আগামী সপ্তাহে ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর ঠিক আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানান, আর ঠিক পরেই এই বৈঠকের খবর সামনে এল। এই বৈঠকের পর একটি গুঞ্জন ডালপালা ছড়িয়েছে যে, তবে ইরানে ফের হামলা চালানোর পরিকল্পনা করতেই তেল আবিব সফর কি না?
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাসের আক্রমণের পর এটিই ইসরায়েলের প্রথম নির্বাচন। ওই হামলার পর ইসরায়েল—গাজা, লেবানন ও ইরানে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, নেতানিয়াহুর কট্টর ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী জোট এবার পার্লামেন্ট নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে পারে। তবে অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর জন্যও সরকার গঠন করা বেশ কঠিন হতে পারে।
ব্রিটিশ থিংক ট্যাংক চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক পরিচালক সানাম ভাকিল মনে করেন, বেশ কয়েক মাস টানাপোড়েনের পর নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের এই সমর্থন রাজনৈতিকভাবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘এর ফলে ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু নিজের প্রয়োজনীয়তার কথা জনগণের কাছে তুলে ধরার সুযোগ পাবেন।’
তবে নির্বাচনের ফলাফলে এর প্রভাব খুব বেশি পড়বে না উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব এবং ইরান যুদ্ধের পরিণতি নিয়ে ইসরায়েলের ভোটাররা এখনো দ্বিধাবিভক্ত। এই সমর্থন হয়তো তাঁর নিজস্ব ভোটব্যাংককে কিছুটা শক্ত করবে, কিন্তু তাঁর পুরো শাসনকালের হিসাব-নিকাশ বা ব্যর্থতাগুলোকে ঢেকে দিতে পারবে না।’
একইভাবে কিংস কলেজ লন্ডনের সিকিউরিটি স্টাডিজ বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ ট্রাম্পের এই সমর্থনকে রাজনৈতিক সংকটে থাকা নেতানিয়াহুর জন্য একটি ‘উপহার’ হিসেবে দেখছেন। তবে তিনিও মনে করেন এটি নির্বাচনের পাশা উল্টে দেওয়ার মতো কিছু নয়। ক্রিগের মতে, ‘নেতানিয়াহুর আসল সমস্যাগুলো অনেক গভীর—যেমন ডানপন্থী দলগুলোর বিভাজন, কট্টর অর্থোডক্স ভোটারদের অসন্তোষ এবং ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতার দাগ। ট্রাম্পের সমর্থনে হয়তো লিকুদ পার্টির কিছু অনিচ্ছুক ভোটার কেন্দ্রে আসতে পারেন, যা শক্ত লড়াইয়ের মাঠে দু-একটি আসন বেশি এনে দিতে পারে। কিন্তু এর মাধ্যমে নেতানিয়াহুর পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সম্ভব নয়।’
বিশ্লেষকদের ধারণা, ট্রাম্পের এই সমর্থন মূলত ইরান যুদ্ধের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আগামী নভেম্বরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই বা পরে ট্রাম্প হয়তো ইরানে আবার হামলা শুরু করতে চান। বেশ কয়েকটি মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটাররা ভোট দেওয়ার আগেই পেন্টাগন হয়তো নতুন করে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
নেতানিয়াহুকে সমর্থনের মাধ্যমে ট্রাম্প ইসরায়েলের সাথে কৌশলগত ঐক্য জোরদারের সংকেত দিলেন। সানাম ভাকিল মনে করেন, এর ফলে ভবিষ্যতে দুই দেশ যৌথ সামরিক অভিযানেও নামতে পারে। এর ফলে ট্রাম্পের পক্ষে যুদ্ধ থেকে দূরে থাকা বা ‘বাধ্য হয়ে যুদ্ধে জড়াতে হয়েছে’—এমন দাবি করা কঠিন হয়ে যাবে। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প নিজেই এখন এই সামরিক অভিযানের দায় নিচ্ছেন। তবে এই সমর্থনের অর্থ এই নয় যে তারা নতুন কোনো অভিযানে সম্মত হয়ে গেছেন, কিংবা যুদ্ধ শুরু করার পেছনে কার চাপ বেশি ছিল তা স্পষ্ট হয়ে গেছে।’
তিনি আরও জানান, তেহরান বিষয়টিকে এভাবে দেখবে যে মার্কিন ও ইসরায়েলি স্বার্থের মধ্যে আসলে কোনো পার্থক্য নেই। একই সাথে নেতানিয়াহু ছাড়া ইরানে হামলা চালানো কঠিন—ট্রাম্পের এমন ইঙ্গিত থেকে ইরান ধরে নিতে পারে যে ওয়াশিংটন নতুন আরেকটি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে খুব একটা আগ্রহী নয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্পষ্টভাষায় নেতানিয়াহুকে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে টেনে আনার জন্য দায়ী করেছেন। গতকাল সোমবার এক সাক্ষাৎকারে তিনি নেতানিয়াহুকে সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, তিনি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে নাক গলাতে চান না। সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, ‘আমি আমেরিকার প্রার্থীদের সমর্থন করি এবং আমার সমস্ত মনোযোগ এখন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিকে।’ ইসরায়েল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি তাঁর বিরোধিতা করছি না, আবার সমর্থনও দিচ্ছি না। আমি ইসরায়েলের নির্বাচনের বাইরেই থাকতে চাই।’

দৈনিক টার্গেট 



























