সায়েন্টিফিক রিপোর্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত ওই গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, হিমবাহের হ্রদ থেকে সৃষ্ট বন্যার ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোতে নির্মাণকাজ আরও দ্রুত বেড়েছে। একই সময়ে এসব এলাকায় নির্মিত এলাকার পরিমাণ প্রায় ৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া বিজ্ঞানীরা বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। কারণ, তাঁরা নির্দিষ্ট একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নিয়ে গবেষণা করেছেন। একই ধরনের ঝুঁকিতে থাকা পাশের এলাকাগুলো তাঁদের বিশ্লেষণের আওতায় ছিল না।
গত আগস্টে নেপালে ভয়াবহ বন্যায় ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং হাজারো মানুষ নিখোঁজ হওয়ার আগেই গবেষণাটি করা হয়েছিল। এরপরও দেশটিতে বেশ কয়েকটি ছোট আকারের দুর্যোগ ঘটেছে। এর মধ্যে ১১ অক্টোবর বুধি গণ্ডকী নদীর তীরবর্তী এলাকায় বন্যায় ২০০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পাঁচটি সেতু ভেসে যায় এবং পাঁচজন নিখোঁজ হন।
যুক্তরাজ্য, নেপাল ও ভারতের নয়জন গবেষক হিমালয়ের নদীগুলোর ভাটির দিকে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা এবং প্রায় ১ হাজার ৩৬০টি হিমবাহের হ্রদের আশপাশের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছেন।
তাঁরা এসব এলাকায় উল্লেখযোগ্য হারে নির্মাণকাজের বিস্তার দেখতে পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে পর্যটনসংশ্লিষ্ট স্থাপনা, অবকাঠামো ও আবাসন নির্মাণ।
হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত নেপালের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র পোখারায় এই পরিবর্তন স্পষ্ট। গত ৩০ বছরে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের চাহিদা মেটাতে শহরটির ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে।
পোখারার মেয়র ধনা রাজ আচার্য বলেন, অন্নপূর্ণা পর্বতমালা থেকে নেমে শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া সেটি গণ্ডকী নদীর কারণে সৃষ্ট ঝুঁকি মোকাবিলা করা বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর ভাষ্য, নদীর তীর থেকে মাত্র ৫ মিটার দূরেও অনেক পুরোনো ভবন রয়েছে। নতুন বিধিতে নদীর তীর থেকে আরও দূরে ভবন নির্মাণের নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে পরিস্থিতি বদলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
মেয়র বলেন, ‘ভবনগুলো কোথায় সরানো হবে এবং কীভাবে সরানো হবে, সেটিই আসল চ্যালেঞ্জ।’
পোখারার উত্তরে রয়েছে বিশ্বখ্যাত অন্নপূর্ণা ট্রেকিং অঞ্চল। সেখানেও নদীর তীর ঘেঁষে বসতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসে এসব বসতির কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সেখানকার একটি হোমস্টে পরিচালনা করেন ফুরপা ছিরিং লামা। পরিস্থিতি নিয়ে অসহায় বোধ করছেন তিনি। বছরের এই সময়ে, অর্থাৎ ট্রেকিংয়ের ভরা মৌসুমে, তাঁর ২০টি কক্ষই সাধারণত পর্যটকে পূর্ণ থাকে। কিন্তু এখন মাত্র পাঁচটি কক্ষ ভাড়া হয়েছে।
লামা বলেন, ‘আমরা ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে এই ব্যবসা করছি, কিন্তু এ ধরনের দুর্যোগ কখনো দেখিনি।’
হিমবাহের পানি থেকে সৃষ্ট মোদি নদীর কাছাকাছি একটি হোটেল পরিচালনা করেন কৃষ্ণ গাউচান। তিনিও উদ্বিগ্ন। তাঁর ভাষায়, ‘হিমবাহ ধসে পড়লে কিংবা হিমবাহের হ্রদ ভেঙে পানি বেরিয়ে এলে এই নদীতে বন্যা হতে পারে। আমরা সব সময় আতঙ্কের মধ্যে থাকি।’
ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থানীয় একটি ক্যাম্পাসের ভূগোলবিদ খগেন্দ্র পৌডেলের মতে, পর্যটন খাতের বিনিয়োগকারীরা এসব স্থানের সম্ভাব্য বিপদ বিবেচনায় না নিয়েই কোনো কোনো জায়গাকে পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রচার করছেন। ভারতের উত্তরাঞ্চলের হিমালয় উপত্যকার কিছু এলাকাতেও একই ঘটনা ঘটছে, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় তীর্থস্থান রয়েছে।
