গত ১৮ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার ‘জানফাদায়ে ইরান’ (বা ইরানের জন্য জান কুরবান বা ইরানের জন্য আত্মত্যাগ) মহড়ায় অংশ নেন হাজার হাজার পুরুষ–নারী। এদের মধ্যে তরুণ ও মধ্যবয়সীরাও ছিলেন। মহড়াটি আয়োজিত হয় তেহরানে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ সদর দপ্তরে। আইআরজিসি এবং এর সংশ্লিষ্ট ইরানি স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী বাসিজ যৌথভাবে এই মহড়া আয়োজন করে। এর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান হাসানজাদেহ বলেন, এই কর্মসূচিতে ৫ লাখ মানুষ নিবন্ধন করেছেন। আয়োজকেরা আশা করেছিলেন, অন্তত ৩ লাখ ১৩ হাজার মানুষ এতে অংশ নেবেন।
‘জানফাদায়ান-ই ইরান’ (ইরানের জন্য আত্মত্যাগকারীরা) অভিযান মূলত এক ধরনের গণআন্দোলন। এটি ২০২৬ সালের মার্চে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে শুরু হয়। এটি প্রচলিত সামরিক বাহিনী হিসেবে নয়, বরং যুদ্ধকালীন নিবন্ধন কার্যক্রম হিসেবে শুরু হয়েছিল। এর মাধ্যমে বেসামরিক নাগরিকদের নিজেদের দেশের জন্য সেবা দেওয়ার প্রস্তুতি সরাসরি জানানোর একটি সুযোগ তৈরি করা হয়।
আন্দোলনটির প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ইরানের সশস্ত্র বাহিনীকে সহায়তা করতে ইচ্ছুক ও সক্ষম স্বেচ্ছাসেবকদের শনাক্ত করা। তবে নিবন্ধন শুরু হওয়ার পর এটি দ্রুত নজিরবিহীন মাত্রার এক কর্মসূচিতে পরিণত হয়। এই ক্যাম্পেইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ৩ কোটি ১৬ লাখেরও বেশি ইরানি এতে নিবন্ধন করেছেন। এই সংখ্যা কর্তৃপক্ষকেও বিস্মিত করেছে এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ গণমাধ্যমে বারবার তা তুলে ধরা হয়েছে।
বিদেশে বসবাসকারী ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সমর্থকেরাও এতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এবং বিদেশ থেকে কীভাবে নিবন্ধন করা যাবে, তা জানতে চেয়েছেন। জানফাদায়ে অভিযানের মুখপাত্র সাসান জারে বলেন, ‘স্বেচ্ছাসেবকদের ৩২ শতাংশ নারী এবং তাদের অধিকাংশের বয়স ৪৬ বছরের নিচে।’ সশস্ত্র বাহিনী এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি যে জানফাদায়ে স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতিরক্ষামূলক অভিযানে মোতায়েন করা হয়েছে কি না। তবে দক্ষিণাঞ্চলের বন্দর ও পারস্য উপসাগরের ইরানি দ্বীপগুলোর আশপাশের এলাকায় স্বেচ্ছাসেবকদের ব্যবহার করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
অভিযান শুরুর ৬ মাস পর সামরবিদেরা এই বিপুল জনবলকে কীভাবে ইরানের শহর ও জনপদ, বিশেষ করে তেহরান, রক্ষায় ব্যবহার করা যায় তা বিবেচনা করছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি ইরানের বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধ শুরু করে, তখন বিচ্ছিন্নতাবাদী সেল ও সশস্ত্র অস্থিরতা মোকাবিলায় এই বাহিনীকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এমন একটি বাহিনীর উদ্দেশ্য হবে দেশের অভ্যন্তরীণ ফ্রন্ট ধরে রাখা, যাতে সেনাবাহিনী ও আইআরজিসি বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে আক্রমণে মনোযোগ দিতে পারে।
এই হিসাবের ভিত্তি ২০২৬ সালের জানুয়ারির অস্থিরতা। সে সময় ইরানের বেশ কয়েকটি শহরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। তেহরানের অভিযোগ ছিল, সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এজেন্টরাও এসব সহিংসতায় সক্রিয় ছিল। সে সময় মোসাদ প্রকাশ্যেই ইরানিদের রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছিল।
