এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। টিআইএন হলো করদাতাকে শনাক্ত করার নম্বর, আর আয়কর হলো করযোগ্য আয়ের ওপর আরোপিত কর। কারও টিআইএন থাকলেও করমুক্ত সীমা ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় তাঁর প্রদেয় কর শূন্য হতে পারে। আবার করযোগ্য আয় না থাকলেও আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। তাই টিআইএন নেওয়ার পর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা আছে কি না, তা জেনে নেওয়া দরকার।
ফ্রিল্যান্সাররা নিজেদের দক্ষতা ও পেশাগত সেবা দিয়ে আয় করেন। তাই শুরু থেকে আয়-ব্যয়ের সঠিক রেকর্ড রাখা গুরুত্বপূর্ণ। সংরক্ষণযোগ্য নথির মধ্যে রয়েছে—ক্লায়েন্টের সঙ্গে চুক্তি বা কাজের রেকর্ড, ইনভয়েস ও পেমেন্টের রেকর্ড, ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের তথ্য এবং পেশাগত খরচের বিল ও রসিদ।
বিদেশি ক্লায়েন্টের কাছ থেকে অর্থ নিলে অর্থের উৎস, কাজের প্রকৃতি ও অর্থ গ্রহণের রেকর্ডও যথাযথভাবে রাখতে হবে। ব্যক্তিগত ও পেশাগত লেনদেন আলাদা রাখলে বছর শেষে হিসাব ও রিটার্ন তৈরি সহজ হয়। কোনো আয় করমুক্ত কি না বা বিশেষ সুবিধা প্রযোজ্য কি না, তা সংশ্লিষ্ট সময়ে কার্যকর আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
শুধু মোট আয়ের ভিত্তিতে কর নির্ধারণ হয় না। আয়ের প্রকৃতি, করমুক্ত সীমা, অনুমোদিত ব্যয়, কর রেয়াত, উৎসে কর্তিত কর এবং প্রযোজ্য আইন বিবেচনা করে করযোগ্য আয় ও প্রদেয় কর ঠিক করা হয়। যথাযথ নথি না থাকলে কোনো
ব্যয়ের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে পরে প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই আয় ও প্রাসঙ্গিক ব্যয়, উভয়ের প্রমাণ সংরক্ষণ করা উচিত।
উৎসে কর: অনেক ক্ষেত্রে ফ্রিল্যান্সার বা উদ্যোক্তার আয় থেকে উৎসে কর কর্তন হতে পারে। রিটার্ন প্রস্তুতের সময় এই কর্তিত করের তথ্য উপস্থাপন ও সমন্বয় করতে হয়। তাই কোনো প্রতিষ্ঠান বা ক্লায়েন্ট কর কেটে রাখলে তার প্রমাণপত্র সংগ্রহ করে রাখুন।
আয়কর রিটার্ন হলো নির্দিষ্ট করবর্ষে করদাতার আয়, ব্যয়, সম্পদ, দায় ও প্রযোজ্য করসংক্রান্ত তথ্য আয়কর কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিলের প্রক্রিয়া। এটি শুধু কর পরিশোধের মাধ্যম নয়, করদাতার আর্থিক অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক নথিও। যাঁদের আইন অনুযায়ী রিটার্ন দিতে হয়, তাঁদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তা দাখিল করা উচিত।
কর আসে না, তাই রিটার্ন দেব না’, এ ধারণা সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। প্রদেয় কর শূন্য হলেও আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। তাই শুধু কর দিতে হবে কি না তা জানাই যথেষ্ট নয়, রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা আছে কি না সেটিও নিশ্চিত হতে হবে।
ফ্রিল্যান্সিং, তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতকে উৎসাহিত করতে সরকার সময়ে সময়ে কর সুবিধা বা অব্যাহতি দিয়ে থাকে। তবে কোনো আয় এসব সুবিধার আওতায় পড়ে কি না, তা আইন ও বিধান অনুযায়ী যাচাই করতে হবে। কোনো আয়কে ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন ব্যবসা বা প্রযুক্তি খাতের আয় বললেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে করমুক্ত হয়ে যায় না। আয়ের প্রকৃতি, সেবার ধরন ও সংশ্লিষ্ট সময়ের আইন বিবেচনা করেই তা নির্ধারণ করতে হবে।
রিটার্নের আগে সারা বছরের আয়, ব্যয়, সম্পদ ও দায়ের তথ্য গুছিয়ে রাখুন। ফ্রিল্যান্সার: ক্লায়েন্টের কাছ থেকে পাওয়া অর্থের রেকর্ড, ইনভয়েস, চুক্তিপত্র, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের রেকর্ড ও পেশাগত খরচের প্রমাণপত্র।
উদ্যোক্তা: ক্রয়-বিক্রয়ের হিসাব, চালান,ব্যবসায়িক খরচের বিল ও ভাউচার, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য এবং বেতনসহ অন্যান্য ব্যয়ের রেকর্ড। উভয়ের ক্ষেত্রে: জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি, বিনিয়োগ, ঋণসহ সম্পদ ও দায়ের তথ্য এবংউৎসে কর কর্তনের প্রমাণপত্র।
আয় শুরুর দিন থেকেই হিসাব রাখার অভ্যাস করুন। প্রতি মাসে আয়-ব্যয় লিখে রাখুন, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ইনভয়েস, বিল, ভাউচার ও রসিদ সংরক্ষণ করুন এবং অনলাইন লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ডও যত্ন করে রাখুন।
ফ্রিল্যান্সিং বা উদ্যোক্তা হিসেবে সাফল্য শুধু কত টাকা আয় করছেন তার ওপর নির্ভর করে না। সেই আয় কতটা সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ ও আইনসম্মতভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
হাসানুর রহমান, অ্যাডভোকেট ও আয়কর আইনজীবী, ঢাকা

দৈনিক টার্গেট 

























