প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, বিরোধীদের এই অগ্রযাত্রা হয়তো সীমিত আকারের হবে। ডেমোক্র্যাটরা সম্ভবত মার্কিন কংগ্রেসের নিম্মকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস বা প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে এবং সিনেটেও রিপাবলিকানদের সঙ্গে ব্যবধান কমিয়ে আনবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সীমিত প্রত্যাশা রূপ নেয় কংগ্রেসের উভয় কক্ষজুড়ে ব্যাপক রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রতীক হয়ে ওঠেছে টেক্সাস। কয়েক দশক পর সেখানে একজন ডেমোক্র্যাট গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের সিনেট প্রার্থী জেমস টালারিকো রিপাবলিকান ক্ষমতাসীন প্রার্থীকে পরাজিত করে অঙ্গরাজ্যটিতে ৩২ বছরের নির্বাচনী খরা কাটিয়েছেন। ভারতীয়-আমেরিকান ভোটারদের সমর্থন পেতে একটি ভারতীয় রেস্তোরাঁয় দোসা তৈরি করে আলোচনায় এসেছিলেন তিনি।
কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকারি অর্থ বরাদ্দের ওপর তাদের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে ঠিকই, কিন্তু পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা অনেকাংশেই অক্ষুণ্ন থাকবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সংবিধান অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে ব্যাপক ও স্বতন্ত্র ক্ষমতার অধিকারী। ফলে তিনি নিজের ইচ্ছামতো অনেক কিছুই করতে পারবেন। এর মধ্যে রয়েছে ইরানে আবারও বোমা হামলা শুরু করা, কিউবার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা কিংবা ইউক্রেনকে দেওয়া মার্কিন সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া। এসব সম্ভাবনার ইঙ্গিত তিনি আগেই দিয়েছেন।
ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস নিঃসন্দেহে প্রেসিডেন্টের সামরিক পদক্ষেপের স্বাধীনতা সীমিত করতে ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশন’ বা যুদ্ধক্ষমতা-সংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করবে। পাশাপাশি বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের নজরদারি শুনানি আয়োজনের সম্ভাবনাও রয়েছে। কিন্তু এসব আইন প্রণয়ন ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থার কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার মুখে ডেমোক্র্যাটদের ক্ষমতাহীনতাই তুলে ধরবে।
কারণ, নির্বাহী বিভাগের সামরিক পদক্ষেপ সীমিত করতে কংগ্রেসের যেকোনো প্রস্তাব কার্যকর হতে প্রেসিডেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। কিন্তু ট্রাম্প তাতে ভেটো দেবেন, সেটাই স্বাভাবিক। আর প্রেসিডেন্টের ভেটো অকার্যকর করতে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেও ডেমোক্র্যাটদের হাতে সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই।
এ ছাড়া আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক হাতিয়ার—শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা—এখনো ব্যাপকভাবে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কংগ্রেস প্রেসিডেন্টকে বিদেশে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ আটকে দিতে পারে। কিন্তু নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে শুল্ক আরোপ, নিষেধাজ্ঞা জারি কিংবা এমনকি বোমা হামলার মতো পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত করার সুযোগ কংগ্রেসের হাতে নেই। এসব বিষয় মূলত প্রেসিডেন্টের নিজস্ব এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে।
তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল ভারতের জন্য তাৎক্ষণিক মনস্তাত্ত্বিক ও বাস্তব স্বস্তি এনে দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশের ক্ষেত্রে। ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ‘মাগা’ রাজনৈতিক বলয়ের বক্তব্য ও প্রচারণা প্রায়ই অভিবাসন, অশ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী এবং বিদেশি দক্ষ শ্রমশক্তির বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান বিধিনিষেধমূলক ও বৈরী পরিবেশ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ভারতীয়দের লক্ষ্য করেই যেন এই বিরূপ মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ভারসাম্যে যে পরিবর্তন এসেছে, তা উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক উত্তাপ কিছুটা কমে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অধিকাংশ ভারতীয়-আমেরিকানের জন্য এটি নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। এ বছর তাঁদের বড় অংশ ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোট দিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বিপুল ভারতীয় প্রবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে কয়েক লাখ তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী, শিক্ষার্থী, গবেষক ও উদ্যোক্তা রয়েছেন। তাঁদের জন্য কম বৈরী জাতীয় পরিবেশ ভিসার স্থিতিশীলতা, গ্রিন কার্ডের দীর্ঘসূত্রতা এবং দৈনন্দিন জীবনে বর্ণবাদী বৈরিতা ও ‘অপর’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার আশঙ্কা কমাতে পারে।
ভারতীয়-আমেরিকান সম্প্রদায় ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও নাগরিক জীবনে একটি শক্তিশালী প্রভাবশালী জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। বৈশ্বিক মেধা ও বাদামি বর্ণের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতি কম বৈরী জনপরিসর এই সম্প্রদায়ের জন্য ইতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি করবে।
