প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার একটি বাসা থেকে উদ্ধার করা এক নারীর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্তের সময় সন্দেহ দেখা দেওয়ায় প্রয়োজনীয় নমুনা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। পরীক্ষায় শুক্রাণুর উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে একই মর্গে রাখা আরেক নারীর মরদেহের নমুনায় একাধিক পুরুষের শুক্রাণু পাওয়ার কথাও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
একজন মানুষের মৃত্যুর পর তাঁর দেহের সম্মান ও নিরাপত্তা রক্ষা করা পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব। হাসপাতালের মর্গে নারী মরদেহের সঙ্গে যৌনাচারের অভিযোগ তাই শুধু গুরুতর অপরাধের প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা, প্রশাসনিক তদারকি ও জবাবদিহিরও পরীক্ষা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধানকারীরা সংশ্লিষ্ট সময়ের মর্গের ভেতরের সিসিটিভি ফুটেজ পাননি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, ক্যামেরা অকার্যকর থাকায় ফুটেজ পাওয়া যায়নি। মর্গের বাইরের ক্যামেরার স্থিরচিত্র বিশ্লেষণ করে একজন মর্গ সহকারীর প্রবেশ ও বের হওয়ার তথ্য পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। হাসপাতালের প্রাথমিক অনুসন্ধানে ওই কর্মীকে সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
ক্যামেরা অকার্যকর থাকার বিষয়টি নিজেই গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। ক্যামেরা কখন নষ্ট হয়েছিল, কে এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন, ত্রুটির কথা কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল কি না এবং বিকল্প নজরদারির ব্যবস্থা কেন ছিল না—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
একটি মর্গে কোন মরদেহ কখন এসেছে, কে তা গ্রহণ করেছেন, কারা সংরক্ষণকক্ষে প্রবেশ করেছেন এবং কখন মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য বের করা হয়েছে—প্রতিটি ধাপের নির্ভরযোগ্য নথি থাকা জরুরি। সিসিটিভি, প্রবেশ-নিয়ন্ত্রণ, দায়িত্ব বণ্টন এবং মরদেহ হস্তান্তরের রেকর্ড পরস্পরের পরিপূরক। এগুলোর কোনোটি দুর্বল হলে অপরাধের তদন্ত কঠিন হয়।
মর্গের সাবেক ইনচার্জ যতন লাল ও মর্গ সহকারী শান্তকে ঘিরে অভিযোগের কথা এসেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, শান্তকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবং যতন লালকে অন্য প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা তদন্তেই নির্ধারিত হতে হবে। দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া বা বদলি করা অপরাধের প্রমাণ নয়; আবার প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়াই তদন্তের বিকল্প হতে পারে না।
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে এ ধরনের অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। ২০১৯ সালে একাধিক মৃত নারীর মরদেহের সঙ্গে যৌনাচারের অভিযোগে মর্গ সহকারী মুন্না ভগত গ্রেপ্তার হন। ২০২৩ সালে দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় তাঁকে এক বছর সাত মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়; ২৯৭ ধারার অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ওই ধারায় তিনি খালাস পান। মামলার এই ফলাফল অপরাধের প্রকৃতি, প্রযোজ্য আইনের ভাষা এবং আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণের মধ্যে সামঞ্জস্যের গুরুত্ব তুলে ধরে।
আগের ঘটনার পর মর্গের প্রবেশব্যবস্থা, সিসিটিভি, কর্মীদের তদারকি ও মরদেহের নিরাপত্তায় কী কী পরিবর্তন আনা হয়েছিল, তা জনসমক্ষে স্পষ্ট নয়। ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকলে সাম্প্রতিক অভিযোগের প্রেক্ষাপটে তার কার্যকারিতা পর্যালোচনা করা দরকার। আর কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়ে থাকলে কেন নেওয়া হয়নি, সেই ব্যর্থতার দায়ও নির্ধারণ করতে হবে। একজন অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া জরুরি, কিন্তু অপরাধের সুযোগ তৈরি করা ব্যবস্থাগত দুর্বলতা দূর করাও সমান জরুরি।
উদ্বেগটি শুধু একটি হাসপাতালের মর্গে সীমাবদ্ধ নয়। গত ৩০ আগস্ট নড়াইলের লোহাগড়ায় এক গৃহবধূর মরদেহের সঙ্গে যৌনাচারের চেষ্টার অভিযোগে অ্যাম্বুলেন্সচালক সাগর শেখকে আটক করার খবর প্রকাশ করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, থানায় নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে রাখা মরদেহটির সঙ্গে গভীর রাতে অনৈতিক কাজের চেষ্টা করার সময় মৃত নারীর মা চালককে দেখতে পান। পরে তাঁকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ২০২১ সালে এবং ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ২০২৫ সালে অনুরূপ অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।
এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের প্রয়োগ ও সীমাবদ্ধতা পর্যালোচনা করাও জরুরি। দণ্ডবিধির ২৯৭ ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বা মৃতদেহের প্রতি অবমাননাকর আচরণসহ সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিধান রয়েছে। ৩৭৭ ধারায় নির্দিষ্ট ধরনের যৌনাচারের শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে মৃতদেহের সঙ্গে যৌনাচারকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে তার তদন্ত, প্রমাণ ও শাস্তির সুস্পষ্ট বিধান থাকা প্রয়োজন কি না, তা আইনজ্ঞদের পর্যালোচনা করা জরুরি।
মুন্না ভগতের মামলায় ৩৭৭ ধারায় দণ্ড এবং ২৯৭ ধারায় খালাসের ঘটনা আইনের ভাষা ও অপরাধের প্রকৃতি নিয়ে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। প্রচলিত আইনে কোনো ঘটনার জন্য দায় নির্ধারণের সুযোগ থাকলে তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে; পাশাপাশি আইনি অস্পষ্টতা থাকলে তা দূর করতে হবে। মৃতদেহের সঙ্গে যৌনাচার, মরদেহের প্রতি অবমাননাকর আচরণ, অপরাধে সহায়তা এবং দায়িত্বে অবহেলার বিষয়গুলো কীভাবে আইনের আওতায় আসবে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
নারী মরদেহের ময়নাতদন্তে নারী কর্মী নিয়োগের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ২০২৬ সালের ১৩ জুলাই নারীর মরদেহের ময়নাতদন্তে নারী ডোম নিয়োগের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট দায়েরের খবর প্রকাশিত হয়। নারী কর্মীর অংশগ্রহণ মরদেহের মর্যাদা ও পরিবারের স্বস্তির প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে শুধু নারী কর্মী নিয়োগ করলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। প্রশিক্ষণ, উপযুক্ত অবকাঠামো, প্রবেশ-নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি এবং কার্যকর জবাবদিহি—সবকিছুর সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও হাসপাতাল প্রশাসনের দায়িত্ব তাই অভিযোগ ওঠার পর সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর মর্গের নিরাপত্তা নিয়ে পর্যালোচনা করা উচিত। কোথায় সিসিটিভি সচল, কোথায় প্রবেশ-নিয়ন্ত্রণ দুর্বল, কোথায় জনবল ও দায়িত্ব বণ্টনে সমস্যা রয়েছে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ এবং অগ্রগতি জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
মরদেহ গ্রহণ, সংরক্ষণ, ময়নাতদন্তের জন্য হস্তান্তর এবং পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিটি ধাপে লিখিত বা ডিজিটাল রেকর্ড রাখতে হবে। কে কখন প্রবেশ করেছেন, কোন কর্মী কোন দায়িত্বে ছিলেন এবং কোন মরদেহের দায়িত্ব কার কাছে ছিল, তা শনাক্ত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। সিসিটিভি ফুটেজ নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সংরক্ষণ এবং ক্যামেরা নষ্ট হলে দ্রুত মেরামতের বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
অভিযোগ উঠলে দ্রুত আলামত সংরক্ষণ, নিরপেক্ষ তদন্ত, সাক্ষীদের নিরাপত্তা এবং তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে যথাযথ তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি দিতে হবে। দায়িত্বে অবহেলা বা তদারকির ব্যর্থতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গ ঘিরে সাম্প্রতিক অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্ত ও আদালত নির্ধারণ করবেন। নড়াইলের ঘটনাটিও আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হতে হবে। কিন্তু তদন্তের অপেক্ষায় নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা পর্যালোচনা স্থগিত রাখা যায় না।
রাষ্ট্রের জবাবদিহি শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অপরাধের সুযোগ তৈরি করা, দুর্বলতা দূর করা, দায়িত্বে অবহেলার হিসাব নেওয়া, আইনের অস্পষ্টতা দূর করা এবং একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোও জবাবদিহির অংশ। মর্গে মরদেহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাই শুধু হাসপাতালের প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি মানবিক মর্যাদা, সামাজিক নৈতিকতা এবং রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার অপরিহার্য পরীক্ষা। জনগণ জানতে চায়—আগের ঘটনাগুলোর পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, কোথায় ব্যর্থতা ছিল এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে রাষ্ট্র কী করবে?

দৈনিক টার্গেট 






















