শরীয়তপুর জেলা কারাগারে বছরের পর বছর ধরে আটকে আছেন ১৭ জন বিদেশি নাগরিক। আদালত প্রদত্ত সাজা অনেক আগেই শেষ হলেও পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা না মেলায় তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে একই পরিস্থিতিতে থাকা তিন বিদেশি বন্দির মৃত্যু হওয়ার পর তাদের মরদেহ দীর্ঘদিন সংরক্ষণ ও সৎকারের জন্য সরকারি কোষাগার থেকে প্রায় ২৯ লাখ ১৪ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।
কারা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে কারাগারে থাকা বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে ১৪ জন পুরুষ ও ৩ জন নারী। তারা সবাই সাজা ভোগ শেষ করে ‘রিলিজ প্রিজনার’ হিসেবে কারাগারে অবস্থান করছেন। কিন্তু নাগরিক পরিচয় যাচাই এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় মুক্তি পেলেও কার্যত বন্দি জীবন কাটাতে হচ্ছে তাদের।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, কয়েক বছর আগে পদ্মা সেতুর দক্ষিণ প্রান্ত ও আশপাশের এলাকা থেকে বিভিন্ন সময়ে এসব ব্যক্তিকে আটক করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা ছিল, তারা ভবঘুরে বা মানসিকভাবে অসুস্থ অবস্থায় এলাকায় ঘোরাফেরা করছিলেন। পরে বিভিন্ন অভিযোগে তাদের আদালতে পাঠানো হলে আদালত স্বল্পমেয়াদি সাজা প্রদান করেন। সাজা শেষ হওয়ার পরও পরিচয়গত জটিলতার কারণে তারা কারাগার ত্যাগ করতে পারেননি।
এর মধ্যে তিনজন বিদেশি নাগরিক কারাগারে থাকা অবস্থায় অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাদের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর কিংবা নিজ দেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হলেও দীর্ঘ যোগাযোগের পরও কোনো কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি। ফলে মরদেহগুলো দীর্ঘ সময় হাসপাতালের হিমাগারে সংরক্ষণ করতে হয়। পরে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে স্থানীয়ভাবে সৎকারের ব্যবস্থা করা হয়।
কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মরদেহ সংরক্ষণ, আনুষঙ্গিক প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং সৎকারের পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় ২৯ লাখ ১৪ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, একই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আরও আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।
কারাগার সূত্র জানায়, বর্তমানে অবস্থানরত বিদেশি বন্দিদের অনেকেই স্বাভাবিক জীবনযাপনে অনাগ্রহী। কেউ নিয়মিত খাবার গ্রহণ করছেন না, আবার কেউ পোশাক পরিধান করতেও অনীহা দেখাচ্ছেন। ভাষাগত সমস্যার কারণে তাদের সঙ্গে যোগাযোগও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মানসিক সংকট নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
স্থানীয় আইনজীবীরা মনে করছেন, বিষয়টি মানবিক ও কূটনৈতিক দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে কারা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি তুলে ধরা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাওয়া গেলে দ্রুত পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অন্যদিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি নাগরিকদের পরিচয় যাচাই, স্বজনদের সন্ধান এবং দ্রুত প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তঃরাষ্ট্রীয় সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন। অন্যথায় সাজা শেষ হওয়ার পরও এসব মানুষ অনিশ্চয়তার মধ্যে কারাগারে আটকে থাকবেন এবং সরকারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ অব্যাহত থাকবে।
দৈনিক টার্গেট 






















