প্রথমেই যাদের কথা বলব তাদের মধ্যে আছে আমাদের প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকেরা। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় সেই আগের মতো একক নিয়ন্ত্রণে অনেক জমি কারও কাছে নেই। বৃহত্তর দিনাজপুর অঞ্চল বাদ দিলে, প্রায় সব অঞ্চলেই কৃষকদের জমি দুই থেকে দশ বিঘা। এইসব জমিতে চাষাবাদ করে আমাদের কৃষকেরা কমপক্ষে দুটি ফসল ফলায়। কোনো কোনো জায়গায় আরও বেশি ফলাতে চায়। এই ফসলই তাদের সবকিছু—সংসারের খাওয়া-পরা, ছেলেমেয়ের লেখাপড়া—নির্ভর করে এই ফসলের ওপর। বর্তমানে মান্ধাতার আমলের চাষাবাদ আর নেই। এখন চাষাবাদ হয় ছোট ছোট ট্রাক্টরের মাধ্যমে, জমিতে ব্যবহার করা হয় উন্নতমানের সার ও কীটনাশক ওষুধ। কৃষক যদি কোনো কারণে একটি ফসল না ফলাতে পারে, তাহলে সে পিছিয়ে পড়ে, ঋণগ্রস্ত হয়। পরবর্তী ফসল ফলানো তার জন্য খুবই মুশকিল হয়ে পড়ে। পরপর দুইবার ফসলের ঘাটতি হলে সে নিজের জমি বিক্রি করতে বাধ্য হয়, বন্ধ হয়ে যায় সন্তানের লেখাপড়া, মেয়ের বিয়ে দিতেও হয়তো কষ্ট হয়।
বর্তমানে সার সংকটের দরুন এরকম ঘটনা ঘটছে বিভিন্ন অঞ্চলে। সার মজুত থাকলেও বিতরণব্যবস্থায় হয়তো ত্রুটি আছে। বিভিন্ন অঞ্চলে সারের গুদাম ভেঙে কৃষক সার নিয়ে যাচ্ছে, সেই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। এই প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের দুঃখ-দুর্দশা দেখার কেউ নেই। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে আমাদের দেশের বামপন্থী দলগুলো কৃষক আন্দোলন শুরু করেছিল। তারা কৃষকের পক্ষে বিভিন্ন সংগঠন গড়ে তুলে তাদের পক্ষে দাঁড়াত, বিভিন্ন সহযোগিতার কথা বলত। বেশ কিছুদিন যাবৎ তারা এখন আর কৃষকদের নিয়ে ভাবে না তেমন।
আরেক শ্রেণির মানুষ আছে—হতদরিদ্র গ্রামীণ মানুষ। তারা মূলত কৃষিক্ষেত্রে তাদের শ্রম বিক্রি করে। তাদের কাজ সব মৌসুমে থাকে না। যখন চাষাবাদের মৌসুম অথবা ফসল তোলার মৌসুম, তখন হয়তো তারা ভালো একটা মজুরি পায়। কিন্তু এই মৌসুম থাকে বছরে হয়তো তিন-চার মাস। বাকি সময় তারা অন্যান্য কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। তাদের স্থায়ী কোনো কাজ নেই, নেই স্থায়ী কোনো কাজের নিশ্চয়তা। সরকার বিভিন্ন সময়ে ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি’র মাধ্যমে তাদের কিছু কাজের ব্যবস্থা করে। বর্তমানে সেটা খুবই সংকুচিত হয়ে গেছে। এই প্রান্তিক পর্যায়ের দিনমজুর, খেতমজুর, ছোটখাটো কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করার মানুষেরা খুবই কষ্টে আছে।
শিল্পাঞ্চলের বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বা কারখানায় বর্তমানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন কমে যাচ্ছে, শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে। তাদের কোনো সংগঠন না থাকায় তারা কোনো প্রতিবাদও করতে পারছে না। নীরবে-নিভৃতে তাদের দিন কাটছে অনাহারে-অর্ধাহারে। আবার এইসব ছোট ছোট কারখানায় বেতন কম থাকায় কিছুটা ওভারটাইম করে আয়-রোজগারের একটু বাড়তি ব্যবস্থা করত তারা, বর্তমানে সেটা একেবারেই বন্ধ। তা ছাড়া সংরক্ষিত এলাকা, যেমন বেপজা, বিডাসহ রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সেখানেও ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার সীমিত। ফলে শ্রমিক ছাঁটাই, শ্রমিকদের ওভারটাইম সীমিত হয়ে গেলেও প্রতিবাদ করতে পারে না কেউ।
