ভবন সরালে কেন্দ্রীভবনের এক বিন্দুও কমবে না। ঠিকানা বদলালে ক্ষমতার মানচিত্র বদলায় না। যদি ভৌত স্থানান্তর একান্তই প্রয়োজন হয়, তবে মূল শহর থেকে দূরে পূর্বাচল, আশুলিয়া বা ঢাকার মূল শহরের বাইরে যেখানে যানজট হওয়ার কোনো ধরনের আশঙ্কা নেই—এ রকম সুবিধাজনক এবং পরিকল্পিত এলাকায় নিলে অন্তত কেন্দ্রীয় ঢাকার চাপ কমাত, একটি নতুন প্রশাসনিক নগরকেন্দ্র গড়ার সুযোগ সৃষ্টি হতো। মূল ঢাকার বাইরে নিয়ে গিয়ে বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া যে উদ্দেশ্যে সচিবালয় স্থানান্তর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, সেটা নিশ্চিতভাবে মুখ থুবড়ে পড়বে। আর ৫০ বছরের পরিকল্পনা করেই সেটা বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হতে হবে।
অর্থনীতি এখন গভীর চাপে। মূল্যস্ফীতি ও মন্দার ধাক্কায় সাধারণ মানুষ দিশেহারা। সরকার নিজেও রাজস্ব জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে, পরিচালন ব্যয় আর উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি মেটানোই কঠিন হয়ে উঠছে। এমন সময়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করে কোন সেবার মান বাড়বে? কোন ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি হবে? কোন নাগরিকের ভোগান্তি কমবে? প্রকল্প প্রস্তাবে এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না থাকলে এটি অর্থের যথার্থ ব্যবহারের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় না। বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয় ও সময় বাড়ার যে অভিজ্ঞতা আমাদের আছে, তাতে প্রস্তাবিত অঙ্কটিই শেষ অঙ্ক হবে, এমন ভরসাও কম। তার ওপর কয়েক বছরের স্থানান্তরপর্বে মন্ত্রণালয়গুলোর কাজে যে বিঘ্ন ঘটবে, তার খরচ কোনো হিসাবেই ধরা নেই। একই অর্থে জেলা পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণ কিংবা ই-গভর্ন্যান্সে বিনিয়োগ হলে নাগরিক অনেক বেশি উপকৃত হতো। সংকটকালে এমন অনুৎপাদনশীল অবকাঠামো সরকারের নৈতিক বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তাই সরকারের প্রতি আহ্বান, সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা হোক। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং যানবাহন ও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হোক। পরিকল্পনাবিদ, নগরবিদ ও এলাকাবাসীর সঙ্গে প্রকাশ্য পরামর্শ গ্রহণ করা হোক। সবচেয়ে জরুরি, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের একটি সময়বদ্ধ রূপরেখা হাজির করা হোক। কারণ, রাষ্ট্রের দক্ষতা মাপা হয় ভবনের উচ্চতায় নয়, নাগরিকের সেবা পাওয়ার সহজতায়।
শুরুর প্রশ্নে ফিরি। সমস্যা ঠিকানায় নয়, কাঠামোয়। সচিবালয় সরবে, কিন্তু ক্ষমতা যদি না সরে, তবে নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের দূরত্ব কমবে না এক বিন্দুও। বাড়বে কেবল যানজটে আটকে থাকার সময়।
যানজট কমানোর উদ্দেশ্য নিয়ে যদি সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তর করা হয়, তাহলে নগরবাসী যানজট থেকে মুক্তি না পেয়ে যে আরও বড় যানজটের মুখোমুখি হবে, তা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। সে জন্য মূল ঢাকার বাইরে সচিবালয় স্থানান্তর করাই যৌক্তিক হবে।
লেখক: অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
কুমিল্লার ‘শেফা ব্রেড অ্যান্ড বেকারি’ নামের প্রতিষ্ঠানে আকস্মিকভাবে অভিযান চালিয়েছিল জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। তাতে যা হওয়ার তা–ই হয়েছে। দুটি ঘটনা ঘটিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সম্প্রতি আমার এক বন্ধু আমাকে একটি ভিডিও-কনটেন্ট পাঠিয়ে লিখেছে, ‘সুখে থাকতে খুব বেশি কিছু লাগে না।’ ভিডিওটি দেখে জানলাম, নায়লা শারাফ নামের এক নারী বেশ কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পাস করেছেন। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও জনতা ব্যাংকে চাকরি করেছেন।
সব জিনিসেরই যখন ইতরবিশেষ আছে, গণতন্ত্রেরই-বা থাকবে না কেন। আছে, গণতন্ত্রেরও বাড়তি-কমতি রয়েছে। মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন সে কথা এবং শুনেছিল সারা বিশ্ব। গণতন্ত্র যদি বাড়তির দিকে ঝুলে পড়ে, তখন ঘটনা কী ঘটে তার ছবি দিয়েছিলেন তিনি। ফল দাঁড়ায় সমকামিতা, নৈতিক অধঃপতন, বর্ণবিদ্বেষ, অর্থনৈতিক
দৈনিক টার্গেট 






















