৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন বহির্বিভাগে ৪০০ থেকে ৫০০ রোগী দেখা হচ্ছে এবং অন্তর্বিভাগে নিয়মিত ৭০ থেকে ৮০ রোগী ভর্তি থাকছেন। অথচ এই রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার জন্য নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক। গাইনি, সার্জারি, কার্ডিওলজি ও অর্থোপেডিক্স চিকিৎসক না থাকায় রোগীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন।
সুজালপুর ইউনিয়নের চাকাই গ্রামে ঢাকা-পঞ্চগড় মহাসড়কের পাশে ১৯৭৮ সালে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি স্থাপিত হয়। ২০১৩ সালে হাসপাতালটি ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও জনবল রয়ে গেছে ৩১ শয্যার হাসপাতালের কাঠামোতেই। এদিকে মহাসড়কের পাশে এবং কয়েকটি প্রতিবেশী উপজেলার কাছাকাছি হওয়ায় হাসপাতালে রোগীর চাপ সব সময়ই বেশি।
হাসপাতালটিতে ৩৩ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও আছেন ১৩ জন, যাঁদের মধ্যে তিনজন প্রেষণে রয়েছেন। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর ৩৫টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২২ জন। ৫০ শয্যার হাসপাতালের জন্য চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর পদ সৃষ্টি হয়নি। ৩১ শয্যার হাসপাতালের কাঠামোয় ২১ পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৩ জন এবং আটটি পদ শূন্য রয়েছে। ৬টি এমএলএসএস পদ থাকলেও বর্তমানে ছয়টি পদই শূন্য। হাসপাতালে কোনো আয়া নেই। চারজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে ৫০ শয্যার হাসপাতাল।
সেবা কার্যক্রম সবচেয়ে বেশি ব্যাহত হচ্ছে অ্যানেসথেশিয়া ও সার্জারির চিকিৎসকের অভাবে। অপারেশন থিয়েটার চালু থাকলেও চিকিৎসকের অভাবে এখানে অন্তসত্ত্বা মায়েদের সিজারিয়ান বা অস্ত্রোপচার করা যাচ্ছে না। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁদের দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হচ্ছে। এমন অবস্থায় সময়ক্ষেপণ ও দুর্ভোগের আশঙ্কায় অনেকে স্থানীয় ক্লিনিকে চলে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় ক্লিনিকগুলো রোগীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
মহাসড়কের পাশে হওয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীর চাপ এখানে বেশি। অথচ এই হাসপাতালে কোনো অর্থোপেডিক্স চিকিৎসক নেই।
চলতি বছর বর্তমান সরকার অর্থোপেডিক্স চিকিৎসকসহ কয়েকজন চিকিৎসক নিয়োগ দিলেও ৩০তম বিসিএসের অর্থোপেডিক্স চিকিৎসক মো. মনিরুল ইসলাম যোগদানের পর উন্নত সুযোগ-সুবিধার স্বার্থে প্রেষণের নামে দিনাজপুর জেনারেল হাসপাতালে কর্মরত আছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে নিয়োগ পাওয়া ৩২তম বিসিএসের কার্ডিওলজি চিকিৎসক মো. মামুনুর রশিদ উপজেলা হাসপাতালে যোগদানের পর থেকে সংযুক্তির মাধ্যমে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন। দুজনই বীরগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে বেতন নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
পলাশবাড়ী ইউনিয়নের ঝলঝলি গ্রামের আব্দুর রশিদ বলেন, ‘আমার বাবাকে ভোরে বুকে ব্যথার কারণে হাসপাতালে ভর্তি করেছি। কিন্তু হার্টের ডাক্তার না থাকায় চিকিৎসা হচ্ছে না। তাঁকে নিয়ে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে হবে এখন।’
ভোগনগর ইউনিয়নের ভোলানাথপুর গ্রামের শাহিনুর রহমান বলেন, ‘আমার স্ত্রীকে স্বাভাবিক প্রসবের জন্য ভর্তি করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত বাচ্চা হয়নি, রোগী কষ্ট পাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে সিজারের জন্য বীরগঞ্জ উপজেলা শহরের ক্লিনিকে নিতে হতে পারে।’
আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ বলেন, ‘আগে বহির্বিভাগে ২০০ থেকে ২৫০ রোগী দেখা হতো। মহাসড়কের পাশে হাসপাতাল হওয়ায় বর্তমানে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ রোগী দেখতে হচ্ছে। অন্তর্বিভাগে আগে ৪০ থেকে ৫০ জন রোগী ভর্তি থাকতেন, এখন নিয়মিত ৭০ থেকে ৮০ জন রোগী ভর্তি থাকছেন। এতে শয্যাসংকট হচ্ছে। রোগীদেরকে বারান্দার মেঝেতে পর্যন্ত বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এদিকে গুটিকয় চিকিৎসক ও নার্স একসঙ্গে এত রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন।’
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আফরোজ সুলতানা লুনা বলেন, ‘অপারেশন থিয়েটার ভালো রয়েছে। আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনটি নষ্ট। জনবল সংকট তো আছেই। এখন কার্ডিওলজি, গাইনি, সার্জারি ও অর্থোপেডিক্স চিকিৎসক জরুরি প্রয়োজন এখানে।’
ভুক্তভোগী জনগণ দিনাজপুর-১ (বীরগঞ্জ-কাহারোল) আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য আলহাজ মো. মনজুরুল ইসলাম মঞ্জুর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও কর্মচারী নিয়োগ এবং প্রসব ও অস্ত্রোপচারসেবায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

দৈনিক টার্গেট 






















