প্রথম কারণ, ট্রেড ইউনিয়ন করার এবং শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার বাংলাদেশে এখনো ভালোভাবে চর্চা হওয়ার সুযোগ নেই। এই অধিকার নিশ্চিত করার পরিবেশ তৈরি করা মালিকপক্ষ ও সরকারের দায়িত্ব। তারা সেটা না করে অনেক ক্ষেত্রে উল্টো বাধা দেয়। ফলে বিশেষ করে পোশাকশ্রমিকেরা যখন দাবি তুলে আন্দোলনে নেমে পড়েন, যা ছিল খুবই স্বতঃস্ফূর্ত। ১৯৯০ সালের পর থেকে ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। শ্রমিকেরা যাতে ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে দর-কষাকষি করতে পারেন, সেই জায়গাটা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য মালিক ও সরকারের উদ্যোগ ও আন্তরিকতা দরকার।
দ্বিতীয়ত, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শ্রমিকেরা অংশ নিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন। তাঁরা ভেবেছিলেন এবার বুঝি তাঁদের অবস্থার পরিবর্তন হবে। অভ্যুত্থানের পরপরই মজুরি পুনর্মূল্যায়নের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেটার কোনো গুরুত্ব দেয়নি। নির্বাচিত সরকার এসে প্রথমে সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের পে-স্কেল দ্বিগুণ করেছে। এতে বাজারে জিনিসপত্রের দাম ব্যাপকভাবে বেড়েছে আগের তুলনায়, সঙ্গে বেড়েছে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির দামও। মূল্যস্ফীতির কারণে শ্রমিকেরা আগের মজুরিতে আর জীবন চালাতে পারছেন না। অনেক শ্রমিকই বলেছেন, এই মজুরিতে মাসের সাত দিন বা পনেরো দিনও চলা যায় না। যাঁরা অভ্যুত্থানে এবং অর্থনীতিতেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন, পে-স্কেলের আগে তাঁদের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত ছিল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আমি সরাসরি একটা প্রশ্ন করতে চাই, আপনারা নভেম্বরে এসে মজুরি বোর্ড গঠন করলেন কেন? আমরা শ্রমিক সংগঠনগুলো অভ্যুত্থানের পরপরই অন্তর্বর্তী সরকারকে মজুরি বোর্ড গঠনের কথা বলেছি, পে-স্কেল ঘোষণার আগেও বলেছি। ডিসেম্বরকে যদি আপনারা সংকটের মাস মনে করেন, তাহলে বিষয়টাকে এ পর্যন্ত টেনে আনলেন কেন? শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে সঠিক সময়ে আলোচনা করতে আপনারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। মজুরি বোর্ড যদি পাঁচ মাস আগে গঠন করা হতো, তাহলে শ্রমিকদের আজ রাস্তায় নামতে হতো না। তাই আজকের পরিস্থিতির দায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশ ও সরকারেরই।
ইন্ধন বা ষড়যন্ত্রের কথা আমরা বহুদিন ধরে শুনছি। শেখ হাসিনার সরকারও একই কথা বলত, তখন বিএনপিকে কেন্দ্র করে বলত যে তারা ষড়যন্ত্র করে গার্মেন্টস খাত ধ্বংস করছে।
