গণমাধ্যম–সচেতনতা বলতে শুধু সংবাদ পড়া ও এর ব্যবহার করার দক্ষতা বোঝায় না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে তথ্য বিশ্লেষণ, উৎস যাচাই, প্রচারিত বক্তব্যের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য অনুধাবন এবং প্রাপ্ত তথ্যের যথার্থতা বিচার করার সক্ষমতা। তবে তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব শুধু নাগরিকের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। গণমাধ্যমেরও রয়েছে পেশাগত নৈতিকতা ও জনস্বার্থ রক্ষার দায়। সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্যের সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ, সংবাদ ও মতামতের পার্থক্য বজায় রাখা এবং ভুল হলে তা স্বীকার করে সংশোধন করা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মৌলিক শর্ত। দ্রুততম সময়ে সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতা কিংবা পাঠক-দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণের প্রবণতা যেন বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন। গণমাধ্যমের গ্রহণযোগ্যতা শুধু তার প্রকাশের অধিকারে নয়, তথ্যের নির্ভুলতা ও পেশাগত সততার মধ্যেও নিহিত।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতার সম্পর্কটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতা ছাড়া গণমাধ্যম ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতি অনুসন্ধান করতে পারে না। জনস্বার্থে প্রশ্ন তোলা, ভিন্নমত প্রকাশ এবং কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য স্বাধীন সাংবাদিকতার বিকল্প নেই। অন্যদিকে, স্বাধীনতার অর্থ দায়িত্বহীনভাবে তথ্য প্রকাশের অধিকার নয়। অসত্য সংবাদ, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য কিংবা যাচাইহীন অভিযোগ ব্যক্তি ও সমাজের ক্ষতি করতে পারে। তাই গণমাধ্যমের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে পেশাগত নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও ন্যায়সংগত জবাবদিহির মাধ্যমে—এমন কোনো নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মাধ্যমে নয়, যা স্বাধীন মতপ্রকাশকে সংকুচিত করে। দায়বদ্ধতার নামে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ যেমন অনাকাঙ্ক্ষিত, তেমনি স্বাধীনতার অজুহাতে দায়িত্বহীনতাও গ্রহণযোগ্য নয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। রাজনৈতিক মতপার্থক্য, সামাজিক উত্তেজনা কিংবা সংবেদনশীল কোনো ঘটনার সময় যাচাইহীন তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। পুরোনো ছবি নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার, সম্পাদিত ভিডিওর মাধ্যমে ভুল ধারণা তৈরি করা কিংবা বিভ্রান্তিকর শিরোনামে কোনো বক্তব্য উপস্থাপন—এসবের প্রভাব ব্যক্তিগত পরিসর ছাড়িয়ে বৃহত্তর সমাজেও পড়তে পারে। অনেক সময় এসব তথ্যের ভিত্তিতে মানুষ অন্য ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে, এমনকি সংঘাতও তৈরি হতে পারে। তাই অপতথ্য মোকাবিলায় শুধু প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নাগরিকের সচেতনতা, সাংবাদিকতার পেশাগত সততা এবং তথ্য যাচাইয়ের সামাজিক সংস্কৃতি।
এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি তথ্যের স্বচ্ছতা, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার কার্যকর করা এবং সাংবাদিকদের নিরাপদে কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা দায়িত্বশীল তথ্যপরিসর গঠনের অপরিহার্য শর্ত। একই সঙ্গে অপতথ্য প্রতিরোধের নামে নানা বিধিনিষেধ আরোপ কিংবা সমালোচনামূলক কণ্ঠকে দমনের প্রবণতা রাখা যাবে না। কারণ, স্বাধীন গণমাধ্যম রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে তথ্যের সেতুবন্ধ তৈরি করে।
ইউনেসকোর বৈশ্বিক গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা সপ্তাহ আমাদের এই বাস্তবতা নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দেয়। তবে গণমাধ্যম সাক্ষরতা কোনো নির্দিষ্ট সপ্তাহের আনুষ্ঠানিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। এটি হওয়া উচিত নিয়মিত শিক্ষাচর্চা ও নাগরিক সংস্কৃতির অংশ। কারণ, তথ্যের জগতে সচেতনতা ছাড়া স্বাধীনতার যথার্থ ব্যবহার সম্ভব নয়। একইভাবে স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া নাগরিকের সামনে বহুমাত্রিক তথ্য ও মতামত তুলে ধরার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে। একটি ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে তাই স্বাধীন গণমাধ্যম, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এবং সচেতন নাগরিক—এই তিনটির মধ্যে সমন্বয় অপরিহার্য।
তাই এখনই প্রয়োজন অপতথ্যের বিরুদ্ধে সচেতন প্রতিরোধ গড়ে তোলা, স্বাধীন সাংবাদিকতার সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং তথ্য যাচাইকে নাগরিক অভ্যাসে পরিণত করা। রাষ্ট্রকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় আন্তরিক হতে হবে, সংবাদমাধ্যমকে পেশাগত সততা ও জবাবদিহির চর্চায় অবিচল থাকতে হবে, আর নাগরিককে হতে হবে তথ্য গ্রহণ ও প্রচারের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল।

দৈনিক টার্গেট 




















