তুমি ঠিক শুনেছ। গভীরে যাওয়ার আগে কিছু কথা শোনো। তুমি, তোমার হাত, টেবিল—সবই পরমাণু দিয়ে তৈরি। আর পরমাণুর ভেতরটা প্রায় পুরোটাই ফাঁকা। জানি, তোমার মনটা এখনই প্রমাণের জন্য উসখুস করছে।
পুরোটা ভালোমতো বোঝাতে একটু পেছন ফিরে তাকাতে হবে। ১৯০৯ সাল। স্থান ম্যানচেস্টার। রাদারফোর্ডের তত্ত্বাবধানে তরুণ ছাত্র আর্নেস্ট মার্সডেন সোনার অতি পাতলা পাতের দিকে আলফা কণা ছুড়তে লাগলেন। আলফা কণা হচ্ছে হিলিয়ামের নিউক্লিয়াস। হিলিয়াম (He) পরমাণুতে দুটি ইলেকট্রন থাকে। এই ইলেকট্রন দুটি ছিনিয়ে নিলে যা থাকে, তা হলো আলফা কণা। পরীক্ষায় এই আলফা কণার বেশির ভাগ সোনার পাত ভেদ করে সোজা বেরিয়ে গেল। কিছু বেঁকে গেল। কিন্তু কয়েক হাজারের মধ্যে একটি একেবারে উল্টো দিকে ফিরে এল। এই আলফা কণা বিচ্ছুরণ পরীক্ষা থেকে তিনটি সিদ্ধান্ত এল। এক. বেশির ভাগ কণা সোজা বেরিয়ে গেল। তার মানে কণাগুলো চলার পথে কোনো বাধা পায়নি। অর্থাৎ পরমাণুর সেই স্থানগুলো ফাঁকা। দুই. কিছু কণা বেঁকে গেল। এর মানে পরমাণুর ভেতরে ধনাত্মক চার্জ আছে। আলফা কণা নিজে ধনাত্মক চার্জযুক্ত। জেনে রাখো যে একই চার্জ পরস্পরকে বিকর্ষণ করে। যেহেতু সে বেঁকে যাচ্ছে, এর অর্থ হলো সে সোনার পাতের কেন্দ্রীভূত ধনাত্মক চার্জের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বিকর্ষণ পাচ্ছে। তিন এবং শেষ সিদ্ধান্ত, কয়েক হাজারে একটি ফিরে এল; সে এমন কিছুতে সরাসরি বাধা পেল, যা প্রচণ্ড চার্জযুক্ত এবং তার চেয়ে অনেক ভারী। সেই জায়গার নাম নিউক্লিয়াস। এই নিউক্লিয়াসের ধনাত্মক চার্জের প্রবল বিকর্ষণেই আলফা কণা উল্টো দিকে ফিরে এল।
পরমাণু ভাইয়া, আমার মনে হচ্ছে সোনার পাতের পরমাণুর নিউক্লিয়াস খুব ছোট। তাই বেশির ভাগ আলফা কণা পরমাণুর ফাঁকা জায়গা দিয়ে বেরিয়ে গেছে। কিছু আলফা কণা নিউক্লিয়াসের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বিকর্ষণে বেঁকে গেছে। আর কয়েক হাজারে মাত্র একটি সরাসরি নিউক্লিয়াসের দিকে যাওয়ার সময় ধনাত্মক চার্জের বিকর্ষণে ফিরে এসেছে।
তুমি একদম ঠিক ধরেছ। আসলে নিউক্লিয়াসের ব্যাস পরমাণুর ব্যাসের প্রায় এক লাখ ভাগের এক ভাগ। পরমাণুটা যদি একটা স্টেডিয়াম হয়, নিউক্লিয়াস মাঠের মাঝখানে পড়ে থাকা একটা সরিষার দানা।
কিন্তু পরমাণুর ভেতরটা যদি প্রায় পুরোটাই ফাঁকা হয়, তাহলে তো আমার হাত ঢুকে যাওয়ার কথা।
ঠিক এখানেই আসল মজা। রাদারফোর্ড দেখালেন নিউক্লিয়াস পরমাণুর একেবারে মাঝখানে লুকিয়ে আছে, আর বাইরের পুরো জায়গাটায় শুধু ইলেকট্রন। তাই যেকোনো জিনিসের গা মানেই ইলেকট্রন। তোমার হাত টেবিলে রাখলে ইলেকট্রনের সঙ্গে ইলেকট্রনের দেখা হয়। আবার মনে করো কী বলেছিলাম। একই চার্জ পরস্পরকে বিকর্ষণ করে। ফলে দুটি ঋণাত্মক চার্জ কাছে এলেই পরস্পরকে ঠেলে সরায়। দুটি চুম্বকের একই মেরু কাছে আনলে যেমন ঠেলে সরিয়ে দেয়, ঠিক তেমন।
ঠিক ধরেছ। তোমার আঙুলের পরমাণু টেবিলের পরমাণুর ফাঁকার ভেতর ঢুকতে পারে না। কারণ, ঢোকার আগেই ইলেকট্রনরা ধাক্কা দিয়ে থামিয়ে দেয়। যাকে তুমি সারা জীবন ‘ছোঁয়া’ বলে এসেছ, সেটি আসলে ওই ধাক্কার অনুভূতি।
টেবিলে হাত রেখে চাপ দাও। যে বাধাটা অনুভব করছ, সেটি আসলে ইলেকট্রনের বিকর্ষণ। আর খাতায় রাদারফোর্ডের সিদ্ধান্ত লিখতে বললে মুখস্থ নয়, ওই তিনটি পর্যবেক্ষণ মনে করলে উত্তর বেরিয়ে আসবে। আজ তবে আসি, নিয়মিত এসো কিন্তু।

দৈনিক টার্গেট 




