শহরে, মফস্বলে, জেলা ও থানা পর্যায়ে এখন ব্যাটারিচালিত রিকশা প্রচুর। এই রিকশায় ব্যাটারি চার্জ হয় বিদ্যুৎ থেকে। বিদ্যুতের যে অবস্থা, পুরোপুরি ব্যাটারি চার্জ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে রিকশাচালক ও গ্যারেজমালিকেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না থাকায় অন্য কোনো পেশাও তাঁরা বেছে নিতে পারছেন না। প্রতিটি থানায়, জেলায় একেবারেই বিদ্যুৎনির্ভর কিছু ছোট ছোট ফ্যাক্টরি আছে যেমন আইস ফ্যাক্টরি, আইসক্রিম ফ্যাক্টরি, বেকারি ইত্যাদি। এখানে ওই একই সমস্যা—প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা বর্তমানে সাংঘাতিক চাপের মুখে আছেন।
সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকদের জন্য দুই-তিনটা লাইন করে যেন সিএনজি স্টেশনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের গ্যাস প্রদান করা হয়। প্রাইভেট গাড়ি একটু উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষ ব্যবহার করে, তাদের আপাতত গ্যাস বিতরণ বন্ধ করে সরকার তাদের অনুরোধ করতে পারে এই আপৎকালে পেট্রল-অকটেনে গাড়ি চালাতে। বুঝিয়ে বললে নিশ্চয়ই তারা তা মেনে চলবে।
সবকিছুর মূলে রয়েছে ব্যবস্থাপনা, আর এই ব্যবস্থাপনার মূলে আছে প্রশাসন। প্রশাসন পরিচালনা করে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, জনপ্রতিনিধিরা। তাই জনপ্রতিনিধিদের উচিত জনগণের সামনে সবকিছু খোলামেলা বর্ণনা করা—আমাদের বর্তমানে এই অবস্থা, আমরা এই পরিস্থিতিতে আছি, আমাদের এই সব জিনিসের ঘাটতি আছে, আপনারা দয়া করে এই সময়ে সাশ্রয়ী হোন, সরকারকে সহায়তা করুন, দেশের অগ্রগতি অক্ষুণ্ন রাখুন। সরকার বুঝিয়ে বললে আমাদের দেশের সহজ মানুষেরা অবশ্যই সেটা সরল মনে গ্রহণ করবে।
আপনি নানা ধরনের অন্যায় করবেন কিন্তু সে অপরাধের জন্য কোনো সাজা হবে না, এটা নিশ্চিত করতে হলে আপনাকে সরকারি দলের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে। নানা সময় সরকারি দলের নানা লোক এই ‘অধিকার’ ভোগ করে এসেছেন, তাই নতুন বিএনপি সরকারে এ রকম নেতা পাওয়া যাবে না—তা কি হয়?
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আলোচনা হলেই হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসকের সংখ্যা, ওষুধের দাম কিংবা যন্ত্রপাতির সংকট সামনে আসে। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চিকিৎসা ব্যবস্থার সবচেয়ে মৌলিক, অথচ তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত ভিত্তি হলো রোগ নির্ণয় বা পরীক্ষাগার সেবা।
দৈনিক টার্গেট 


























