১১ সদস্যের সম্প্রসারিত ব্রিকস জোটের এই ঘোষণা ভারতীয় কূটনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের টানাপোড়েনের মাঝে যৌথ ঘোষণাপত্রে ভারত এমন সব ভাষা ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে, যা সব সদস্যই গ্রহণ করেছে।
সম্মেলনের আগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল আদৌ কোনো যৌথ ঘোষণা হবে কি না। গত মে মাসে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকেও সদস্যরা যৌথ বিবৃতিতে একমত হতে পারেননি। সেই প্রেক্ষাপটে দিল্লি ঘোষণাকে ভারতের জন্য বড় কূটনৈতিক অর্জন বলেই মনে করা হচ্ছে।
ব্রিকস এখন এমন এক জোট যেখানে চীন ও রাশিয়ার পাশাপাশি ভারত, ব্রাজিল, ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রও রয়েছে। ফলে প্রতিটি শব্দই দীর্ঘ আলোচনার ফল।
দিল্লি ঘোষণার সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি হলো একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নিয়ে অবস্থান। ঘোষণায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের পরিপন্থী একতরফা নিষেধাজ্ঞা এবং সেকেন্ডারি স্যাংশন উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে অসমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
যদিও এই যৌথ ঘোষণার কোথাও যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি একতরফা নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী দেশ হিসেবে ওয়াশিংটনকেই এর লক্ষ্যবস্তু বলে মনে করা হচ্ছে। প্রসঙ্গত, বর্তমানে ব্রিকসের দুই সদস্য রাশিয়া ও ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে ঘোষণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার নিন্দা। এতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে থাকা বেসামরিক পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা উদ্বেগের বিষয়।
এখানেও ইরান, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এটি ইরানের সেই দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে তেহরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে আসছে।
একই সঙ্গে ঘোষণায় পশ্চিম এশিয়ায় সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন, রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান এবং বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে দিল্লি ঘোষণায় সবচেয়ে স্পষ্ট ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে ইসরায়েল প্রসঙ্গে। গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশ নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ব্রিকস নেতারা জোরপূর্বক ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতির বিরোধিতা করেছেন। পাশাপাশি ১৯৬৭ সালের সীমান্তের ভিত্তিতে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
লেবানন প্রসঙ্গে ভাষা আরও কঠোর। ঘোষণায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের নিন্দা জানিয়ে ইসরায়েলকে লেবাননের দখলকৃত সব এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। পুরো ঘোষণাপত্রে এটিই একমাত্র অংশ যেখানে ইসরায়েলের নাম সরাসরি উল্লেখ করে নির্দিষ্ট দাবি তোলা হয়েছে।
এই ঘোষণার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—ভারত কি মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে তার অবস্থান পরিবর্তন করেছে?
বিশ্লেষকদের মতে, এর উত্তর ‘না’। কারণ এটি কোনো একক ভারতীয় বিবৃতি নয়। এটি ১১ সদস্যের ঐকমত্যের ভিত্তিতে যৌথ ঘোষণা।
ভারত দীর্ঘদিন ধরেই একদিকে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে, অন্যদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখেছে। একই সঙ্গে রাশিয়া, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—তিন পক্ষের সঙ্গেই সম্পর্ক ধরে রাখার নীতি অনুসরণ করছে।
দিল্লি ঘোষণার ভাষাও সেই বহুমাত্রিক কূটনীতির প্রতিফলন বলেই মনে করা হচ্ছে।
ব্রিকস এখন আর শুধু ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার জোট নয়। সম্প্রসারণের পর এতে যুক্ত হয়েছে মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইন্দোনেশিয়া। ফলে জোটের ভেতরেই রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো।
এই বাস্তবতায় যেকোনো যৌথ অবস্থান গ্রহণ আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল এমন একটি ঘোষণাপত্র তৈরি করা, যা রাশিয়া ও ইরানের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে, আবার একই সঙ্গে সৌদি আরব, আমিরাত ও ভারতের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।
দিল্লি ঘোষণা সেই ভারসাম্য রক্ষার একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘোষণার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় সম্ভবত লেখা নয়, বরং অলিখিত অংশ। কারণ, ব্রিকসের ভেতরে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ১১ সদস্যকে একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে রাজি করানো ভারতের কূটনৈতিক সক্ষমতার প্রমাণ। একই সঙ্গে এটি দেখিয়েছে যে, সম্প্রসারিত ব্রিকস নিজেকে পশ্চিম বিরোধী জোট হিসেবে নয়, বরং বহুমেরুকেন্দ্রিক বৈশ্বিক ব্যবস্থার একটি বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। ভারতের জন্যও বার্তাটি স্পষ্ট—নয়াদিল্লি তার ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’ বা বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির পথ থেকে সরে আসছে না; বরং ভিন্নমতের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমঝোতা তৈরির মধ্যস্থতাকারী হিসেবেই নিজের ভূমিকা জোরদার করতে চাইছে।
তবে এই যৌথ ঘোষণাপত্রে ভারতের কূটনৈতিক সাফল্য প্রশংসিত হলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ নয়াদিল্লিকে সতর্ক করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের প্রভাব সংবলিত এই জোটে মাত্রাতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা ভবিষ্যতে ভারতের জাতীয় ও কৌশলগত স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
অধ্যাপক রাজাগোপালনের মতে, রাশিয়া ও চীন ব্রিকসকে মূলত পশ্চিমা-বিরোধী অক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। ফলে ভারতে এই জোটকে নিয়ন্ত্রণ ও নিজস্ব ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর জোর দিতে হবে।
ইন্ডিয়া টুডেতে প্রকাশিত সাংবাদিক সুশীম মুকুলের লেখাটি সংক্ষেপে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা
সৌদি আরবে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মধ্যপ্রাচ্যের ছয় মাসের যুদ্ধে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। গত মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের চারটি শহর লক্ষ্য করে চালানো এই হামলার পর আবারও সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে রিয়াদ ও হুতিরা। এর পাল্টা জবাবে সৌদি যুদ্ধবিমান…
দানিয়ুব নদীর তীরে কাদা ও গাছে ঘেরা এক টুকরো জমি। নাম ‘ফ্রি রিপাবলিক অব লিবারল্যান্ড’। নৌকা থেকে দেখলে জায়গাটিকে অত্যন্ত সাধারণ মনে হয়। কিন্তু পুঁচকে এই ভূখণ্ডটির পেছনে জড়িয়ে আছেন ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টো ব্যবসার সবচেয়ে বড় অর্থায়নকারীসহ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনীরা…
দৈনিক টার্গেট 




















