বড় শক্তিগুলোর আগ্রহ বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগ, একই সঙ্গে ফাঁদ। ফাঁদটা হলো, দুর্বল দর-কষাকষির অবস্থানে গিয়ে আমরা ‘ভাড়াটে ভূগোল’ হয়ে যেতে পারি, যেখানে বন্দর, রাস্তা কিংবা জমি বিভিন্ন শক্তিকে দেওয়া হয় একটা তাৎক্ষণিক ঋণ বা প্রকল্পের বিনিময়ে। সুবিধা মেলে এক দিনে, দায় থেকে যায় দশকের পর দশক।
এর বিপরীত পথটা হলো ভূগোলকে ‘বাজারে’ রূপ দেওয়া। বাজার মানে যেকোনো শক্তির বিনিয়োগ আমাদের নিজস্ব শর্তে, প্রকাশ্য প্রতিযোগিতায় এবং স্পষ্ট চুক্তিতে আসবে। যেমন বে টার্মিনাল ও লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের মতো প্রকল্পে পাবলিক-প্রাইভেট মডেলে দুটি কনটেইনার টার্মিনাল ও একটি বহুমুখী টার্মিনাল হবে, যেগুলো আনুমানিক ১২ মিটার ড্রাফট ও ৫ থেকে ৬ হাজার টিইইউ ধারণক্ষমতার জাহাজ সামলাতে পারবে। এখানে আসল প্রশ্ন প্রযুক্তি নয়, চুক্তির স্বচ্ছতা: কে অপারেটর হবে, কত বছরের জন্য, কী কার্যকারিতা-শর্তে, কেউ ব্যর্থ হলে কী হবে। একাধিক অপারেটর, একাধিক দেশ, একাধিক টার্মিনাল থাকলে কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরতা তৈরি হয় না। আর সবচেয়ে বড় কথা, দাবার বোর্ডে ঘুঁটি নয়, খেলোয়াড় থাকতে হলে আগে নিজের ঘর গোছাতে হবে।
সমুদ্র-অর্থনীতির জন্য মানুষ গড়তে হবে। ব্লু ইকোনমি নিয়ে আমাদের বিশ্লেষণ বহু বছর ধরেই ফিরে ফিরে একটি ঘাটতির কথা বলছে—সমুদ্রসম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণের জন্য দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তির অভাব। সমুদ্রবিজ্ঞান, জাহাজ প্রকৌশল, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও লজিস্টিকসে বিশেষায়িত শিক্ষা না থাকলে গভীর সমুদ্রের সম্পদও অন্যের হাতে যাবে।
ইতিহাস আমাদের শেখায়, ভূগোল কোনো রাষ্ট্রকে ধনী করে না, রাষ্ট্রই ভূগোলকে কাজে লাগানোর সক্ষমতা অর্জন করে। সিঙ্গাপুরের কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল না, ছিল একটি ভালো প্রশাসন আর একটি সময়ানুবর্তী বন্দর। আমাদের ভূগোল তার চেয়ে ঢের বেশি উপহার দিয়েছে: একটি বিশাল উপসাগরের শীর্ষবিন্দু, বিশাল যুবশক্তি, বিস্তৃত নদীজাল আর প্রতিবেশী বাজার। কিন্তু উপহার পাওয়া আর সেটি ব্যবহার করা এক জিনিস নয়।

দৈনিক টার্গেট 



























