ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্তঘেঁষা উপজেলা বিজয়নগর এখন এক ভিন্ন রূপে সেজেছে। সবুজ পাতার ফাঁকে ঝুলে থাকা থোকা থোকা লালচে লিচু আর পাহাড়ি টিলার মনোরম পরিবেশ মিলিয়ে পুরো এলাকা পরিণত হয়েছে প্রকৃতি ও ফলের এক অনন্য মিলনমেলায়। চলতি মৌসুমে লিচুর বাম্পার ফলনে যেমন খুশি চাষিরা, তেমনি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা দর্শনার্থীদের ভিড়ে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো জনপদ।
একসময় যে উঁচু-নিচু টিলাভূমি অনাবাদি কিংবা কম ব্যবহৃত ছিল, আজ সেখানে বিস্তীর্ণ লিচুর বাগান চোখে পড়ে। স্থানীয় কৃষকরা জানান, তুলনামূলক কম খরচ ও কম শ্রমে লাভজনক হওয়ায় বছরের পর বছর ধরে তারা টিলার লাল মাটিতে লিচু চাষ সম্প্রসারণ করেছেন। এর সুফলও মিলছে হাতেনাতে।
উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, বিজয়নগরে বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ২৫০টি বাণিজ্যিক লিচুর বাগান রয়েছে। এছাড়া প্রায় প্রতিটি গ্রামীণ পরিবারের আঙিনাতেও দেখা যায় একাধিক লিচু গাছ। ফলে মৌসুম এলেই পুরো এলাকা লিচুর উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে প্রাণ ফিরে পায়।

স্থানীয় বাগান মালিকদের ভাষ্য, অনুকূল আবহাওয়া ও যথাযথ পরিচর্যার কারণে এবার ফলন প্রত্যাশার চেয়েও বেশি হয়েছে। গাছে গাছে ঝুলছে পরিপক্ব লিচুর থোকা। অনেক চাষি আগাম বিক্রির মাধ্যমে ইতোমধ্যে ভালো দাম পেয়েছেন। অন্যদিকে যারা এখনো বিক্রি করেননি, তারাও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদী।
বিজয়নগরের লিচুর বিশেষ পরিচিতি রয়েছে এর স্বাদ ও গুণগত মানের কারণে। স্থানীয়রা জানান, রসালো ও মিষ্টি স্বাদের জন্য এখানকার লিচুর চাহিদা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রয়েছে। এমনকি সীমান্তবর্তী এলাকার ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বিদেশেও এই লিচুর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে।
লিচু ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত আউলিয়া বাজার এখন মৌসুমি ব্যস্ততায় সরগরম। মৌসুমজুড়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ লিচু কেনাবেচা হয় এই বাজারে। পাইকার, খুচরা ব্যবসায়ী এবং ক্রেতাদের উপস্থিতিতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত জমজমাট থাকে পুরো এলাকা। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, এক মাসব্যাপী মৌসুমে এখানে কোটি কোটি টাকার লিচু লেনদেন হয়।
শুধু কৃষি অর্থনীতিই নয়, লিচুর বাগানকে ঘিরে পর্যটন সম্ভাবনাও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে বিজয়নগরে। সারি সারি লিচুগাছ, লাল মাটির টিলা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন শত শত মানুষ ভিড় করছেন বিভিন্ন জেলা থেকে। নারী, পুরুষ, শিশু ও বয়স্ক—সব বয়সী দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে বাগান এলাকা।
স্থানীয়দের মতে, লিচুর মৌসুমে বিজয়নগর যেন এক অস্থায়ী পর্যটন নগরীতে রূপ নেয়। দর্শনার্থীরা শুধু বাগান ঘুরেই সন্তুষ্ট নন, অনেকেই সরাসরি গাছ থেকে লিচু সংগ্রহের অভিজ্ঞতাও নিচ্ছেন। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হচ্ছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে বিজয়নগরের লিচু শিল্প ভবিষ্যতে আরও বড় অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হতে পারে। পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক পর্যটন বিকাশের মাধ্যমে এই অঞ্চল দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় ভ্রমণ গন্তব্য হিসেবেও পরিচিতি লাভ করবে।
ফলনের আনন্দ, ব্যবসার সম্ভাবনা এবং পর্যটকদের উচ্ছ্বাস সব মিলিয়ে এবার বিজয়নগরের লাল টিলাজুড়ে বইছে সমৃদ্ধির নতুন হাওয়া।
দৈনিক টার্গেট 






