বোর্ডে দুজন শ্রমিক প্রতিনিধি রাখা হয়েছে। একজন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতা। আরেকজন যে সংগঠনের, সেটি আমাদের এই অঞ্চলে গড়ে ওঠা শ্রমিক আন্দোলনের ধারার সংগঠন নয়। তারা শ্রমিক সংগঠনের চেয়ে এনজিও ধরনের কর্মকাণ্ড বেশি করে থাকে। প্রকৃত অর্থে শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষা করতে পারেন, এমন কাউকে মজুরি বোর্ডে শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কি না সে বিষয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন একজন বর্ষীয়ান শ্রমিকনেতা, তাঁকে আমরা সম্মান করি এবং আশা করি তিনি ভালো ভূমিকা রাখবেন। কিন্তু তাঁরাও মজুরি বোর্ডে নিজেদের রাজনৈতিক দলের অবস্থানের বাইরে ভাবতে পারবেন কি না সেটি নিয়ে সংশয় রয়েই যায়।
তবু আমি মনে করি, গঠিত মজুরি বোর্ডের দ্রুত কাজ অগ্রসর করা দরকার। শ্রমিকদের জীবন আর চলছে না। আরও সময় নিলে খেয়ে-পরে কারখানায় কাজ করা তাঁদের জন্য খুব কঠিন হয়ে যাবে। বোর্ডের উচিত গার্মেন্ট খাতের সব শ্রমিক সংগঠন, এমনকি ন্যাশনাল ফেডারেশনগুলোর সঙ্গেও বসে আলোচনা করা উচিত। সমাধানের জন্য তারা এই দায়িত্বশীল ভূমিকা নেবে, এই আহ্বান আমি জানাচ্ছি। এটা আশাবাদ নয়, আহ্বান, কারণ পরিস্থিতির সমাধান করতে হলে এটাই দরকার।
যে সরকারই হোক, আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তী সরকার বা বর্তমান বিএনপি সরকার, সবাই আসলে ধনিক শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে। তাই মজুরি বোর্ডে নিজেদের দলের লোক ছাড়া কাউকে যুক্ত করে না। বেশির ভাগ সময় সরকার নিজের পছন্দের লোককে চায়, মালিকেরাও তা-ই চায়, যাতে মজুরির ঘোষণা তাঁদের পছন্দমতো হয়। শ্রমিকের মজুরি এক টাকা বাড়াতে হলেও আন্দোলন ছাড়া তা সম্ভব হয় না। যে সরকারই আসে, তারা শ্রমিকের স্বার্থ কম দেখে এবং নিজেদের স্বার্থই রক্ষা করে। তাই এমন নেতাদেরই তারা মজুরি বোর্ডে রাখে।
আন্দোলন করতে গেলে চাকরি হারানোর ঝুঁকিও তো থাকে।
আইএলও কনভেনশন ও আমাদের শ্রম আইন অনুযায়ী, শ্রমিকের দর-কষাকষির অধিকার আছে, মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনের অধিকারও আছে। কিন্তু গার্মেন্ট খাতে ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার এবং তার গণতান্ত্রিক চর্চা মালিক ও সরকারের নানা বাধার কারণে এখনো নিশ্চিত হয়নি। এই আন্দোলন চলাকালেই আমাদের সংগঠনসহ অনেক শ্রমিক মাস্তান ও পুলিশের হামলায় আহত হয়েছেন, প্রচুর শ্রমিক গ্রেপ্তার হয়েছেন। কয়েক হাজারের বেশি শ্রমিকের নামে অজ্ঞাতনামা মামলা দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনে নামলে এ ধরনের বাধা আসবে, শ্রমিকেরা তা জানেন। কিন্তু আন্দোলন করতে গিয়েও তাঁরা নিরাপদ নন।
অবশ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন শুধু আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ২০২৩ সালে মজুরি আন্দোলন করতে গিয়ে চারজন শ্রমিক প্রাণ দিয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও চারজন শ্রমিক প্রাণ দিয়েছেন। এবারো গাজীপুরের বাংলা বাজারে আন্দোলনে থাকা লায়লা গার্মেন্টসের শ্রমিক তৌফিক শেখকে বহিরাগত সন্ত্রাসীরা পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। এইসব হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের গ্রেপ্তার ও বিচার করতে হবে।
মালিকপক্ষের অভিযোগ, বারবার আন্দোলনের কারণে বিদেশি বায়াররা অন্য দেশে চলে যায়, এতে পোশাক খাতেরই ক্ষতি হয়। এই অভিযোগ কতটা যৌক্তিক?
