ইভালি কেলেঙ্কারি- গ্রাহকের টাকা ফেরত অনিশ্চিত, আইনি প্রক্রিয়া ধীর

জাতীয়ঢাকা

বাংলাদেশের ই-কমার্স ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত এবং বিতর্কিত নাম ইভালি। গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ, পণ্য সরবরাহ না করা এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটি এখন ধ্বংসের মুখে।

২০২১ সালে র‌্যাবের হাতে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ রাসেল ও তার স্ত্রী শামীমা নাসরিন আটকের পর থেকেই মূলত ইভালির পতন শুরু হয়। বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা এবং সম্পদের অপ্রতুলতায় হাজার হাজার গ্রাহকের টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে।

ডিসকাউন্টের ফাঁদে গ্রাহক

ইভালি মূলত তার “বিশাল ডিসকাউন্ট” অফারের মাধ্যমে রাতারাতি জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। প্রায়শই বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে পণ্য বিক্রির এই প্রলোভন অসংখ্য ক্রেতাকে আকৃষ্ট করে। কিন্তু এর পেছনে ছিল একটি জটিল পিরামিড স্কিমের মতো ব্যবসায়িক মডেল, যেখানে নতুন গ্রাহকের টাকায় পুরনো গ্রাহকদের পাওনা মেটানো হতো। যখন এই চক্র ভেঙে পড়ে, তখন অসংখ্য গ্রাহকের টাকা আটকে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে এই আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি উঠে আসে, যেখানে দেখা যায় প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া অগ্রিম টাকার তুলনায় খুব সামান্য পণ্য সরবরাহ করেছে।

আইনি প্রক্রিয়ায় জটিলতা ও ধীরগতি

২০২১ সালে ইভালির শীর্ষ কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তারের পর তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। আদালত তাদের সম্পত্তি জব্দ করার নির্দেশ দেয় এবং ২০২২ সালে ইভালিকে দেউলিয়া ঘোষণার প্রক্রিয়া শুরু হয়। আদালত কর্তৃক একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়, যার প্রধান কাজ ছিল প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি করে পাওনাদারদের দেনা পরিশোধ করা। তবে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতিতে এগোচ্ছে। রাসেল ও শামীমা জামিনে মুক্তি পেলেও তাদের বিরুদ্ধে মামলাগুলোর এখনো কোনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে, গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও ঝুলে আছে।

ক্ষতিপূরণের সম্ভাবনা কম, নতুন আইনের প্রয়োজনীয়তা

ট্রাস্টি বোর্ডের প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, ইভালির মোট পাওনা প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার বেশি, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের বর্তমান সম্পদ ও ব্যাংকে জমা থাকা অর্থের পরিমাণ এর তুলনায় খুবই কম। ধারণা করা হচ্ছে, সম্পদ বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে গ্রাহকদের মোট পাওনার মাত্র ১০-১৫% মেটানো সম্ভব হতে পারে। এতে ক্ষতিগ্রস্তদের একটি বড় অংশই তাদের সম্পূর্ণ টাকা ফেরত পাবে না।

এই ঘটনার পর সরকার ই-কমার্স খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। ফলস্বরূপ, ‘ই-কমার্স নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০২৪’ প্রণয়ন করা হয়। এই নতুন আইনে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এসক্রো অ্যাকাউন্ট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যার ফলে গ্রাহকের টাকা সরাসরি প্রতিষ্ঠানের কাছে না গিয়ে একটি মধ্যবর্তী অ্যাকাউন্টে জমা থাকবে, যতক্ষণ না পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে।

ইভালি কেলেঙ্কারি বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতের জন্য একটি বড় শিক্ষা। এটি শুধু গ্রাহকদের আর্থিক ক্ষতির কারণই হয়নি, বরং পুরো খাতের ওপর আস্থার সংকট তৈরি করেছে। এখন, আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কঠোর নজরদারিই পারে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে এবং গ্রাহকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে।

দৈনিক টার্গেট

দৈনিক টার্গেট বাংলাদেশী সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।