বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্বেষের রাজনীতি কেন

  • দৈনিক টার্গেট
  • প্রকাশ: ০৮:২১:২৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
  • ৫৪ বার পঠিত হয়েছে

‘শাহ জালালের বাংলায়, হিন্দু মৌলবাদীদের ঠাঁই নাই’—এ ধরনের স্লোগান শুধু আপত্তিকর নয়, সমান নাগরিকত্বের ধারণারও পরিপন্থী। হজরত শাহ জালাল (রহ.) বাংলার ইতিহাস ও সুফি ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। কিন্তু কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের নাম ব্যবহার করে ধর্মের দোহাই দিয়ে আধুনিক রাষ্ট্রে কারা বসবাসের অধিকার পাবে, তা নির্ধারণের দাবি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। বাংলাদেশ কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের একক সম্পত্তি নয়। জাতি, ধর্ম, বর্ণনির্বিশেষে এ দেশ সবার। ‘হিন্দু মৌলবাদ’ কিংবা যেকোনো ধর্মের উগ্রবাদ নিয়ে সমালোচনা অবশ্যই হতে পারে। ধর্মের নামে সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা ও অন্যের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো জরুরি। মন্দির প্রাঙ্গণে গরু জবাই কি উগ্রতা নয়? কোনো ব্যক্তির উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের সমালোচনা আর একটি গোটা ধর্মীয় সম্প্রদায়কে কটাক্ষ করা এক কথা নয়।

অপরাধের দায় অপরাধীর। সেই দায় একটি ধর্মের সব অনুসারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়বিচার নয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সংবিধানের সাম্য ও ধর্মীয় স্বাধীনতার নীতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় নাগরিকের অধিকার সংখ্যাগরিষ্ঠের দয়ার দান নয়। রাষ্ট্রের আইনি সুরক্ষায় তা প্রতিষ্ঠিত থাকার কথা। সংখ্যাগরিষ্ঠতা গণতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছাই ন্যায়বিচারের একমাত্র মানদণ্ড নয়। গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষায়।

উপনিষদীয় ঐতিহ্যে আত্মসংযম, আত্মজিজ্ঞাসা ও নৈতিক শৃঙ্খলার গুরুত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত। বৃহদারণ্যক উপনিষদের বিখ্যাত ‘দ’ উপদেশে দমন, দান ও দয়ার যে শিক্ষা আলোচিত হয়েছে, তার একটি তাৎপর্য হলো মানুষের জ্ঞান তখনই অর্থবহ হয়, যখন সে নিজের লোভ, ক্রোধ ও অহংকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। ইসলামে সংযম ও ন্যায়বিচার, বৌদ্ধ দর্শনে দ্বেষ পরিহার, খ্রিষ্টীয় নীতিতে প্রতিবেশীর প্রতি ভালোবাসা বিভিন্ন ঐতিহ্যেই আত্মশুদ্ধি ও মানবিকতার শিক্ষা রয়েছে। বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মহাকাশ গবেষণা, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জলবায়ু প্রযুক্তিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হিন্দু-মুসলিম সংঘাত নিয়ে গবেষণা হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা কোনো একটি ক্যাম্পাসের সীমানায় আটকে নেই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি যুক্তিবাদী, আত্মসংযমী ও মানবিক নাগরিক তৈরি করছে, নাকি পরিচয়ের অহংকারে অন্যকে ছোট করার প্রবণতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে? বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ শিক্ষিত হওয়ার পরিচয় দিতে পারে কিন্তু বিবেকবান হওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। সেই পরিচয় প্রমাণ করতে হয় আচরণে ভিন্নমতকে সম্মান করে, ক্ষমতার ব্যবহার সংযত রেখে এবং অন্যের অধিকার রক্ষার আন্তরিকতায়।

বাংলাদেশে ধর্মীয় পরিচয় কাউকে শ্রেষ্ঠ নাগরিক করে না, রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্যপদ কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে তোলে না আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়া কাউকে জবাবদিহির বাইরে রাখে না। এই সত্য প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হলে ডিগ্রির সংখ্যা বাড়বে, কিন্তু শিক্ষার মর্যাদা বাড়বে না। কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলা যায়,

‘ভিতরের দিকে যত মরিয়াছি, বাহিরের দিকে তত গুনতিতে মোড়া বাড়িয়া চলেছি গোরু ছাগলের মতো!’