একটি ফারসি ভাষার এক্স পোস্টে সংস্থাটি বলেছিল, ‘একসঙ্গে রাস্তায় বেরিয়ে আসুন। সময় এসেছে। আমরা আপনাদের সঙ্গে আছি। শুধু দূর থেকে কিংবা কথার মাধ্যমে নয়। আমরা মাটিতেও আপনাদের সঙ্গে আছি।’
ইরানিবিরোধী নেতাদের সঙ্গে ইসরায়েলি গোষ্ঠীগুলোর বৈঠক এবং তারা যাকে ‘ইরানি শাসনব্যবস্থা’ বলে অভিহিত করে, তার বিরুদ্ধে যৌথ সংগ্রাম চালানোর প্রচেষ্টার খবরও তেহরানের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ইসরায়েলি গণমাধ্যমে ইরানের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নিষিদ্ধ কুর্দি ও বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে তেল আবিবের সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
ইরানি পরিকল্পনাবিদদের কাছে এগুলো আলাদা কোনো ফ্রন্ট নয়। বরং বিক্ষোভ, সাম্প্রদায়িক বিভাজন এবং সশস্ত্র অস্থিরতাকে একটি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের অভিযানে রূপ দেওয়ার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ নাগাদ তেহরানের এই জনসমাবেশের খবর ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচিটির প্রচারণামূলক বিলবোর্ড টানানো হয়। এক বিলবোর্ডে প্রশ্ন করা হয়, ‘আপনি কি কাঁধ থেকে নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্র চালাতে জানেন?’ সেখানে অস্ত্রটির নামের জায়গায় অস্ত্রটির একটি ছবি ব্যবহার করা হয়। আরেকটি বিলবোর্ডে স্নাইপার রাইফেলের ছবি ব্যবহার করে একই প্রশ্ন করা হয়।
এই বার্তা থেকে বোঝা যায়, আইআরজিসি ও বাসিজ তাদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এমন একটি প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গড়ে তুলতে হবে, যেটিকে সংকটের সময় দেশের ভেতরের হুমকি থেকে শহরগুলো রক্ষায় মোতায়েন করা যাবে। এতে নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনী ইরানের সীমান্তের বাইরের শত্রুদের মোকাবিলায় মনোযোগ দিতে পারবে। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক প্রশিক্ষিত সেনাসদস্যকে ঘরের নিরাপত্তায় সরিয়ে নিতে হবে না এবং অভ্যন্তরীণ ফ্রন্টও অরক্ষিত থাকবে না।
জারে বলেন, ‘স্বেচ্ছাসেবকদের ২৬ শতাংশ নিরাপত্তা ও সামরিক কার্যক্রমে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন, আর ২০ শতাংশ ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তা করবেন। আরও ২০ শতাংশ সামাজিক কাজে যোগ দেবেন।’
মার্কিন–ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরুর পর টানা ২০০ রাতেরও বেশি সময় ধরে উত্তর তেহরানের এখতিয়ারিয়ে স্কয়ারে বাসিন্দারা রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন জানাতে জড়ো হয়েছেন। বৃষ্টি, তুষারপাত, শীতের ঠান্ডা এবং গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরম উপেক্ষা করে তারা সেখানে ছিলেন। এমনকি কাছাকাছি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রতিরক্ষা শিল্পের ভবনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলা চালানোর রাতগুলোতেও তারা সেখানে অবস্থান করেছেন।
৫৪ বছর বয়সী নারী সাদিকেহ মার্চে নিবন্ধন করেছিলেন। তিনিও সেপ্টেম্বরের মহড়ায় অংশ নেন। তিনি দ্য ক্রেডলকে বলেন, ‘আমি চাই শত্রু দেখুক যে ইরানিরা এখনো মাঠে আছে, তারা পিছু হটেনি এবং পিছু হটবেও না।’
