দেশে হামের প্রকোপ বাড়ছেই, আরও ৫ শিশুর মৃত্যু

  • দৈনিক টার্গেট
  • প্রকাশ: ০১:৩৭:৪৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬
  • ২০৫ বার পঠিত হয়েছে

দেশে হামের বিস্তার থামার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। যদিও এই সময়ে পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হওয়ার পর নতুন কোনো মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। সব মিলিয়ে চলতি প্রাদুর্ভাবে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬৫ জনে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বৃহস্পতিবার সকালে প্রকাশিত সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে জানায়, এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে ৮৮ জন শিশু। অন্যদিকে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা পৌঁছেছে ৪৭৭ জনে।

একই সময়ে নতুন করে ৫১ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এতে মোট নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৮৮৫ জনে। পাশাপাশি গত এক দিনে আরও ৮২৬ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৬৭ হাজার ৯০৫।

মে মাসে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মে মাসের শুরু থেকে শেষভাগের দিকে সংক্রমণ ও মৃত্যু দুইই উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। মাসের প্রথম সপ্তাহে হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নেয় ৮ হাজার ৩৬৭ শিশু। ওই সময়ে মারা যায় ৬০ জন।

কিন্তু মাসের তৃতীয় ও চতুর্থ সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৮ হাজার ৯০১ জনে। একই সময়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে হয় ৬৯।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পরও মাঠপর্যায়ে যথাসময়ে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে পরিস্থিতি এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

একদিনে ১৬ শিশুর মৃত্যুও দেখেছে দেশ

কয়েক দিন আগেই এক দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে ১৬ শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, যা চলমান পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দৈনিক মৃত্যু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর আগে সর্বোচ্চ ১৭ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গিয়েছিল।

সেই ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছিল ১ হাজার ৪৩৪ জন। ওই সময় পর্যন্ত মোট মৃত্যু দাঁড়িয়েছিল ৫২৮ জনে।

সবচেয়ে ঝুঁকিতে পাঁচ বছরের কম বয়সীরা

জাতিসংঘ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী। মোট আক্রান্তের প্রায় ৮১ শতাংশ এই বয়সসীমার মধ্যে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে সংক্রমণের হার উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। প্রতিদিন গড়ে এক হাজারের বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক টিকাদান কর্মসূচির কারণে কিছু এলাকায় সংক্রমণ কমার ইঙ্গিত মিলছে।

চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় ঘাটতির অভিযোগ

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে না পারায় অনেক শিশুর অবস্থা জটিল হয়ে পড়ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, উপজেলা পর্যায়ে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, অক্সিজেন সুবিধা এবং আক্রান্তদের আলাদা রাখার ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি ছিল। তিনি বলেন, এখনো হাম মোকাবিলায় পূর্ণাঙ্গ জাতীয় চিকিৎসা নির্দেশিকা প্রকাশ না হওয়ায় বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসকেরা সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারছেন না।

এ ছাড়া মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণে নিয়মিত ক্লিনিক্যাল অডিট বা ডেথ রিভিউ না হওয়ায় একই ধরনের ভুল পুনরাবৃত্তির আশঙ্কাও থেকে যাচ্ছে বলে মত দেন তিনি।

টিকার বয়স কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত

সরকারি পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, অপুষ্টিও পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় হাম দ্রুত মারাত্মক রূপ নিচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় হামের টিকা দেওয়ার বয়সসীমা ৯ মাস থেকে কমিয়ে ৬ মাস করা হয়েছে। পাশাপাশি আগে দুই ডোজ টিকা নেওয়া শিশুদেরও নতুন ক্যাম্পেইনের আওতায় আবার টিকা নিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত টিকাদান সম্প্রসারণ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং উপজেলা পর্যায়ে কার্যকর চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

দেশে হামের প্রকোপ বাড়ছেই, আরও ৫ শিশুর মৃত্যু

প্রকাশ: ০১:৩৭:৪৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬

দেশে হামের বিস্তার থামার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। যদিও এই সময়ে পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হওয়ার পর নতুন কোনো মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। সব মিলিয়ে চলতি প্রাদুর্ভাবে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬৫ জনে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বৃহস্পতিবার সকালে প্রকাশিত সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে জানায়, এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে ৮৮ জন শিশু। অন্যদিকে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা পৌঁছেছে ৪৭৭ জনে।

একই সময়ে নতুন করে ৫১ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এতে মোট নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৮৮৫ জনে। পাশাপাশি গত এক দিনে আরও ৮২৬ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৬৭ হাজার ৯০৫।

মে মাসে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মে মাসের শুরু থেকে শেষভাগের দিকে সংক্রমণ ও মৃত্যু দুইই উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। মাসের প্রথম সপ্তাহে হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নেয় ৮ হাজার ৩৬৭ শিশু। ওই সময়ে মারা যায় ৬০ জন।

কিন্তু মাসের তৃতীয় ও চতুর্থ সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৮ হাজার ৯০১ জনে। একই সময়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে হয় ৬৯।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পরও মাঠপর্যায়ে যথাসময়ে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে পরিস্থিতি এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

একদিনে ১৬ শিশুর মৃত্যুও দেখেছে দেশ

কয়েক দিন আগেই এক দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে ১৬ শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, যা চলমান পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দৈনিক মৃত্যু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর আগে সর্বোচ্চ ১৭ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গিয়েছিল।

সেই ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছিল ১ হাজার ৪৩৪ জন। ওই সময় পর্যন্ত মোট মৃত্যু দাঁড়িয়েছিল ৫২৮ জনে।

সবচেয়ে ঝুঁকিতে পাঁচ বছরের কম বয়সীরা

জাতিসংঘ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী। মোট আক্রান্তের প্রায় ৮১ শতাংশ এই বয়সসীমার মধ্যে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে সংক্রমণের হার উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। প্রতিদিন গড়ে এক হাজারের বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক টিকাদান কর্মসূচির কারণে কিছু এলাকায় সংক্রমণ কমার ইঙ্গিত মিলছে।

চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় ঘাটতির অভিযোগ

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে না পারায় অনেক শিশুর অবস্থা জটিল হয়ে পড়ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, উপজেলা পর্যায়ে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, অক্সিজেন সুবিধা এবং আক্রান্তদের আলাদা রাখার ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি ছিল। তিনি বলেন, এখনো হাম মোকাবিলায় পূর্ণাঙ্গ জাতীয় চিকিৎসা নির্দেশিকা প্রকাশ না হওয়ায় বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসকেরা সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারছেন না।

এ ছাড়া মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণে নিয়মিত ক্লিনিক্যাল অডিট বা ডেথ রিভিউ না হওয়ায় একই ধরনের ভুল পুনরাবৃত্তির আশঙ্কাও থেকে যাচ্ছে বলে মত দেন তিনি।

টিকার বয়স কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত

সরকারি পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, অপুষ্টিও পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় হাম দ্রুত মারাত্মক রূপ নিচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় হামের টিকা দেওয়ার বয়সসীমা ৯ মাস থেকে কমিয়ে ৬ মাস করা হয়েছে। পাশাপাশি আগে দুই ডোজ টিকা নেওয়া শিশুদেরও নতুন ক্যাম্পেইনের আওতায় আবার টিকা নিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত টিকাদান সম্প্রসারণ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং উপজেলা পর্যায়ে কার্যকর চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।