দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজকে (ঢামেক) আধুনিক ও টেকসই অবকাঠামোর আওতায় আনতে বড় ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে সরকার। অতিরিক্ত রোগীর চাপ, পুরোনো ভবনের ঝুঁকি এবং শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যার মতো দীর্ঘদিনের সংকট বিবেচনায় নিয়ে কলেজটির অবকাঠামো পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা। আগামী ১৯ আগস্ট জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে চলতি বছর থেকেই নির্মাণকাজ শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর ২০৩০ সালের মধ্যে পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
থাকছে নতুন একাধিক ভবন
প্রকল্পের আওতায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে একটি অত্যাধুনিক অ্যাকাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হবে। তিনটি বেজমেন্টসহ ১৫ তলা এই ভবনে থাকবে চারটি বড় লেকচার থিয়েটার। প্রতিটি লেকচার থিয়েটারে একসঙ্গে ৩০০ শিক্ষার্থীর বসার ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি পরীক্ষার জন্য দুটি পৃথক কক্ষও তৈরি করা হবে।
শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট কমাতে ৮০০ জনের থাকার উপযোগী একটি ১৫ তলা ছাত্র হোস্টেল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। একইভাবে শিক্ষকদের আবাসনের সমস্যা সমাধানে তৈরি হবে ১৫ তলা একটি কোয়ার্টার ভবন।
এ ছাড়া ক্যাম্পাসে প্রায় ৮০০ মুসল্লির নামাজ আদায়ের সুবিধা রেখে চারতলা একটি মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনাও প্রকল্পে রাখা হয়েছে।
বাড়তি রোগীর চাপ ঢামেকে
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে বর্তমানে ২ হাজার ৬০০ শয্যার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার। নির্ধারিত ধারণক্ষমতার তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় চিকিৎসা দিতে গিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে প্রতিনিয়ত অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ক্যাম্পাসে প্রায় ৬০টি পুরোনো ও নতুন ভবন রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু ভবন দীর্ঘদিনের ব্যবহারে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো স্থাপনা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে। ফলে নতুন ও নিরাপদ অবকাঠামো তৈরি করাকে জরুরি বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
শিক্ষার্থীদের আবাসনেও সংকট
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী এমবিবিএস ও বিভিন্ন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কোর্সে পড়াশোনা করছেন। তাদের একটি বড় অংশের আবাসনের জন্য পুরোনো হোস্টেলের ওপর নির্ভর করতে হয়।
তবে কয়েকটি পুরোনো আবাসিক ভবন বর্তমানে ব্যবহার উপযোগিতা হারাচ্ছে। ডা. ফজলে রাব্বি হলের একটি অংশ ইতোমধ্যে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এতে আবাসন সংকট আরও তীব্র হয়েছে। নতুন ছাত্রাবাস নির্মাণের মাধ্যমে এই সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
গবেষণা ও চিকিৎসা শিক্ষায় গুরুত্ব
নতুন অ্যাকাডেমিক ভবন নির্মাণের ফলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, পরীক্ষা এবং গবেষণার জন্য উন্নত পরিবেশ তৈরি হবে। আধুনিক শিক্ষা অবকাঠামো থাকলে চিকিৎসা শিক্ষার মান উন্নয়নের পাশাপাশি ভবিষ্যতে দক্ষ চিকিৎসক তৈরির সুযোগও বাড়বে।
পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষা ও গবেষণার সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি রোগীদের চিকিৎসাসেবার পরিবেশও উন্নত হবে।
পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোর পরিকল্পনা
শুধু নতুন ভবন নির্মাণেই প্রকল্পটি সীমাবদ্ধ থাকছে না। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ক্যাম্পাসে সবুজায়ন এবং অগ্নিনিরাপত্তার জন্য ফায়ার হাইড্র্যান্ট ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয় আনতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সংযোজন করা হবে। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের অবকাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে। আধুনিক লিফটসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সুবিধা যুক্ত করার কথাও রয়েছে প্রকল্পে।
এ ছাড়া ডা. ফজলে রাব্বি হল ও এর আশপাশের অভ্যন্তরীণ সড়কের উন্নয়ন করা হবে। এর ফলে ক্যাম্পাসের যোগাযোগব্যবস্থা ও শিক্ষার্থীদের চলাচল আরও সুবিধাজনক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের নতুন রূপ
১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ দেশের চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়লেও চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সব স্থাপনা আধুনিকায়ন করা সম্ভব হয়নি।
এবারের পরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে পুরোনো অবকাঠামোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে একটি আধুনিক শিক্ষা ও গবেষণা পরিবেশ গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আবাসন, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সুবিধা এবং ক্যাম্পাস ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আসবে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকট অনেকটাই কাটবে। আধুনিক শিক্ষা সুবিধার পাশাপাশি উন্নত পরিবেশে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সক্ষমতাও বাড়বে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের।
দৈনিক টার্গেট 
