মিসেস সাদাত শিশুদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য স্থাপন করা একটি স্টলে বসে ছিলেন। পঞ্চাশের কোঠায় থাকা এই নারী একজন শিক্ষক। অভিযানের শুরুর দিকেই তিনি জানফাদায়ে নিবন্ধন করেন এবং ১৮ সেপ্টেম্বরের মিছিলেও অংশ নেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের একটাই জীবনই, আর আমরা যদি সেই জীবন মাতৃভূমির জন্য উৎসর্গ না করি, তাহলে আমাদের জীবনেরই বা কী অর্থ? নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ইরান ও ইরানের জনগণের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। আমরা তাঁর উদাহরণ অনুসরণ করি।’
৩৯ বছর বয়সী হোসেইন স্কয়ারের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে গাড়ি চলাচলের দিকে নিজের পতাকা নাড়ছিলেন। বেসরকারি খাতের এই কর্মী দ্য ক্রেডলকে বলেন, তিনি সম্প্রতি এই অভিযানে যোগ দিয়েছেন, কারণ “আমি মনে করি, এই অভিযান বিশ্বের কাছে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শক্তি, স্থিতিস্থাপকতা, জনপ্রিয়তা ও বৈধতার চিত্র তুলে ধরে।”
৫১ বছর বয়সী ধর্মীয় নেতা বাহাদোরি সাদা পাগড়ি পরেছিলেন। তিনি মধ্য তেহরানে থাকেন। তবে প্রতিরাতে গাড়ি চালিয়ে এই এলাকায় আসেন। সেখানে স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তিনি স্কয়ারের রাতের সমাবেশে যোগ দেন। বাহাদোরি দেশের ‘ভূখণ্ড, ধর্ম এবং ইরানের জনগণকে রক্ষার জন্য’ এই অভিযানে যোগ দেন। তিনি দ্য ক্রেডলকে বলেন, ‘আমার ধর্মীয় দায়িত্বের পাশাপাশি আমি ইরানকে রক্ষা করতে চেয়েছি। কারণ মাতৃভূমি না থাকলে ধর্মও থাকবে না।’ শিয়া এই শায়খ মহানবী মুহাম্মদের (সা.) নামে বহুল প্রচলিত সেই উক্তির উল্লেখ করেন, যেখানে বলা হয়, ‘মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা ঈমানের অংশ।’
জানফাদায়ে অভিযানের আয়োজকেরা শুধু রাজধানীতে থেমে থাকতে চান না। ধীরে ধীরে অন্যান্য প্রদেশেও মহড়া ও মিছিল আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয় পরিস্থিতি ও প্রতিরক্ষার প্রয়োজন অনুযায়ী সেখানে এই অভিযানের কাঠামোও মানিয়ে নেওয়া হবে। তাদের ভাষ্য, এই আন্দোলনের লক্ষ্য হলো ‘টেকসই নিরাপত্তা তৈরি করা, জনগণের শক্তি প্রদর্শন করা এবং দেশের শত্রুদের হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শক্তিশালী করা।’
এখন প্রশিক্ষণ কোর্স শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে এসব প্রশিক্ষণে সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সহযোগিতায় পরিচালিত হবে। এর ফলে নিরাপত্তা কার্যক্রমের পাশাপাশি এই অভিযানের একটি বেসামরিক প্রতিরক্ষা ভূমিকাও তৈরি হবে।
মাস কয়েক আগে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যখন অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করে, তখন চীন মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমাতে নিজেদের ভূমিকার কথা জোর দিয়ে তুলে ধরে। দেশটিতে জানায়, শান্তি এগিয়ে নিতে তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কয়েক ডজন ফোনকল করেছে এবং প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং নিজেও লড়াই বন্ধের জন্য পরামর্শ দিতে…
ত্রিপুরা হাইকোর্ট অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের দায়ে দোষী সাব্যস্ত চার বাংলাদেশি নাগরিকের বাকি কারাদণ্ড মওকুফ করে তাঁদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন। দুটি মামলায় গত সোমবার বিচারপতি টি আমরনাথ গৌদের বেঞ্চ এই আদেশ দেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন থেকে…
দৈনিক টার্গেট 


