আমরা কি এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় নাগরিককে বিভক্ত করবে? আমরা কি এমন বিশ্ববিদ্যালয় চাই, যেখানে স্লোগানের উচ্চতা যুক্তির গভীরতাকে ছাপিয়ে যাবে? এই পরীক্ষায় শুধু শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষক, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্রকেও উত্তীর্ণ হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্বেষের যে বীজ আজ বপন করা হবে, আগামী দিনের সমাজে তার বিষফল ভোগ করতে হবে আমাদের সবাইকে।

জীবনযাত্রার ব্যয়ে নাভিশ্বাস, উত্তাল ইউরোপ

জীবনযাত্রার ব্যয়ে নাভিশ্বাস, উত্তাল ইউরোপ

ইউরোপজুড়ে ক্ষোভ বাড়ছে। আকাশছোঁয়া বাড়িভাড়া, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতিতে নাভিশ্বাস উঠছে মানুষের। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কার্যত থমকে আছে। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন ও গ্রিসে ঋণ পরিশোধে সুদের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 উদীচীর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী: সংগ্রাম শুরু মুক্তির

উদীচীর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী: সংগ্রাম শুরু মুক্তির

আজ ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ৫৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৬৮ সালের এই দিনে মেহনতি মানুষের সার্বিক মুক্তির স্বপ্ন বুকে নিয়ে শিল্পী-সাহিত্যিক-সংগ্রামী সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, শহীদুল্লাহ কায়সার প্রমুখের নেতৃত্বে যাত্রা শুরু করেছিল উদীচী।

কলেজ সরকারীকরণের দুঃসহ পরিণাম

কলেজ সরকারীকরণের দুঃসহ পরিণাম

কলেজ কিংবা মাধ্যমিক স্কুল সরকারীকরণের খবরে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কেবল শিক্ষক-কর্মচারী নন; তাঁদের সঙ্গে শিক্ষার্থী, অভিভাবক তথা এলাকাবাসীরও মনে খুব আনন্দ। সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীর পরিবারের অন্য সদস্যদের মনেও বড় স্বস্তি ভবিষ্যতের কথা ভেবে। কিন্তু বাস্তবে? ঘোষণার ১০ বছর পরও গ্যাঁড়াকলে পড়ে সরকা

জনপ্রিয় টার্গেট

বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্বেষের রাজনীতি কেন

প্রকাশ: ০৮:২১:২৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

‘শাহ জালালের বাংলায়, হিন্দু মৌলবাদীদের ঠাঁই নাই’—এ ধরনের স্লোগান শুধু আপত্তিকর নয়, সমান নাগরিকত্বের ধারণারও পরিপন্থী। হজরত শাহ জালাল (রহ.) বাংলার ইতিহাস ও সুফি ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। কিন্তু কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের নাম ব্যবহার করে ধর্মের দোহাই দিয়ে আধুনিক রাষ্ট্রে কারা বসবাসের অধিকার পাবে, তা নির্ধারণের দাবি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। বাংলাদেশ কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের একক সম্পত্তি নয়। জাতি, ধর্ম, বর্ণনির্বিশেষে এ দেশ সবার। ‘হিন্দু মৌলবাদ’ কিংবা যেকোনো ধর্মের উগ্রবাদ নিয়ে সমালোচনা অবশ্যই হতে পারে। ধর্মের নামে সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা ও অন্যের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো জরুরি। মন্দির প্রাঙ্গণে গরু জবাই কি উগ্রতা নয়? কোনো ব্যক্তির উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের সমালোচনা আর একটি গোটা ধর্মীয় সম্প্রদায়কে কটাক্ষ করা এক কথা নয়।

অপরাধের দায় অপরাধীর। সেই দায় একটি ধর্মের সব অনুসারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়বিচার নয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সংবিধানের সাম্য ও ধর্মীয় স্বাধীনতার নীতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় নাগরিকের অধিকার সংখ্যাগরিষ্ঠের দয়ার দান নয়। রাষ্ট্রের আইনি সুরক্ষায় তা প্রতিষ্ঠিত থাকার কথা। সংখ্যাগরিষ্ঠতা গণতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছাই ন্যায়বিচারের একমাত্র মানদণ্ড নয়। গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষায়।

