বাংলাদেশের গ্রাম থেকে শহর সবখানেই পান খাওয়া বহু মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাস। সামাজিকতা, অতিথিপরায়ণতা কিংবা ভোজন-উপরান্ত স্বাদ বদলের একটি পরিচিত অংশ হলো পান।
বিশেষ করে বিয়ে-সালামি, পূজা-পার্বণ বা উৎসবে পান পরিবেশন যেন ঐতিহ্যেরই অংশ। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, পান খাওয়ার সংস্কৃতি জনপ্রিয় হলেও এর স্বাস্থ্যঝুঁকি উপেক্ষা করা ঠিক নয়।
পানের উপাদান কী? কেন তা গুরুত্বপূর্ণ?
পান সাধারণত তিনটি মূল উপাদান নিয়ে তৈরি-
১. পান পাতা
২. চুন
৩. সুপারি
অনেক ক্ষেত্রে এর সঙ্গে জর্দা, তামাক, কিংবা বিভিন্ন সুগন্ধি ও মিষ্টি উপাদান যোগ করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, উপাদানগুলোর পরিবর্তনের ওপরই নির্ভর করে পান শরীরে কী প্রভাব ফেলবে।
পান পাতায় কিছু অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকলেও চুন মুখগহ্বরের টিস্যুতে রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে সুপারি দীর্ঘদিন চিবালে মুখের পেশী শক্ত হয়ে যায়
আর তামাক বা জর্দা যুক্ত হলে ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যায় দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত।
পান খেলে শরীরে কী ঘটে?
পান খাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই শরীরে কিছু পরিবর্তন দেখা দিতে পারে-
১. মুখে ঝাঁঝালো অনুভূতি
২. হালকা উত্তেজনা
৩. সতেজতার ভাব
৪. লালার পরিমাণ বাড়া
এগুলো মূলত সুপারি ও চুনের প্রভাবে তৈরি হলেও স্বাস্থ্যগতভাবে তা সবসময় ভালো নয়।
দীর্ঘমেয়াদে পান খাওয়ার ঝুঁকি
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন নিয়মিত পান খেলে যে ঝুঁকিগুলো বেশি স্পষ্ট হয়-
১. মুখের ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি
বিশেষ করে তামাক ও জর্দা মিশ্রিত পান মুখ ও গলার ক্যানসারের অন্যতম কারণ। গবেষণা বলছে, নিয়মিত জর্দা-পান খাওয়া মানুষদের এ ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি।
২. সাবমিউকাস ফাইব্রোসিস
এটি মুখের ভেতরের টিস্যু শক্ত হয়ে যাওয়া একটি রোগ। শুরুতে মুখ পুরোপুরি খুলতে অসুবিধা হয়, পরে খাবার খাওয়া পর্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়ে। এই রোগের প্রধান কারণ সুপারি।
৩. দাঁতের সমস্যা
দাঁতে বাদামী দাগ
এনামেল ক্ষয়
দাঁতের গোড়া নরম হয়ে যাওয়া
মাড়ির প্রদাহ
চুন ও সুপারির সম্মিলিত প্রভাবে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়।
৪. হজমের সমস্যা
অনেকেই মনে করেন পান হজম ঠিক করে। চিকিৎসকরা বলছেন, এটি আংশিক সঠিক হলেও অতিরিক্ত সুপারি ও চুন পাকস্থলীতে অস্বস্তি এবং অ্যাসিডিটি বাড়ায়।
৫. মুখে দুর্গন্ধ ও শুষ্কভাব
চুন মুখ শুকিয়ে দেয়, দীর্ঘদিন খেলে মুখে দুর্গন্ধ স্থায়ীও হয়ে যেতে পারে।
তাহলে কি পান খাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন পান খাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়। তবে “কী ধরনের পান” এবং “কতটা পরিমাণে” খাওয়া হচ্ছে, সেটাই মূল বিষয়।
১. তামাক বা জর্দা ছাড়া পান মাঝে মাঝে খেলে ঝুঁকি তুলনামূলক কম
২. সুপারি যত কম ব্যবহার হয় তত ভালো
৩. ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে মিষ্টিযুক্ত পান এড়িয়ে চলা উচিত
গর্ভবতী নারীদের পান না খাওয়াই নিরাপদ
জানার মতো কিছু ভালো দিকও আছে
পান পাতার নিজস্ব কিছু উপকারিতা রয়েছে-
১. মুখের হালকা ব্যাকটেরিয়া কমাতে পারে
২. ভোজনের পর সতেজতা দিতে পারে
৩. অল্প পরিমাণে লালা নিঃসরণ বাড়িয়ে হজমে সহায়তা করতে পারে
তবে গবেষকরা স্পষ্ট করে বলছেন এই উপকারিতা পানকে ঝুঁকিমুক্ত করে না।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
ডেন্টাল ও ওরাল ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের সার্বিক সুপারিশ-
১. তামাক ও জর্দা সম্পূর্ণ বর্জন
২. অতিরিক্ত সুপারি ও চুন এড়ানো
৩. প্রতিবার পান খাওয়ার পর মুখ ধুয়ে ফেলা
৪. ছাত্র-ছাত্রী ও কিশোরদের পান থেকে দূরে রাখ
৫. মুখে জ্বালা, আলসার, শক্তভাব কিংবা রক্তপাত দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া
পান খাওয়া আমাদের শত বছরের সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বলছে সংস্কৃতি থাকলেও সচেতনতা জরুরি। তাই পান উপভোগ করতে চাইলে সেটি যেন স্বাস্থ্যঝুঁকি না বাড়ায়, সেদিকে নজর দেওয়াই সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত।
দৈনিক টার্গেট 






















