দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আবারও ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত হবে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে নির্ধারিত হবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদটির নতুন অধিকারী।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে এবার বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। কারণ, ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর এই প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ফলে দীর্ঘ সময় পর সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
১৯৯১ সালের পর এবারই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোট
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে আসার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। এরপর বেশ কয়েকবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থী এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন।
ফলে ভোটগ্রহণের প্রয়োজন পড়েনি। মনোনয়ন প্রক্রিয়া শেষে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাই ছিল স্বাভাবিক চিত্র।
কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। রাষ্ট্রপতি পদে দুইজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ায় সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। তাই বৃহস্পতিবারের নির্বাচনকে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দুই প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা
রাষ্ট্রপতি পদে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ক্ষমতাসীন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান অলি আহমদ।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। বর্তমান সরকারে তিনি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও রয়েছেন। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদে তাকে প্রার্থী করা হয়েছে।
অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী অলি আহমদ এলডিপির চেয়ারম্যান। তিনি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। যদিও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে জোটের পক্ষ থেকে শুরুতে কোনো প্রার্থী না দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল, পরে অলি আহমদের প্রার্থিতা সামনে আসে।
সামরিক জীবন থেকে রাজনীতিতে অলি আহমদ
অলি আহমদের রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে বিএনপিরও দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। একসময় তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে দলটির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজস্ব রাজনৈতিক দল গঠন করেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘বীর বিক্রম’ খেতাবপ্রাপ্ত একজন মুক্তিযোদ্ধা। সাবেক এই সামরিক কর্মকর্তা পরবর্তী সময়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে তিনি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতায় যুক্ত হন। এবার সেই জোটের সমর্থন নিয়েই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
কখন শুরু হবে ভোটগ্রহণ
নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ কার্যক্রম চলবে।
এই নির্বাচনে সংসদ সদস্যরাই ভোটার। মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন। তাদের ভোটের ফলাফলের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ জনগণের সরাসরি ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়ছে আগ্রহ
দীর্ঘ সময় পর রাষ্ট্রপতি পদে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হওয়ায় বৃহস্পতিবারের নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল রয়েছে। একদিকে ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থী, অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক জোটের প্রার্থী—দুই পক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
যদিও সংসদে ক্ষমতাসীন দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে নির্বাচনের ফলাফল কোন দিকে যেতে পারে, সে বিষয়ে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে নানা আলোচনা রয়েছে। তারপরও একাধিক প্রার্থী থাকায় এবার সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে যাচ্ছে।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই আয়োজন বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দৈনিক টার্গেট 




















