আমরা শহর থেকে অনেকটা ভেতরে দুই ধারে গাছপালাবেষ্টিত সরু রাস্তা পার হয়ে কান্তজিউ মন্দির প্রাঙ্গণে এসে উপস্থিত হলাম। নিজেদের ভেতরে অদ্ভুত একটা প্রশান্তি অনুভব করলাম। কান্তনগর নামে পরিচিতি এই এলাকার কোল ঘেঁষে বয়ে গেছে নদী, গাছপালা, সাঁওতাল আর শহুরে মানুষের মিশ্রণে এখানে গড়ে উঠেছে ভিন্নমাত্রার পরিবেশ। কথা হচ্ছিল ওই এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি মলয় সাহার সঙ্গে। তিনি বললেন, মন্দিরের নির্মাণকাজ শুরু করেন মহারাজ প্রাণনাথ রায়, ১৭০৪ সালে; যদিও নির্মাণকাজ শেষ করেন তাঁর পোষ্য পুত্র রামনাথ রায়। টানা ৪৮ বছর কাজ করে চলার পর ১৭৫২ সালে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। শুরুতে মন্দিরের চূড়ার উচ্চতা ছিল ৭০ ফুট। ১৭৫২ সালে মন্দিরটি উৎসর্গ করা হয়। ১৮৯৭ সালে মন্দিরটি ভূমিকম্পের কবলে পড়লে এর চূড়াগুলো ভেঙে যায়। মহারাজা গিরিজানাথ পরে এর ব্যাপক সংস্কার করেন।
পাথরের ভিত্তির ওপর ৫০ ফুট উচ্চতার বর্গাকার এই মন্দিরের নিচতলায় ২১টি, দ্বিতীয় তলায় ২৭টি এবং তৃতীয় তলায় তিনটি দরজা-খিলান রয়েছে। তবে কান্তজিউ মন্দিরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর গায়ে থাকা অপরূপ টেরাকোটার কাজ। পুরো মন্দিরে ১৫ হাজারের মতো পোড়ামাটির ফলক রয়েছে, যেগুলোর একটির সঙ্গে অন্যটির মিল নেই। রামায়ণ, মহাভারত, পৌরাণিক কাহিনি এবং মধ্যযুগের বাংলার সামাজিক জীবনের নানা চিত্র এসব ফলকে নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। চার দেয়ালের এই টেরাকোটাশিল্প দেখে মনে হয়, এটি যেন চার খণ্ডে শিল্পখচিত এক পৌরাণিক মহাকাব্য। স্থাপত্যশৈলী ও শিল্পচাতুর্যের এমন নয়নাভিরাম নিদর্শন বাংলাদেশে দ্বিতীয়টি নেই।
সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি—চারটি শাস্ত্রীয় যুগের পৌরাণিক কাহিনিগুলো মন্দিরের চার দেয়ালে চিত্রায়িত। তাই বৈদিক চিত্রকাহিনি-সংবলিত টেরাকোটায় আচ্ছাদিত মন্দিরটি দেখলে মনে হবে, এ যেন চার খণ্ডে শিল্পখচিত এক পৌরাণিক মহাকাব্যের দৃশ্যমান উপস্থাপনা। এই মন্দিরের টেরাকোটা আপনাকে কখনো নিয়ে যাবে মধ্যযুগীয় বাংলায়, আবার কখনো উপস্থাপন করবে পৌরাণিক কাহিনি।
একটা স্থাপত্য আপনার ভেতরে কতখানি প্রভাব ফেলতে পারে, তা কান্তজিউ মন্দিরে না গেলে ধারণা করা যাবে না। স্থাপত্যরীতি, গঠনবিন্যাস, শিল্পচাতুর্য মন্দিরটির সামগ্রিক দৃশ্যকে মাধুর্যমণ্ডিত করে তুলেছে। কোনো ছুটিতে যদি উত্তরবঙ্গে যাওয়ার পরিকল্পনা করে থাকেন, তবে কান্তজিউ মন্দিরটা দেখে ফেলুন। যতটা সময় আপনি এই মন্দিরে কাটাবেন, তা নিতান্ত বৃথা যাবে না।
দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে বাসে এসে নামতে হবে দিনাজপুরের কালীতলা বাসস্ট্যান্ডে। সেখান থেকে লোকাল বাস, অটোরিকশা বা ইজিবাইকে চড়ে সরাসরি পৌঁছানো যাবে কান্তজিউ মন্দিরে। আর ট্রেনে এলে দিনাজপুর স্টেশনে নামার পর অটো বা ইজিবাইক রিজার্ভ করেও সরাসরি চলে যাওয়া যাবে মন্দির চত্বরে। উত্তরবঙ্গে যেকোনো ছুটিতে পরিবারসহ ঘুরে আসতে পারেন ঐতিহাসিক এই প্রাঙ্গণ।

দৈনিক টার্গেট 


