পোখারা হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি স্বীকার করেছেন, ওই অঞ্চলে পর্যটন ব্যবসার সম্প্রসারণ হয়েছে ‘যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়াই’। পর্যটন গন্তব্যগুলোর প্রচারও হয়েছে ‘এলোমেলোভাবে’।
লক্ষ্মণ সুবেদি বলেন, ‘দুর্যোগ আঘাত হানার পর আর কিছু করার থাকে না। একটি পেশাজীবী সংগঠন হিসেবে আমরা পর্যটন উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করছি।’
তবে ঝুঁকির মুখে শুধু পর্যটন খাত নয়। ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর আশপাশের এলাকাগুলোতে জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
গবেষণাটির প্রধান লেখক ও ইউনিভার্সিটি অব লিডসের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ সি স্কট ওয়াটসন সতর্ক করে বলেন, ‘নদী উপত্যকাগুলোতে জনবসতি যত বাড়ছে, আজ উন্নয়ন নিয়ে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তা আগামী কয়েক দশক ধরে দুর্যোগের ঝুঁকির ধরন নির্ধারণ করবে।’
গবেষকেরা যেসব ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, বাস্তবে বিপদের মুখে থাকা ভবনের সংখ্যা তার চেয়েও বেশি হতে পারে।
গবেষণায় নদী বা হিমবাহের হ্রদের পানির পৃষ্ঠ থেকে উল্লম্বভাবে ৫০ মিটারের মধ্যে থাকা ভবনগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যার সময় নেপালের রাসুয়া জেলার স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, কোনো কোনো স্থানে নদীর পানির উচ্চতা ৭০ মিটার পর্যন্ত বেড়েছিল। ফলে নদীর তীর থেকে তুলনামূলক দূরে থাকা ভবনও বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ধ্বংসাবশেষ ও কাদার নিচে চাপা পড়েছে।
এসব অঞ্চলে দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ার প্রধান কারণগুলোর একটি হলো হিমালয় অঞ্চলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি। বিজ্ঞানীদের মতে, সেখানে উষ্ণতা বাড়ছে বৈশ্বিক গড় হারের দ্বিগুণ গতিতে। এর ফলে হিমবাহ, বরফের বিশাল স্তর, তুষারস্তূপ এবং সারা বছর জমে থাকা মাটি দ্রুত গলছে।
এর প্রভাবে পাহাড়ের ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে। এসব এলাকায় প্রায়ই ভূমিকম্পও হয়। ফলে পাহাড়ধসসহ বিভিন্ন বিপর্যয় ঘটতে পারে, যার ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়ে ভাটির জনবসতিতে।
হিমবাহ দ্রুত গলে পানি জমতে থাকায় হিমবাহের হ্রদগুলো বড় হয়ে উঠছে। একপর্যায়ে এসব হ্রদের বাঁধ ভেঙে গেলে প্রাণঘাতী বন্যা দেখা দিতে পারে। নেপালে ১৯৪০ সাল থেকে এ ধরনের প্রায় ৩০টি ঘটনার নথি রয়েছে।
তাপমাত্রা বাড়ার আরেকটি প্রভাব হলো, যেসব উচ্চতায় আগে কেবল তুষারপাত হতো, সেখানে এখন বৃষ্টিও হচ্ছে। এর ফলে পাহাড়ের ঢাল ধসে পড়া, পাথর ও বরফের স্তূপ নিচে নেমে আসাসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যে সংকটের জন্য নেপাল দায়ী নয়, তার জন্য দেশটিকে ‘বিশাল মূল্য’ দিতে হচ্ছে।
শাহ বলেন, ‘প্রতিটি বড় দুর্যোগ উন্নয়নের বহু বছরের অর্জন মুছে দেওয়ার হুমকি তৈরি করে। আর যে ক্ষতির জন্য দায়ী নয়, তা মেরামত করতে একটি দরিদ্র দেশকে ঋণ নিতে বাধ্য করে।’
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডোর পর্বতভূগোলবিদ অল্টন বায়ার্স এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না। তাঁর মতে, গবেষণাটি আরও কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ও অন্যান্য প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ‘একটি সূচনাবিন্দু’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