শুল্ক আরোপের মতো নির্বাহী ক্ষমতার বাইরেও কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিরঙ্কুশ সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন-সংক্রান্ত প্ল্যাটফর্মগুলোর নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন আনবে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটি এবং সশস্ত্র বাহিনী-সংক্রান্ত কমিটি। এসব পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্র-ভারত প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
ডেমোক্র্যাটরা এসব কমিটির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। ভারতের সঙ্গে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ভারতে ২৪টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মধ্যে আটটির সভাপতিত্ব বিরোধী দলের হাতে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রে কমিটির সভাপতির পদ সব সময়ই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত থাকে।
ফলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
কংগ্রেসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালনকারী ভারতীয়-আমেরিকান প্রতিনিধি অ্যামি বেরা প্রতিনিধি পরিষদের দক্ষিণ এশিয়া অথবা ইন্দো-প্যাসিফিকবিষয়ক পররাষ্ট্রবিষয়ক উপকমিটির চেয়ারম্যান হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন। এতে ক্যাপিটল হিলে নয়াদিল্লির জন্য একজন অভিজ্ঞ, বিষয় সম্পর্কে অবগত এবং তুলনামূলকভাবে সহানুভূতিশীল আলোচক পাওয়া যাবে।
এই পরিবর্তনের ফলে ‘ক্রিটিক্যাল অ্যান্ড এমার্জিং টেকনোলজি ইনিশিয়েটিভ’ বা গুরুত্বপূর্ণ ও উদীয়মান প্রযুক্তি উদ্যোগ (আইসিইটি) এবং যৌথ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের ওপর কংগ্রেসের আইনপ্রণেতাদের মনোযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে কোয়াড সহযোগিতার প্রতিও কংগ্রেসের জোরালো সমর্থন অব্যাহত থাকতে পারে। তবে এর জন্য শর্ত হলো, ট্রাম্প প্রশাসনকেও কোয়াডের প্রচার ও অগ্রগতিতে আগ্রহী থাকতে হবে।
একই সময়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে (এমইএ) আরেকটি বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।
ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্বাধীন কমিটিগুলো এমন কিছু গৌণ বিষয়ে আরও কঠোর নজরদারি চালাবে, যেগুলো নয়াদিল্লির জন্য খুব একটা স্বস্তিদায়ক হবে না। ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা প্রমিলা জয়পাল নরেন্দ্র মোদি সরকারের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। অন্য ডেমোক্র্যাটরা মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা-সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারেন। এ ছাড়া ভারতের অব্যাহত রুশ অপরিশোধিত তেল কেনার বিষয়টি নিয়েও সেই পরিচিত সমালোচকরা প্রশ্ন তুলবেন।
উল্লেখ্য, রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার কারণে ভারত ও চীনের ওপর ১০০ শতাংশ নিষেধাজ্ঞা আরোপের বাধ্যবাধকতা সংবলিত ‘গ্রাহাম অ্যাক্ট’ পাসের পক্ষে বেশ কয়েকজন ডেমোক্র্যাট সমর্থন জানিয়েছিলেন।
সামগ্রিকভাবে এসব পরিবর্তনের ফলে এমন একটি পররাষ্ট্রনীতির পরিবেশ তৈরি হতে পারে, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক কৌশলগত অংশীদারত্ব ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির সমন্বয় কিছুটা ধীরগতিতে এগোবে। পাশাপাশি মার্কিন প্রশাসনের বিভিন্ন উদ্যোগের ওপর কংগ্রেসের নজরদারি আরও সক্রিয় ও সমালোচনামূলক হয়ে উঠবে।
তবে ভারতের সামনে এই বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। শেষ পর্যন্ত ভারতের কৌশলগত অবস্থানের ভিত্তি সব সময়ই ছিল বাস্তববাদী ও জোটনিরপেক্ষ কূটনীতি। যুক্তরাষ্ট্র-ভারত কৌশলগত অংশীদারত্ব কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি কিংবা একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোটের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। বরং এর ভিত্তি অনেক গভীরে প্রোথিত কাঠামোগত বাস্তবতায়।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে দুই দেশের অভিন্ন নিরাপত্তাগত স্বার্থ, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতে শক্তিশালী সমন্বয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে বিকশিত ও প্রভাবশালী ভারতীয়-আমেরিকান সম্প্রদায়ের উপস্থিতি—এসবই সেই সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এই বাস্তবতাগুলো রাতারাতি বদলে যাওয়ার নয়।
ওয়াশিংটনে সরকার পরিবর্তিত হয়, কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠতার পালাবদল ঘটে এবং রাজনৈতিক জোয়ার-ভাটার মতো উত্থান-পতন চলতে থাকে। তবে চলতি শতাব্দীতে ভারতের কূটনৈতিক কাঠামো কংগ্রেস ও বিজেপি—উভয় সরকারের আমলেই রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—দুই দলের প্রশাসনের সঙ্গে কয়েক দশক ধরে সফলভাবে সম্পর্ক পরিচালনা করেছে।
ক্যাপিটল হিল কিংবা হোয়াইট হাউস—যেখানেই যে দলের নিয়ন্ত্রণ থাকুক না কেন, এমনকি ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতিতে লেনদেননির্ভর মনোভাব যতই বাড়ুক না কেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি দৃঢ়, বহুমাত্রিক ও টেকসই সম্পর্ক বজায় রাখা ভারতের পররাষ্ট্রনীতির জন্য অপরিহার্য। নয়াদিল্লিকে স্থির বাস্তববাদ, দূরদর্শিতা এবং হিসাবি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই এই সম্পর্ক পরিচালনা করে যেতে হবে।
এনডিটিভিতে লিখিত শশী থারুরের নিবন্ধ থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান।

দৈনিক টার্গেট 

















