প্রশ্ন হলো, যে নগরায়ণ মানুষের জীবনকে সহজ করার কথা, সেই নগরায়ণই কেন মানুষের জীবনকে প্রতিনিয়ত কঠিন করে তুলছে?
অপরিকল্পিত নগরায়ণের সবচেয়ে দৃশ্যমান ক্ষতি হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশের বিপর্যয়। ঢাকার জলাশয়, খাল, নিম্নাঞ্চল ও সবুজ অঞ্চল একের পর এক আবাসন ও অবকাঠামো নির্মাণের চাপে সংকুচিত হয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ঢাকা শহরের সবুজ এলাকা ও ফাঁকা জায়গার পরিমাণ ছিল ৫৩ দশমিক ১১ বর্গকিলোমিটার। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ২৯ দশমিক ৮৫ বর্গকিলোমিটারে।
বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক দশকে ঢাকা শহরের গাছপালায় আচ্ছাদিত এলাকা ৩১ শতাংশ এবং জলাশয় ৪৭ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে নির্মাণ এলাকা বেড়েছে ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রকৃতির জায়গা দখল করে নিয়েছে কংক্রিটের বিস্তার।
ঢাকার জলাবদ্ধতা নগর পরিকল্পনার দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার প্রতিফলন। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক খাল ও জলাধার দখল হয়ে যাওয়ায় পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অপর্যাপ্ত ড্রেনেজব্যবস্থা, বর্জ্যে নালা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। একই সংকটের মুখোমুখি চট্টগ্রামও। পাহাড় কাটা, পাহাড়ের পাদদেশে অপরিকল্পিত বসতি, খাল দখল এবং অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা শহরটিকে জলাবদ্ধতা ও ভূমিধসের ঝুঁকিতে পরিণত করেছে। সিলেটের প্রাকৃতিক ছড়া, জলাভূমি ও নিম্নাঞ্চলে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ নগরের পানি নিষ্কাশন ও বন্যা ব্যবস্থাপনাকে জটিল করে তুলছে।
অপরিকল্পিত নগরায়ণের আরেকটি ভয়াবহ কারণ বায়ুদূষণ। অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, নির্মাণসামগ্রীর ধুলা, যানবাহন ও শিল্পকারখানার কালো ধোঁয়া এবং বর্জ্য অব্যবস্থাপনার কারণে সব নগরী দূষিত হয়ে পড়েছে।
অপরিকল্পিত নগরায়ণের আর এক বড় সমস্যা যানজট। ঢাকায় জনসংখ্যা ও যানবাহনের সংখ্যা বাড়া এর অন্যতম কারণ। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-এর এক প্রতিবেদন মতে, ঢাকায় যানজটের কারণে প্রতিদিন প্রায় ৮২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এর আর্থিক মূল্য দৈনিক প্রায় ১৩৯ কোটি টাকা এবং বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি। একই প্রতিবেদন মতে, ২০০৭ সালে ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার, যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটারে।
বাংলাদেশের অন্যান্য শহরেও অপরিকল্পিত নগরায়ণের প্রভাব স্পষ্ট। খুলনায় জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ এবং নগর বর্জ্যব্যবস্থাপনা বড় চ্যালেঞ্জ। রাজশাহীতে তাপপ্রবাহ ও সবুজ অঞ্চল সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। বরিশালে জলাভূমি ও প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার ওপর নগর সম্প্রসারণের চাপ বাড়ছে। অর্থাৎ শহরভেদে সমস্যার ধরন আলাদা হলেও সংকটের মূল জায়গায় রয়েছে অপর্যাপ্ত পরিকল্পনা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় অবহেলা।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবভিত্তিক নগর পরিকল্পনা। রাজধানীসহ প্রতিটি শহরে মহাপরিকল্পনা এবং বিস্তারিত অঞ্চল পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। জলাধার, খাল, নদী, কৃষিজমি ও সবুজ অঞ্চল দখলের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। শুধু নতুন সড়ক কিংবা উড়ালসড়ক নির্মাণ নয়, গণপরিবহন, ফুটপাত, সাইকেল চলাচলের পথ এবং সমন্বিত পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
পাশাপাশি নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি শহরের জন্য বর্জ্যব্যবস্থাপনা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নও বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর করতে হবে।
সুতরাং বাংলাদেশের প্রয়োজন শুধু আরও বেশি শহর নির্মাণ নয়, প্রয়োজন বাসযোগ্য শহর গড়ে তোলা। উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় প্রকৃতিকে পরাজিত করে নয়, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান নিশ্চিত করেই নগর সভ্যতাকে এগিয়ে নিতে হবে। অন্যথায় একদিন হয়তো আমাদের শহরগুলো ভবনে পরিপূর্ণ হবে, কিন্তু মানুষের বসবাসের উপযোগিতা হারিয়ে ফেলবে। তখন প্রশ্ন উঠবে, আমরা কি সত্যিই শহর গড়েছি, নাকি নিজেদের বসবাসের পরিবেশটুকুই ধ্বংস করেছি?

দৈনিক টার্গেট 


