উপনিষদীয় ঐতিহ্যে আত্মসংযম, আত্মজিজ্ঞাসা ও নৈতিক শৃঙ্খলার গুরুত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত। বৃহদারণ্যক উপনিষদের বিখ্যাত ‘দ’ উপদেশে দমন, দান ও দয়ার যে শিক্ষা আলোচিত হয়েছে, তার একটি তাৎপর্য হলো মানুষের জ্ঞান তখনই অর্থবহ হয়, যখন সে নিজের লোভ, ক্রোধ ও অহংকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। ইসলামে সংযম ও ন্যায়বিচার, বৌদ্ধ দর্শনে দ্বেষ পরিহার, খ্রিষ্টীয় নীতিতে প্রতিবেশীর প্রতি ভালোবাসা বিভিন্ন ঐতিহ্যেই আত্মশুদ্ধি ও মানবিকতার শিক্ষা রয়েছে। বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মহাকাশ গবেষণা, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জলবায়ু প্রযুক্তিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হিন্দু-মুসলিম সংঘাত নিয়ে গবেষণা হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা কোনো একটি ক্যাম্পাসের সীমানায় আটকে নেই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি যুক্তিবাদী, আত্মসংযমী ও মানবিক নাগরিক তৈরি করছে, নাকি পরিচয়ের অহংকারে অন্যকে ছোট করার প্রবণতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে? বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ শিক্ষিত হওয়ার পরিচয় দিতে পারে কিন্তু বিবেকবান হওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। সেই পরিচয় প্রমাণ করতে হয় আচরণে ভিন্নমতকে সম্মান করে, ক্ষমতার ব্যবহার সংযত রেখে এবং অন্যের অধিকার রক্ষার আন্তরিকতায়।

বাংলাদেশে ধর্মীয় পরিচয় কাউকে শ্রেষ্ঠ নাগরিক করে না, রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্যপদ কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে তোলে না আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়া কাউকে জবাবদিহির বাইরে রাখে না। এই সত্য প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হলে ডিগ্রির সংখ্যা বাড়বে, কিন্তু শিক্ষার মর্যাদা বাড়বে না। কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলা যায়,

‘ভিতরের দিকে যত মরিয়াছি, বাহিরের দিকে তত গুনতিতে মোড়া বাড়িয়া চলেছি গোরু ছাগলের মতো!’

আমরা কি এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় নাগরিককে বিভক্ত করবে? আমরা কি এমন বিশ্ববিদ্যালয় চাই, যেখানে স্লোগানের উচ্চতা যুক্তির গভীরতাকে ছাপিয়ে যাবে? এই পরীক্ষায় শুধু শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষক, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্রকেও উত্তীর্ণ হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্বেষের যে বীজ আজ বপন করা হবে, আগামী দিনের সমাজে তার বিষফল ভোগ করতে হবে আমাদের সবাইকে।

জীবনযাত্রার ব্যয়ে নাভিশ্বাস, উত্তাল ইউরোপ

জীবনযাত্রার ব্যয়ে নাভিশ্বাস, উত্তাল ইউরোপ

ইউরোপজুড়ে ক্ষোভ বাড়ছে। আকাশছোঁয়া বাড়িভাড়া, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতিতে নাভিশ্বাস উঠছে মানুষের। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কার্যত থমকে আছে। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন ও গ্রিসে ঋণ পরিশোধে সুদের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 উদীচীর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী: সংগ্রাম শুরু মুক্তির

উদীচীর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী: সংগ্রাম শুরু মুক্তির

আজ ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ৫৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৬৮ সালের এই দিনে মেহনতি মানুষের সার্বিক মুক্তির স্বপ্ন বুকে নিয়ে শিল্পী-সাহিত্যিক-সংগ্রামী সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, শহীদুল্লাহ কায়সার প্রমুখের নেতৃত্বে যাত্রা শুরু করেছিল উদীচী।

কলেজ সরকারীকরণের দুঃসহ পরিণাম

কলেজ সরকারীকরণের দুঃসহ পরিণাম

কলেজ কিংবা মাধ্যমিক স্কুল সরকারীকরণের খবরে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কেবল শিক্ষক-কর্মচারী নন; তাঁদের সঙ্গে শিক্ষার্থী, অভিভাবক তথা এলাকাবাসীরও মনে খুব আনন্দ। সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীর পরিবারের অন্য সদস্যদের মনেও বড় স্বস্তি ভবিষ্যতের কথা ভেবে। কিন্তু বাস্তবে? ঘোষণার ১০ বছর পরও গ্যাঁড়াকলে পড়ে সরকা