প্রাথমিক ফলাফলের কথা উল্লেখ করে ভুচিচ বলেন, ভোটাররা বিপুলভাবে শিক্ষার্থীদের সমর্থন দিয়েছেন। এতে দেশটির ২৫০ আসনের পার্লামেন্টে শিক্ষার্থীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বেলগ্রেডে নিজের দলের সদর দপ্তরে সমর্থকদের উদ্দেশে ভুচিচ বলেন, ‘এখনো চূড়ান্ত ফলাফল আমাদের হাতে আসেনি। তবে একটি নমুনার ভিত্তিতে, এটা স্পষ্ট যে আমরা এই নির্বাচনে হেরেছি। স্টুডেন্ট লিস্ট জিতেছে। তারা ১৩৫ থেকে ১৪০টি আসন পাবে, আর আমরা পাব ১০৫টি।’
জরিপ সংস্থা সেসিআইডি-আইপিএসপিএসের প্রতিনিধিত্বমূলক নমুনাভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, স্টুডেন্ট লিস্টের প্রার্থীদের তালিকা থেকে ১৩৮ জন আইনপ্রণেতা নির্বাচিত হতে পারেন। অন্যদিকে ভুচিচের ডানপন্থী সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি (এসএনএস) পেতে পারে ১০৪টি আসন। বাকি আসনগুলো জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর মধ্যে ভাগ হতে পারে বলে জানিয়েছে জরিপ সংস্থাটি।
ভুচিচের ১২ বছরের ক্ষমতার অবসান ঘটেছে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বেলগ্রেডসহ বিভিন্ন শহরে আনন্দ-উল্লাস শুরু হয়। রাজপথে অনেকে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে করমর্দন করেন, তাঁদের সঙ্গে হাত মেলান এবং আলিঙ্গন করেন। চলন্ত গাড়ির হর্নের শব্দেও মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ।
স্টুডেন্ট লিস্টের সদর দপ্তরে সমর্থকেরা ‘বিজয়, বিজয়’ স্লোগান দিতে থাকেন। উল্লাসের পাশাপাশি অনেকে কাঁদছিলেন, একে অপরকে আলিঙ্গন করছিলেন। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাদোমির সাইচিচ সেখানে বলেন, ‘প্রিয় সার্বিয়া, আজ রাতে জনগণের কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। আজ রাতে আমরা বিজয় উদ্যাপন করছি, আগামীকাল ভবিষ্যৎ গড়ব।’
রোববার ভোট গ্রহণের সময় রেকর্ডসংখ্যক ভোটার উপস্থিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর এই আনন্দ-উল্লাস দেখা যায়। দেশজুড়ে ভোটকেন্দ্রগুলোর বাইরে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছিল। কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট দিতে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও জরিপ সংস্থা সেসিআইডি এবং ইপসোস জানায়, ভোটার উপস্থিতি ছিল ৬৭ দশমিক ৬ শতাংশ। ১৯৯২ সালে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার পর এটিই সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি।
ভোটারদের এই ব্যাপক উপস্থিতি এবং নির্বাচনের আগে গত সপ্তাহে বেলগ্রেডে শিক্ষার্থীদের শেষ সমাবেশে আনুমানিক দেড় লাখ মানুষের অংশগ্রহণ—দুইয়ে মিলে বলকান অঞ্চলের দেশটিতে নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা করার মতো জনসমর্থন শিক্ষার্থীরা পেয়েছেন কি না, তা নিয়ে আগেই জল্পনা শুরু হয়েছিল।
নির্বাচনের আগে জনমত জরিপগুলোর ফলাফলে ব্যাপক তারতম্য দেখা যায়। বিশ্লেষকেরা বলেছিলেন, তৃণমূল পর্যায়ের ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ভুচিচের এসএনএসের লড়াইয়ে অনিশ্চয়তা ছিল অনেক বেশি।
বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ ১০ দিনের নির্বাচনী পর্বের অংশ হিসেবে এই নির্বাচনের ফলাফলের দিকে নজর ছিল আন্তর্জাতিক মহলের। এসব নির্বাচনে কর্তৃত্ববাদী ডানপন্থী শক্তির মুখোমুখি হচ্ছে গণতন্ত্রপন্থীরা। সার্বিয়ায় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের এই জয় ইউরোপের অন্যান্য দেশেও প্রভাব ফেলতে পারে। মহাদেশটির বিভিন্ন শহরে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে চলমান বিক্ষোভগুলো এতে আরও গতি পেতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদপ্রত্যাশী সার্বিয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের সূত্রপাত ২০২৪ সালের নভেম্বরে। সে সময় নোভি সাদ রেলস্টেশনে কংক্রিটের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হন। ওই দুর্ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা বিস্তৃত সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। বিভিন্ন প্রমাণে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, নিম্নমানের নির্মাণকাজ, জালিয়াতি ও দুর্নীতির কারণে ছাউনিটি ধসে পড়েছিল।
এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আন্দোলনকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেয় শিক্ষার্থীরা। ২৫০ আসনের পার্লামেন্টের জন্য তারা ২৫০ জন প্রার্থীর তালিকা ঘোষণা করে। তালিকায় ছিলেন শিক্ষাবিদ, ক্রীড়াবিদ ও কৃষকেরা। সার্বিয়ার অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ভোটারদের সমর্থন চায় তারা।
এই নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়েছে ভুচিচের এসএনএসের মতো সুসংগঠিত ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে। ক্ষমতাসীন দলটি প্রায় সব সম্প্রচারমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল। এ ছাড়া মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগও ছিল তাদের বিরুদ্ধে। ফলে শিক্ষার্থীদের জন্য লড়াইটি ছিল কঠিন।
রোববার ভোট দেওয়ার পরও একই বার্তা তুলে ধরেন স্টুডেন্ট লিস্টের প্রার্থী এবং ইউরোলিগ বাস্কেটবলের সভাপতি দেজান বোদিরোগা। বেলগ্রেডে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আজ সর্বোপরি সার্বিয়া স্বাধীনতার জন্য এবং ছিনিয়ে নেওয়া দেশটিকে ফিরিয়ে আনার জন্য লড়াই করছে। আজ সার্বিয়া ভোট দিচ্ছে—দেশ কোন পথে যাবে, ভবিষ্যতের দিকে, নাকি অতীতের দিকে।’
রোববারের ভোটের আগে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষকেরা আন্দোলনকর্মীদের আটক, তাঁদের ওপর নজরদারি এবং সাইবার হামলার বিভিন্ন প্রতিবেদন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
রোববার স্বাধীন নির্বাচন পর্যবেক্ষক গোষ্ঠীগুলো জানায়, ভোটারদের ওপর চাপ প্রয়োগের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ছিল ভোট দেওয়ার সময় ব্যালটের ছবি তোলার ঘটনা, ভোট কেনার চেষ্টা এবং একই ব্যক্তির একাধিকবার ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদের এক কেন্দ্র থেকে অন্য কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ।
নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা সিআরটিএর রাশা নেদেলকভ বলেন, ‘বিপুলসংখ্যক অনিয়মের ঘটনা নথিভুক্ত হওয়া অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে ভোটকেন্দ্রের বাইরে সহিংস ঘটনার সংখ্যাও ক্রমেই বাড়ছে।’

দৈনিক টার্গেট 


























