সাইবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পর দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ইসরায়েল, যেখানে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ হামলা হয়েছে। তৃতীয় স্থানে ইউক্রেন, হামলার হার ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। ছোট জনসংখ্যার দেশ হওয়া সত্ত্বেও সংঘাতপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সাইবার হামলার মুখোমুখি হচ্ছে। শীর্ষ পাঁচে থাকা অন্য দুটি দেশ হলো তাইওয়ান, ৩ দশমিক ৯ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্য, ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এরপর রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, জাপান, কানাডা ও জার্মানি। তথ্য জিম্মি করে অর্থ আদায়ের সফটওয়্যার র্যানসমওয়্যার আক্রমণের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র অনেক এগিয়ে। এ বছরের মে মাসের তথ্য অনুযায়ী, প্রকাশ্যে আসা বৈশ্বিক র্যানসমওয়্যার ভুক্তভোগীদের ৪৩ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক। এরপর রয়েছে কানাডা, ৫ দশমিক ৬ শতাংশ; যুক্তরাজ্য, ৪ দশমিক ৬ শতাংশ; জার্মানি, ৪ দশমিক শূন্য শতাংশ এবং স্পেন, ৩ দশমিক শূন্য শতাংশ।
সার্বিকভাবে বিশ্বে র্যানসমওয়্যার আক্রমণ আগের বছরের তুলনায় ৪৮ শতাংশ বেড়েছে। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে এই বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ, ১১৯ শতাংশ।
বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা খাতে দ্রুত অগ্রগতি হলেও কিছু স্থায়ী দুর্বলতা রয়েছে। গত তিন বছরে ৫ হাজারের বেশি নথিভুক্ত সাইবার ঘটনা, সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট, ২০২৬ প্রণয়ন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সাইবার নিরাপত্তা ফ্রেমওয়ার্ক এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তবে আইন প্রয়োগ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং ডিজিটাল অধিকারের সঙ্গে নিরাপত্তার ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সাম্প্রতিক বিজিডি ই-জিওভি সিআইআরটি অ্যাডভাইজরি ও সাইবার থ্রেট ল্যান্ডস্কেপ রিপোর্টে উঠে এসেছে, বাংলাদেশের অনেক সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এখনো পুরোনো পিএইচপি সংস্করণ, এন্ড-অব-লাইফ সফটওয়্যার এবং দুর্বল অ্যাকসেস নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করা হচ্ছে। এগুলো সাইবার ঝুঁকির অন্যতম প্রধান কারণ।
এ বছরের আগস্টে সরকারি, বিচার বিভাগীয়, আইন প্রয়োগকারী ও মিডিয়া সাইটে ওয়েবসাইট বিকৃতি এবং তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। ‘বাংলাদেশ’স সাইবার সিকিউরিটি ল্যান্ডস্কেপ ২০২৬ ’-এর তথ্য অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিকভাবে ৪ হাজার ৮০০ থেকে ৫ হাজার ২০০টি বড় ধরনের সাইবার হামলার ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানে প্রকৃত ব্রিচ বা সাইবার লঙ্ঘনের সংখ্যা ১৫ হাজার ছাড়িয়েছে।
বাংলাদেশে সাইবার সুরক্ষার উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে ফিশিং ই-মেইল, ভুয়া সফটওয়্যার, র্যানসমওয়্যার আক্রমণ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিন্নমুখী নিরাপত্তা অনুশীলন। প্রশিক্ষিত পেশাদারের ঘাটতি ও পর্যাপ্ত সম্পদের অভাবে ছোট ব্যবসাগুলোও সহজে হামলার মুখে পড়ে।
দেশে সাইবার হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু আর্থিক ও ব্যাংকিং খাত। ‘বাংলাদেশ’স সাইবার সিকিউরিটি ল্যান্ডস্কেপ ২০২৬’-এর তথ্য অনুযায়ী, র্যানসমওয়্যার, সুইফট জালিয়াতি ও ফিশিংয়ের মাধ্যমে এ খাতে ৩৮ শতাংশ হামলা হয়। ডিডিওএস ও ডেটা এক্সফিলট্রেশনের মাধ্যমে সরকার ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় ৩২ শতাংশ হামলা হয়। এপিআই দুর্বলতা ও ডেটা চুরির মতো ঘটনার মাধ্যমে টেলিকম খাতে ১৫ শতাংশ ঘটনা ঘটে। পেমেন্ট গেটওয়ে ম্যানিপুলেশনের মাধ্যমে ই-কমার্স খাতে ১০ শতাংশ সাইবার হামলা হয়। স্বাস্থ্যসেবা খাতে র্যানসমওয়্যার ও অভ্যন্তরীণ হুমকির মাধ্যমে ৫ শতাংশ হামলা ঘটে।
প্রতিষ্ঠানপ্রতি সাপ্তাহিক সাইবার আক্রমণের সংখ্যার বিচারে এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকা সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। লাতিন আমেরিকায় একটি প্রতিষ্ঠান প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৩ হাজার ৮১৩টি হামলার মুখোমুখি হয়। আফ্রিকায় এই সংখ্যা ৩ হাজার ৭০১। আফ্রিকার দেশ অ্যাঙ্গোলায় প্রতিষ্ঠানভিত্তিক হামলার সংখ্যা সাপ্তাহিক গড়ে ৫ হাজার ৭১৪টি। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রতিষ্ঠানপ্রতি সাপ্তাহিক গড় হামলার সংখ্যা ৩ হাজার ৫৯৩। বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিক্ষা ও গবেষণা খাত। বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সপ্তাহে গড়ে ৬ হাজার ৬৫৬টি সাইবার হামলার শিকার হচ্ছে।
উপাত্ত চুরি বা সাইবার ব্রিচে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ব্যাপক। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিটি তথ্য চুরির ঘটনায় গড়ে ১০ দশমিক ২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। মধ্যপ্রাচ্যে গড়ে ক্ষতির পরিমাণ ৭ দশমিক ২৯ মিলিয়ন ডলার। ১৫ বছর ধরে স্বাস্থ্যসেবা ও হাসপাতাল খাত সাইবার হামলায় সবচেয়ে ব্যয়বহুল খাতের শীর্ষে রয়েছে। এ খাতে প্রতি ঘটনায় গড় ক্ষতি ৭ দশমিক ৪২ মিলিয়ন ডলার। এফবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানগুলো সাইবার অপরাধে ২০ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত জালিয়াতির ঘটনা ছিল ২২ হাজারের বেশি, যার আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার।
বর্তমান সাইবার যুদ্ধের মানচিত্র শুধু ভৌগোলিক সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়। অর্থ, ভূরাজনৈতিক সংঘাত ও ইন্টারনেট সংযোগের ওপর নির্ভর করে এটি বিস্তৃত হচ্ছে। ডিজিটাল যুগে পাসওয়ার্ড হালনাগাদ এবং তথ্য সুরক্ষা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার প্রথম শর্ত।
সূত্র: ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ, ‘বাংলাদেশ’স সাইবার সিকিউরিটি ল্যান্ডস্কেপ ২০২৬’

দৈনিক টার্গেট 


