রানা প্লাজা ধসের ঘটনা মালিকদের কারণেই ঘটেছিল। সেখানে বহু শ্রমিক প্রাণ দিলেন, তখনো তাঁরা বলেছিলেন, অর্ডার সব অন্য দেশে চলে যাবে। প্রতিটি মজুরি আন্দোলনের সময়ই তাঁরা একই কথা বলেন, অথচ এখন পর্যন্ত বায়াররা চলে যায়নি। এর বড় কারণ, পৃথিবীতে সবচেয়ে কম মজুরিতে বাংলাদেশের শ্রমিকদের কাজ করানো যায়। ব্র্যান্ড-বায়াররা আমাদের মালিকদের চেয়েও আরও বড় করপোরেট পুঁজির মালিক। যত ঝামেলাই হোক, যেখানে সবচেয়ে সস্তায় পোশাক পাবে, তারা সেখানেই থাকবে। বিষয়টা সস্তা শ্রমের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
আমরা বরং বলতে পারি, শুধু দেশের মালিকদের ওপর চাপ তৈরি করলে হবে না। এমন ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার, যাতে বিদেশি ব্র্যান্ড-বায়ারদেরও জবাবদিহির মধ্যে আনা যায়। মজুরিতে তারা কতটা অবদান রাখবে, তা তারা কখনো স্পষ্ট করে না। আন্দোলন হলেই অর্ডার অন্যত্র চলে যাবে, মালিকদের এই প্রচারণার কায়দাটা পুরোনো এবং যৌক্তিক নয়। গত সপ্তাহেই পত্রিকা ও খবরে দেখলাম, তাঁদের রপ্তানি আয় বেড়েছে। শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে এবং কম মজুরি দেওয়ার পাঁয়তারা থেকে মালিকেরা এসব প্রচারণা চালান।
আমি আগেই বলেছি, আমাদের দেশে ভোটের অধিকারই থাকে না, গণতন্ত্রও থাকে না। ১৯৯০-এর পর মাফিয়া চক্র ও বুর্জোয়া দলগুলো ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন ও সংগঠনগুলো কুক্ষিগত করেছে। ফলে ট্রেড ইউনিয়ন করার গণতান্ত্রিক চর্চা এখানে নেই। আমরা কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন করতে গেলে নানা বাধার মুখে পড়ি। লড়াই করে ইউনিয়ন আদায় করতে হয়, রেজিস্ট্রেশনও আদায় করতে হয়। উল্টো মালিকদের পকেট ট্রেড ইউনিয়ন সহজে রেজিস্ট্রেশন পায়। মালিকেরা যত বেশি কৌশল করবেন, দমন-পীড়ন করবেন, আন্দোলন তত স্বতঃস্ফূর্ত ও বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে পড়বে।
এটা আমাদেরও প্রশ্ন। যে খাত বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি রপ্তানি আয় করছে, যার ওপর ভর করে অর্থনীতি টিকে আছে, সেই খাতের শ্রমিকদের তো রাষ্ট্রের মাথায় তুলে রাখার কথা। অথচ তাঁদের কোনো কিছুর নিশ্চয়তা নেই। কারখানায় কাজ করার জন্য যতটুকু পুষ্টি দরকার, ততটুকু খাবারও তাঁরা পান না। সন্তানকে স্কুলে পড়াতে পারেন না, বাধ্য হয়ে মাদ্রাসায় দেন, আর সেখানে শিশুরা ভয়ানক যৌন নিপীড়নসহ না ধরণের নিপীড়নের শিকার হয়। শ্রমিকের জীবনযাত্রা, সামাজিক নিরাপত্তা সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, এসব নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকার ও মালিকদের যেভাবে ভাবা দরকার, তা তারা কখনো ভাবেন না। মুনাফা ছাড়া শ্রমিকের স্বার্থ ও জীবনের কথা তাদের মাথায়ই আসে না। সেই কারণেই আন্দোলনের রূপও স্বতঃস্ফূর্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।
প্রথমত, শ্রমিকদের সামনে বিভিন্ন বাহিনী এবং সরকারি দলের অঙ্গ-সংগঠনগুলোকে ক্ষমতা প্রদর্শন করা বন্ধ করতে হবে। যাঁদের গ্রেপ্তার করেছেন, তাঁদের ছেড়ে দিন। যাঁদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়েছেন, তা প্রত্যাহার করুন। গার্মেন্ট সেক্টরসহ সব ন্যাশনাল ফেডারেশনের নেতাদের সঙ্গে বসে আলোচনা করুন। এলাকাভিত্তিক ও কারখানাভিত্তিক শ্রমিকনেতাদের সঙ্গেও আলোচনা করুন। সরকারের এত বড় প্রতিষ্ঠান আছে, এত ট্রেড ইউনিয়ন আছে, সবাই মিলে এটা করা সম্ভব। দ্রুত মজুরি বোর্ডের কাজ শুরু করুন। শ্রমিকেরা যে খুব দ্রুত মজুরি পেতে চান, সেটা উপলব্ধি করুন এবং এই বার্তা স্পষ্টভাবে গণমাধ্যম, বিভিন্ন সংগঠন ও আপনাদের বিভিন্ন বাহিনীর মাধ্যমে শ্রমিকদের কাছে পৌঁছে দিন।
সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আজকের পত্রিকা এবং আপনাকেও ধন্যবাদ।

দৈনিক টার্গেট 