তবে তা বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না। পরিবেশ ও দুর্যোগ নিয়ে কাজ করা অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, নির্মাণসংক্রান্ত বিধিবিধান মাঠপর্যায়ে যথাযথভাবে কার্যকর করা হয় না। বছরের পর বছর ধরে অনেক এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে উন্নয়নকাজ চলছে।
নেপাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর পরিকল্পনাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও নিবন্ধক অধ্যাপক সূর্য রাজ আচার্যের মতে, নদীর তীরবর্তী নিচু ও সমতল জমিতে সড়ক, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, হোটেল এবং বাজারকেন্দ্রিক শহর দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। এসব জমিতে যাতায়াত সহজ এবং নির্মাণকাজ করাও তুলনামূলক সুবিধাজনক।
তিনি বলেন, উন্নয়নকাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই নদীর তীর থেকে দূরে থাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষাবিধি উপেক্ষা করেছেন।
আচার্যের ভাষায়, ‘হিমালয়ের মতো ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রে অন্য জায়গার তুলনায় আরও কঠোর পরিকল্পনা ও নির্মাণবিধি প্রয়োজন। অথচ এসব নিয়ম দুর্বল এবং যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয় না।’
নেপালের কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব সমস্যা সমাধানে তারা কাজ করছে। দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া-ভোতেকোশি নদীপথের ১৫ মিটারের মধ্যে থাকা বসতিগুলোতে শিগগিরই বসবাস ও নির্মাণ নিষিদ্ধ করা হবে। অন্য নদী উপত্যকাগুলোতেও একই ধরনের বিধি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী ধরম রাজ উপ্রেতি বলেন, ‘এটি কঠিন কাজ। কারণ, অনেক জায়গায় মানুষের সঙ্গে তাদের জমি ও সম্পত্তির আবেগের সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু বাড়তে থাকা ঝুঁকিকে আমরা উপেক্ষা করতে পারি না।’
নেপালের পশ্চিম সীমান্তের ওপারে ভারতের উত্তরাখন্ড রাজ্যেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে। কর্মী অনুপ নৌতিয়ালের অভিযোগ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথা বলে সেখানে পর্যটকের সংখ্যা সীমিত রাখার বিধি ও পরিবেশগত নিয়মকানুন এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
নৌতিয়াল বলেন, কাগজে-কলমে নদীর তীরের খুব কাছে বাড়িঘর ও অবকাঠামো নির্মাণ নিষিদ্ধ করে ভূমি ব্যবহারের বিধি রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব নিয়মের প্রয়োগ দেখা যায় না। তাঁর ভাষায়, ‘সব জায়গায় ব্যাপকভাবে নির্মাণকাজ চলতে দেখবেন।’
১২ অক্টোবর উত্তরাখন্ড সরকার বন্যাপ্রবণ সমতল ভূমিতে জমির ব্যবহার ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধি অনুমোদন করেছে। রাজ্য মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, ‘সম্ভাব্য বন্যার ক্ষতি থেকে জীবন, সম্পত্তি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা করা এবং একই সঙ্গে বন্যার পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখাই এর উদ্দেশ্য।’
তবে ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ গবেষণাকেন্দ্রের পরিচালক বসন্ত রাজ অধিকারী মনে করেন, এসব হুমকি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হবে না।
ঝুঁকি কমানোর আরেকটি উপায় হতে পারে বিমার শ্রেণিবিন্যাস। অধিকারীর মতে, কর্তৃপক্ষ যদি এলাকাগুলোকে উচ্চ, মাঝারি ও নিম্ন ঝুঁকির ভিত্তিতে চিহ্নিত করে, তবে সেই অনুযায়ী বিমার সুবিধাও নির্ধারিত হতে পারে। এতে তুলনামূলক নিরাপদ এলাকায় বাড়ি নির্মাণকারীরা আরও ভালো বিমা সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
তবে আপাতত হিমালয় অঞ্চলজুড়ে নির্মাণকাজের গতি কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

দৈনিক টার্গেট 



























