ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক

রাজনীতি

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাম্প্রতিক কমিটি গঠনকে ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে একযোগে ৪৫টি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে নতুন ও পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হলেও, এসব কমিটিতে অছাত্র, বিবাহিত ব্যক্তি, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক নেতাকর্মী এবং বিতর্কিত ব্যক্তিদের স্থান দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

দীর্ঘদিন পর কমিটি ঘোষণার কারণে নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসাহ তৈরি হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে বিভিন্ন জেলা ও মহানগরে শুরু হয়েছে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি অবস্থান। পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা অভিযোগ করছেন, রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ও নির্যাতনের শিকার ত্যাগী কর্মীদের বাদ দিয়ে সুবিধাবাদী ও নিষ্ক্রিয়দের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। এতে সংগঠনের অভ্যন্তরে অসন্তোষ চরম আকার ধারণ করেছে।

নতুন কমিটি ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি রাজপথেও প্রতিবাদ শুরু হয়। কোথাও ঝাড়ু মিছিল, কোথাও সড়ক অবরোধ, আবার কোথাও কেন্দ্রীয় নেতাদের কুশপুতুল দাহের মতো ঘটনাও ঘটেছে। অনেক পদবঞ্চিত নেতা ফেসবুক লাইভে নিজেদের বঞ্চনার কথা তুলে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। কেউ কেউ ছাত্রদলের রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন।

ঢাকার চারটি মহানগর ইউনিটের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়েও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পদবঞ্চিতদের বড় ধরনের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, টাকার বিনিময়ে পদ বণ্টন করা হয়েছে এবং ত্যাগী কর্মীদের বাদ দিয়ে নব্য ও অছাত্রদের কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে।

রাঙামাটিতে জেলা ছাত্রদলের কমিটি ঘিরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও সেনাবাহিনী লাঠিচার্জ করে এবং পরে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করতে বাধ্য হয়। একই ধরনের উত্তেজনা দেখা গেছে নোয়াখালী, কক্সবাজার, বরিশাল ও দিনাজপুরসহ বিভিন্ন জেলায়।

নোয়াখালীতে পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ করেন এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছিরকে জেলায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন। তাদের দাবি, কমিটিতে অধিকাংশ পদ পেয়েছেন বিবাহিত ও অনুগত ব্যক্তিরা।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ছাত্রদলের কমিটি নিয়েও বড় ধরনের অভিযোগ উঠেছে। পদবঞ্চিতদের দাবি, ঘোষিত কমিটির একাধিক সদস্য অতীতে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এতে দীর্ঘদিন ছাত্রদলের রাজনীতি করা নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা আরও বেড়েছে।

এদিকে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ভবিষ্যতের কাউন্সিল ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ বিবেচনায় রেখেই বিতর্কিত অনেককে কমিটিতে জায়গা দেওয়া হয়েছে। এতে সংগঠনের শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ড হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির দাবি করেছেন, সংশ্লিষ্ট এলাকার নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ এবং অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা বিবেচনা করেই কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, পদপ্রত্যাশীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় সবাইকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব হয়নি। আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও তিনি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনের আন্দোলন-সংগ্রামকে সামনে রেখে ছাত্রদলের সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর যে লক্ষ্য ছিল, অভ্যন্তরীণ এই কোন্দল তা দুর্বল করে দিতে পারে। দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া না গেলে মাঠের রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।