সারা পৃথিবী আজ এক নজিরবিহীন যুদ্ধোন্মাদনা ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট। সাম্রাজ্যবাদ আর সাম্প্রদায়িকতার প্রত্যক্ষ মদদে নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরছে দেশে দেশে, আধিপত্য আর মুনাফার লোভে চলছে মানবতাবিনাশী ধ্বংসযজ্ঞ। প্রিয় স্বদেশও আজ এই আগ্রাসী থাবার নির্মম শিকার। নানা ভূরাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে বাংলাদেশ আজ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তথাকথিত কৌশলগত অংশীদারত্বের আড়ালে যে জনবিরোধী দাসত্বমূলক চুক্তি হয়েছে, তা আমাদের রক্তস্নাত সার্বভৌমত্বকে ঠেলে দিয়েছে চরম সংকটের মুখে। আমাদের জাতীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার রাষ্ট্রঘাতী অপতৎপরতা আমাদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে। উদীচী তার জন্মলগ্ন থেকেই সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন। দেশের সম্পদে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে গণ-প্রতিরোধের মাধ্যমে উদীচীর লড়াই অব্যাহত থাকবে আজ ও আগামীতে।
প্রায় ছয় দশক ধরে উদীচীর এই পথচলা সহজ ছিল না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে উদীচীর শিল্পী-কর্মীরা যেমন কাঁধে রাইফেল তুলে নিয়ে লড়াই করেছিলেন, তেমনি স্বাধীন দেশে সামরিক দুঃশাসন, স্বৈরতন্ত্র ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রাজপথে লড়াই করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের রাজনৈতিক সত্তাকে গণমানুষের নিজস্ব ভাষায় রূপান্তরের প্রয়াসেই উদীচী আজও কাজ করে যাচ্ছে। এই আপসহীন দ্রোহের কারণেই প্রতিক্রিয়াশীল অপশক্তির নির্মম আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে উদীচীকে। ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোর টাউন হলের দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনে বর্বরোচিত বোমা হামলা এবং ২০০৫ সালের ৪ ডিসেম্বর নেত্রকোনার কার্যালয়ে উগ্র ধর্মান্ধ জঙ্গিদের বোমা হামলায় উদীচী হারিয়েছে তার নিবেদিতপ্রাণ কর্মী-সংগ্রামীদের। কিন্তু রক্তের বিনিময়েও উদীচী মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক আদর্শ থেকে একচুলও বিচ্যুত হয়নি। ভবিষ্যতেও হবে না।
কেবল আনুষ্ঠানিক উদ্যাপন নয়, ৫৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজন বরং রাজপথের লড়াইকে আরও শাণিত করার এক নতুন শপথ। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি চত্বরে বেলা ৩টায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান উদ্বোধন করবেন উদীচীর সাংগঠনিক পতাকার রূপকার শিল্পী আনোয়ার হোসেন। চলতি বছর আমরা পার করছি ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’-এর শতবর্ষ। বাঙালির জাতীয় চিন্তার ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই অধ্যায়টি নিয়ে আলোচনা হবে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে। শতবর্ষ আগে শিখা গোষ্ঠী যেভাবে মুক্তচিন্তা আর ধর্মনিরপেক্ষতার মশাল জ্বালিয়েছিল, সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনের বর্তমান সময়ে সেই আদর্শকে ধারণ করাই এই আলোচনার মূল লক্ষ্য। কর্মসূচির দ্বিতীয় দিন, ৩০ অক্টোবরের আয়োজন হবে রাজধানীর ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবরে—উদীচীর নবীন-প্রবীণ কর্মী ভাইবোনদের পুনর্মিলনী। পরিবেশিত হবে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও উদীচীর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিমের রচনা ও গ্রন্থনায় বিশেষ গীতি-নাট্যালেখ্য ‘উদীচী, প্রগতির পদাতিক।’
সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্তের দেখানো পথই উদীচীর পথরেখা। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শই উদীচীর বীজমন্ত্র। পথচলার এই ৫৮ বছরে নানা বন্ধুর পথ অতিক্রম করেও সাম্রাজ্যবাদী ও সাম্প্রদায়িক দানবের সামনে উদীচী কখনো মাথানত করেনি। কোনো দিন করবেও না। জ্বলে-পুড়ে ছারখার হলেও না।

দৈনিক টার্গেট 
























